• ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৯ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ , ১২ই শাবান, ১৪৪৫ হিজরি

কৃষি বিপণনে দুর্বলতা ও উত্তরণের কৌশল

Usbnews.
প্রকাশিত ডিসেম্বর ১৯, ২০২৩
কৃষি বিপণনে দুর্বলতা ও উত্তরণের কৌশল
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

বাংলাদেশ আয়তনে একটি ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখানে ১৭ কোটি মানুষের বসবাস। জীবন-জীবিকার পাশাপাশি আমাদের সার্বিক উন্নয়নে কৃষি অনাদিকাল থেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩ শতাংশেরও বেশি। কৃষি খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ৩৭ শতাংশ। বাংলাদেশ বর্তমানে ধান উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে। নানা ধরনের শাকসবজি ও সুস্বাদু ফল উৎপাদনেও অনেক এগিয়ে। মৌসুমি ফল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে দশম। ফিশারিজ ও চাষকৃত মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান যথাক্রমে তৃতীয় ও পঞ্চম স্থানে। বিশ্বব্যাপী মাংস উৎপাদনে পোলট্রি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুতবর্ধনশীল খাত। এ খাতও জিডিপিতে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বেকারত্ব নিরসন ও নারীদের স্বাবলম্বী করার অন্যতম এক হাতিয়ার এখন পোলট্রি পালন।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফসল উৎপাদনে বেড়েছে খামার-যন্ত্রপাতির ব্যবহার। বিশেষ করে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় খামার-যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ফলে কম খরচ ও কম সময়ে ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। ১৯৯০ সালের পর খামার-যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়েছে ব্যাপকভাবে। বেড়েছে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, পাম্প, থ্রেসার, স্প্রেয়ার, কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও রিপারের ব্যবহার। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু কৃষিবিপ্লবের ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাই তিনি কৃষিক্ষেত্রে সেচের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে নগদ ভর্তুকি ও সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে কৃষকের মধ্যে সেচযন্ত্র বিক্রির ব্যবস্থা করেন। গভীর নলকূপ ও ভূ-উপরস্থ সেচ ব্যবস্থার প্রবর্তনের মাধ্যমে শুকনো মৌসুমে বোরো ধানের উৎপাদন বেড়েছে।

সামগ্রিক অগ্রগতির পরও গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর প্রায় ০.৫৪ শতাংশ চাষযোগ্য কৃষিজমি বিভিন্ন অবকাঠামো, বসতবাড়ি, কল-কারখানা ইত্যাদি নির্মাণের কারণে অকৃষি জমিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, যার ফলে দেশের প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদনে ক্ষতি হচ্ছে ০.৮৬ থেকে ১.১৬ শতাংশ। আবাদি জমি হ্রাস পাওয়ায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটানো এখন সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতির জন্য শস্য বৈচিত্র্য ও শস্য নিবিড়তা সব জায়গায় সমানভাবে হয়নি। গবেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রক্রিয়ায় ২০৬০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান ফসলগুলোর ফলন ব্যাপকহারে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভোগের মাত্রা বাড়ছে। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ২০৫০ সালে ২৫ কোটিতে উপনীত হবে। ক্রমবর্ধমান এ জনসংখ্যার জন্য খাদ্য চাহিদা বাড়বে, সেই সঙ্গে বাড়বে আমদানিনির্ভরতাও, যদি না আরেকটি ‘সবুজবিপ্লব’ সংঘটিত করা যায়।

কৃষিজমির ক্রমহ্রাসমান উৎপাদন ক্ষমতা, জলবায়ুর পরিবর্তন, সেচের পানির স্বল্পতা, সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা লোনা জলে আক্রান্ত হওয়া, ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বৃদ্ধি, শিল্পায়নজনিত দূষণ, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ও প্রসার ইত্যাদি কারণে কৃষিপণ্য উৎপাদনের ওপর পড়বে ব্যাপক চাপ। সেই সঙ্গে রয়েছে শ্রমের মজুরি বৃদ্ধি ও শস্য উৎপাদন লাভজনক না হওয়ার কারণে কৃষিজমি প্রতিনিয়ত অকৃষি জমিতে রূপান্তরিত হওয়া। দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ শতাংশ করে কৃষিজমি বিভিন্ন কারণে হ্রাস পাচ্ছে। যদিও আধুনিক প্রযুক্তি, উচ্চফলনশীল জাত ইত্যাদি কারণে ধান উৎপাদন অদ্যাবধি বেড়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি একক জমিতে ধানের ফলন সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। কৃষিপণ্যের ফলন ও মোট উৎপাদন বৃদ্ধি তথা উৎপাদনকে টেকসই করার জন্য প্রয়োজন অধিকতর উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, জমির উর্বরতা বৃদ্ধি, সেচের পানির ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার, দক্ষ জমি ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। কৃষিকে লাভজনক করার মাধ্যমে সবার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে সরকার গ্রহণ করেছে ‘বিশেষ কর্মপরিকল্পনা’। তবে তা বাস্তবায়নে যেসব বাধা রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কৃষিপণ্য পরিবহণ ও বাজারজাতকরণে তুলনামূলকভাবে দুর্বল ব্যবস্থাপনা।

কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা সুরক্ষিত করার জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধিই কি শেষ কথা? উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে ধরে নেওয়া হলেও কিন্তু তা কি ভোক্তাদের পর্যাপ্ত ভোগের নিশ্চয়তা দেবে? উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ সমস্যার সমাধানে কোনো দীর্ঘকালীন পদক্ষেপ না নেওয়া হলে উৎপাদন বৃদ্ধির ফলাফল অংশীদারত্বমূলক হবে না, কৃষি অলাভজনক পেশা হিসাবেই বিবেচিত হতে থাকবে। কৃষির উৎপাদন বেড়েছে, মূল্য সংযোজন হয়েছে, তবুও কৃষি তুলনামূলকভাবে অলাভজনক ব্যবসা হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ কৃষক অনেক সময়ই তার উৎপাদিত পণ্যের লাভজনক দাম পাচ্ছে না।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৬৫ লাখ। এর প্রায় ৮৪ শতাংশ প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক। আমাদের দেশের কৃষক শ্রেণি অত্যন্ত দুর্বল ও অসংগঠিত। অধিকাংশই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক, তাই তাদের সক্ষমতাও সীমিত। তাদের রয়েছে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব। অর্থনৈতিকভাবে তারা দুর্বল। তাদের নেই কোনো সুসংগঠিত প্লাটফর্ম, পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার ও পরিবহণ ব্যবস্থা। এসব কারণে কৃষক ও উৎপাদক শ্রেণিকে সর্বদাই পণ্য বাজারজাতকরণে বাজার কুশীলবদের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। সরকারি-বেসরকারি সহায়তা ছাড়া তাদের পক্ষে উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণের প্রতিটি পর্যায়ের সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা কঠিন।

কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের আওতায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের আন্তঃসম্পর্কিত কাজ; যেমন-উৎপাদন পরিকল্পনা, উৎপাদন, সংগ্রহ, বাছাইকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, গুদামজাতকরণ, পণ্য পরিবহণ, বাজার তথ্য, বিজ্ঞাপন, ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি। বাজারব্যবস্থায় কৃষিপণ্যগুলো উৎপাদনকারী থেকে ভোক্তা পর্যায়ে আসতে বেশ কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ী, স্থানীয় মজুতদার, স্থানীয় খুচরা বাজার, বেপারি, পাইকারি ব্যবসায়ী, কেন্দ্রীয় বাজার বা টার্মিনাল, আড়তদার, প্রক্রিয়াজাতকারী, খুচরা বাজার, খুচরা ব্যবসায়ী ইত্যাদি। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষক পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে আসতে বিভিন্ন বাজার অংশগ্রহণকারীর মাধ্যমে কৃষিপণ্য চার-পাঁচবার হাতবদল হয়। হাতবদলের সময় সেবা ও অনেক সময় পণ্যের ধরনেরও পরিবর্তন হয়; ফলে ভ্যাল্যুযুক্ত হয়। এতে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম কৃষক পর্যায়ের তুলনায় ৩-৪ গুণ বৃদ্ধি পায়; কখনো কখনো কৃষিপণ্যের ধরন অনুযায়ী আরও বেশি হয়ে থাকে।

কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণের সমস্যাগুলো সমাধানের উপায় হিসাবে যে বিষয়গুলোর ওপর বিশেষভাবে জোর দিতে হবে, তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে ফসল সংগ্রহ-উত্তর অপচয়রোধ ও মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহ। কৃষিপণ্য সংগ্রাহাগার ও আধুনিক হিমাগার গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষিপণ্যের সংগ্রহ-উত্তর প্রযুক্তি যেমন-বাছাইকরণ, প্যাকেজিং, পরিবহণ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন কৌশল ইত্যাদির ওপর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও পরিবহণ ব্যবস্থায় বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি গ্রাম, উপজেলা ও শহরের কৃষি বাজারগুলোর ভৌত-অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। যেমন-পণ্য রাখার জন্য প্লাটফর্ম, ওয়াশিং রুম, বাছাইকরণ, পয়ঃনিষ্কাশন, স্টোররুমসহ পণ্য পরিমাপের সরঞ্জাম ও বাজারের পাশে লোডিং-আনলোডিং পয়েন্ট স্থাপন করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

