• ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৯ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ , ১২ই শাবান, ১৪৪৫ হিজরি

নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃতি , শিগগিরই টাঙ্গাইল শাড়িকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধন দেয়া হবে: শিল্প সচিব

usbnews
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৪
নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে  ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃতি , শিগগিরই টাঙ্গাইল শাড়িকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধন দেয়া হবে: শিল্প সচিব
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের বিখ্যাত টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়। ভারতের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বলে, ‘‌টাঙ্গাইল শাড়ি পশ্চিমবঙ্গ থেকে উদ্ভূত। এটি ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা মাস্টারপিস। এর মিহি গঠন, বৈচিত্র্যময় রং এবং সূক্ষ্ম জামদানি মোটিফের জন্য বিখ্যাত। এটি এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক।

ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির জন্য যে সকল আবেদন প্রক্রিয়াধীন আছে তা দ্রুত সম্পাদনের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জাকিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে  ঐতিহ্যেবাহী টাঙ্গাইলের তাঁতের  শাড়ি-কে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি ও নিবন্ধন দেয়া হবে।  এজন্য তিনি অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

শিল্প সচিব আজ শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে  জিআই পণ্যের স্বীকৃতি সংক্রান্ত এক জরুরি সভায় এ নির্দেশনা প্রদান করেন। এসময় শিল্প মন্ত্রণালয় এবং  পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি)  সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) টাঙ্গাইল থেকে অনলাইনে ভার্চুয়ালি সভায় সংযুক্ত হন।

শিল্প সচিব বলেন, টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি ছাড়াও মধুপুরের আনারস, নরসিংদীর লটকন, সাগর কলা, ভোলার মহিষের কাঁচা দুধের দই ইত্যাদিসহ জিআই পণ্যের স্বীকৃতির জন্য  যে সকল আবেদন অনিষ্পন্ন আছে তা দ্রুত সম্পাদন করতে হবে। এ বিষয়ে কোনো গাফিলতি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ২১টি পণ্যকে জিআই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।  দেশের ৬৪টি জেলা থেকে এক বা একাধিক পণ্য বা বস্তু খুঁজে বের করে আবেদন করার জন্য জেলা প্রশাসকদের অনুরোধ করা হয়েছে। জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির পর এগুলোকে  শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষে থেকে ব্রান্ডিং এর উদ্যোগ নেয়া হবে।

সভায় টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক জানান টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের আবেদন যথাযথভাবে ডকুমেন্টেশন করে দুই একদিনের মধ্যে জমা দেয়া হবে। ইতিমধ্যে আবেদন ফি প্রদানের পে-অর্ডার করা হয়েছে।

সভায় জানানো হয় ইতিমধ্যে ভারত টাঙ্গাইল শাড়িকে তাদের জিআই পণ্য ঘোষণা করায় আমরা আইনগত বিষয় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছি।

প্রয়োজনে বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থা বা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে  (ডাব্লিউআইপিও) সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেয়া হবে।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় পণ্যগুলোর জিআই স্বীকৃতি হাতছাড়া হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ‘পলিসিগত’ দুর্বলতা ছাড়া আর কী?

ইতিহাস থেকে জানা যায়, বসাক সম্প্রদায় হচ্ছে টাঙ্গাইলের আদি তাঁতি। দেশ ভাগের আগে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির বাজার বসত কলকাতায়। দেশ ভাগের পর তা বসে টাঙ্গাইলের বাজিতপুরে। অন্যদিকে, বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ও হিউয়েন সাংয়ের ভ্রমণ কাহিনীতে টাঙ্গাইলের বস্ত্র শিল্প অর্থাৎ তাঁত শিল্পের উল্লেখ রয়েছে।

বিগত দিনের তথ্য অনালাইনে যাচাই বাছাই করে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সূত্রে জানা যাচ্ছে , ২০১২ সালের দিকে জামদানি শাড়ি, আম ও ইলিশকে জিআই পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেয় ভারত। অথচ এসব পণ্য বাংলাদেশেও আছে। কিন্তু পণ্য জিআই করার জন্য দেশে তখন কোনো আইন ছিল না। বেশ দ্রুততার সঙ্গে ২০১৩ সালে সেই আইন হলো। আর প্রথম জিআই পণ্য হিসেবে নথিভুক্ত হলো জামদানি। বাংলাদেশের পণ্য হিসেবেই নথিভুক্ত হলো এই শাড়ি। ভারতও জামদানিকে জিআই পণ্য হিসেবে নথিভুক্ত করল, তবে ‘উপাধা জামদানি’ নামে। বাংলাদেশে এরপর একে একে স্বীকৃতি পায় ইলিশ, ক্ষীরশাপাতি আম, মসলিন, বাগদা চিংড়ি, কালিজিরা চাল, বিজয়পুরের সাদা মাটি, রাজশাহীর সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি, দিনাজপুরের কাটারিভোগ চাল, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম। আর সম্প্রতি জিআই স্বীকৃতি পেল টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, কুমিল্লার রসমালাই, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা এবং ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল।

শাড়ি ছাড়াও যে পণ্যগুলো ভারত আর বাংলাদেশ, দুই দেশেই উৎপাদিত হয়, সেগুলোর আগে জিআইয়ের স্বীকৃতি নিতে হবে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া ঠেলেই আবেদন করতে হবে। আবেদন করার জন্য যা যা ‘রিকয়ারমেন্ট’ আছে, তা পূরণ করেই করতে হবে। যেমন সাতকরার আচার বাংলাদেশের সিলেটেও হয়, আবার ভারতের আসামেও। দিনাজপুরের লিচু—এগুলোর জন্যও আবেদন করতে হবে। এরপর আন্তর্জাতিক বাজার, যেমন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়ায় আমাদের জিআইভুক্ত পণ্যগুলো তালিকাবদ্ধ করতে হবে। তারপর যে পণ্যগুলোর জিআই স্বত্ব ভারত নিয়েছে, সেটা যে অযৌক্তিক, তার উপযুক্ত নথি-প্রমাণসহ জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন (ডব্লিউআইপিও) বরাবর অভিযোগ করতে হবে।

এর আগে রসগোল্লা, নকশিকাঁথা, ফজলি আম ও নারকেলের মোয়ার স্বত্বও ভারতের হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। সুন্দরবনের মধুও ভারতের হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। অথচ এগুলো বাংলাদেশেরও হতে পারত।

ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট হ্যান্ডলুম উইভারস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড ২০২০ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের টাঙ্গাইল শাড়ির জন্য ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই ট্যাগের আবেদন করেন। ভারতের চেন্নাই শহরস্থিত দপ্তর থেকে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে “বাংলার টাঙ্গাইল শাড়ি” বা টাঙ্গাইল “শাড়ি অব বেঙ্গল” শিরোনামে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই ট্যাগ প্রদান করা হয়। প্রাপ্ত সনদপত্র অনুযায়ী, পণ্যটির নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন ২০৩০ খ্রিস্টাব্দের ৭ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৈধ থাকবে।[১][৩][৮][৪]

পশ্চিমবঙ্গের টাঙ্গাইল শাড়ির ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই ট্যাগ অর্জন বাংলাদেশে সমালোচনার জন্ম দেয়।[৯][১০][১১] বাংলাদেশি সংবাদমধ্যমের মতে, কলকাতার বিশ্ব বাংলা বিপনি জিআই ট্যাগ-এর সুযোগ নিয়ে টাঙ্গাইল শাড়ি ফুলিয়ার পণ্য হিসাবে বিক্রয় করছে। অন্যদিকে ভৌগোলিক নির্দেশকের চেন্নাইস্থিত দপ্তর থেকে প্রকাশিত ১৭৮ নং জার্নাল অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশে উৎপাদিত টাঙ্গাইল শাড়ি থেকে একটি ভিন্নতর শাড়ি, যা মূলত পূর্ব-বঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের তাঁতশাড়ির সংমিশ্রণ।

ইন্টারন্যাশনাল প্রপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) সংজ্ঞা অনুসারে, জিআই বলতে কোনো পণ্যের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান, নাম বা চিহ্নকে বোঝায়। ভৌগোলিক কারণে সে পণ্যের আলাদা গুণ ও খ্যাতি থাকতে হয়। যেহেতু এর গুণাগুণ ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে, কাজেই পণ্য ও এর উৎপত্তিস্থলের মধ্যে সুস্পষ্ট সম্পর্ক থাকে।

যেসব পণ্য বাংলাদেশে জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে একই ধরনের কিছু পণ্য ভারতও স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মধ্যে নকশিকাঁথা, জামদানি ও ফজলি আম উল্লেখযোগ্য। এ নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি বলে জানান ডিপিডিটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

অবিভক্ত বঙ্গে অর্থাৎ ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব-বাংলায় উৎপাদিত টাঙ্গাইল শাড়ি বুননের সাথে তাঁতি পরিবারের প্রতিটি সদস্য জড়িত থাকত। কোনও কারিগর বা শ্রমিক নিয়োগ করা হত না, যা ছিল বয়ন কৌশলকে তাঁতি পরিবারের বাইরে যেতে না দেওয়ার রীতি। বসাক পরিবারগুলি ছিল টাঙ্গাইলের শাড়ির অন্যতম তাঁতি পরিবার। বাংলার এই তাঁতিরা ছিল মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী “বসাক” সম্প্রদায়।

বাংলাদেশ এখনো টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজেদের জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন করতে পারবে। এক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা নেই।এরপর ভারতের জিআই নিবন্ধনকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে। যদিও কাজটা বেশ জটিল, ব্যয়সাপেক্ষ ও কঠিন।কোনো একটি পণ্য চেনার জন্য জিআই স্বীকৃতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জিআই স্বীকৃতি পাওয়া পণ্যগুলো অন্য দেশের সমজাতীয় পণ্য থেকে আলাদাভাবে চেনা যায়। এর ফলে ওই পণ্যের আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।

 

(প্রতিবেদনে সহায়তা নেয়া হয়েছে অনালাইনে প্রকাশিত সংবাদ , তথ্য এবং ইউকিপিডিয়া)