কৃষক শ্রেণির অধিকাংশই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক, তাদের রয়েছে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব, নেই পচনশীল কৃষিপণ্যের পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার ও পরিবহণ ব্যবস্থা। এসব কারণে কৃষক ও উৎপাদক শ্রেণি সর্বদাই তাদের পণ্যের বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন মৌসুমে যথাযথ বাছাই, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও পরিবহণ ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকের মাঠ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছতে ২০-৪০ শতাংশ পণ্যের অপচয় হচ্ছে। টমেটো সংগ্রহ থেকে স্থানীয় ভোক্তাবাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত স্তূপাকারে সংরক্ষণ ও পরিবহণের সময় ঝাঁকুনির কারণে প্রায় ১৩ শতাংশ টমেটো নষ্ট হয়। স্থানীয় আড়তদারদের যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় নষ্ট হয় প্রায় ৪ শতাংশ টমেটো। কলা মাঠ থেকে স্থানীয় বাজারে নেওয়ার সময় নষ্ট হয় প্রায় ৩ শতাংশ। আড়তদার/পাইকারি পর্যায়ে সংরক্ষণ ও পরিবহণ ব্যবস্থা না থাকায় নষ্ট হয় প্রায় ৫ শতাংশ। কৃষকদের দলগতভাবে ফসল উৎপাদনে আগ্রহী এবং কৃষকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ চাষাবাদের মাধ্যমে সরাসরি সুপারশপ, রপ্তানিকারক, প্রক্রিয়াজাতকারকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, কৃষকের বাজার, পাইকারি বাজার, ডিজিটাল ই-শপ ইত্যাদির মাধ্যমে এ ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব, যদিও এক্ষেত্রে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ।

উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও পরিবহণ সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি গ্রাম, উপজেলা ও শহরের কৃষি বাজারগুলোর ভৌত-অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। যেমন-পণ্য রাখার জন্য প্লাটফর্ম, ওয়াশিং রুম, শটিং গ্রেডিং, ড্রাইং রুম, স্টোর রুম, কুল হাউস, পণ্য পরিমাপের সরঞ্জাম, ট্রেনিং রুম। ফলমূল ও শাকসবজি পরিবহণের জন্য কুলিং ভ্যান সহজলভ্যকরণ ও বাজারের পাশে লোডিং-আনলোডিং পয়েন্ট স্থাপন করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

উৎপাদক ও ভোক্তা শ্রেণির মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে উভয়পক্ষই লাভবান হতে পারে। ফসল উৎপাদনে আগ্রহী এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের অপ্রয়োজনীয় প্রভাব কমানো সম্ভব। আবার চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ পদ্ধতিতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সুপারশপ, রপ্তানিকারক ও প্রক্রিয়াজাতকারক বাজার সংযোগ তৈরি করা গেলে অপ্রয়োজনীয় প্রভাব ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব। কৃষকদের কালেকটিভ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আধুনিক পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন ও বাজারজাত করার প্রক্রিয়াকে উদ্বুদ্ধ ও সহায়তা প্রদান করতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর করতে প্রয়োজন এ প্রচেষ্টার সঙ্গে সরকারি উদ্যোগকে একীভূত করা। কালেকটিভ ব্যবস্থাপনায় পণ্য পাইকারি বাজারে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা গেলে তা ফলদায়ক হবে। এ ছাড়া কৃষি উৎপাদনে কালেকটিভ প্রচেষ্টার ভিত্তিতে কৃষি উপকরণ সরবরাহ, উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করলে নিশ্চিত হবে খাদ্য উৎপাদন ও নিশ্চিত করা যাবে খাদ্য নিরাপত্তা। কৃষিনীতি ২০১৮-এর ১৬.৪ উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণে সমবায়ভিত্তিক বিপণনে’ সহযোগিতা ও উৎসাহ প্রদানের কথা বলা হয়েছে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, চুক্তি ও সমবায় বিপণন কৃষিপণ্যের দাম স্থিতিশীল করার মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদনে আগ্রহী করে তোলে।

কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ সমস্যা সমাধানে দেশের উৎপাদন পকেট বা জোনগুলোতে পর্যাপ্তসংখ্যক কৃষিপণ্য সংগ্রাহাগার ও আধুনিক হিমাগার গড়ে তুলতে হবে। আর এক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। পর্যাপ্ত ও সহজ সুদে ঋণ প্রদান তথা অন্যান্য পাবলিক পণ্য যেমন সঠিক ও পর্যাপ্ত তথ্যপ্রবাহ, গুণগত যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজার ও অন্যান্য ঝুঁকি ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে।

নীতিনির্ধারকদের উচ্চপর্যায়ে বিভিন্ন সময় কৃষিপণ্যের দাম নিয়ে আলোচনা হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব আছে। পাশের দেশ ভারতসহ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কৃষিবান্ধব ‘কৃষিমূল্য কমিশন’ রয়েছে। দেশভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক নামের ভিন্নতা থাকলেও এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো কৃষকের আয় স্থিতিশীল রাখা, কৃষিপণ্যের মূল্য ওঠানামা সহনশীল পর্যায়ে রাখা, দেশি ও আন্তর্জাতিক বাজার তথ্যের (চাহিদা, সরবরাহ, দাম ইত্যাদি) বিশ্লেষণ এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও দামের আগাম সংকেত প্রদান করা ইত্যাদি। বাজার অর্থনীতির দেশ আমেরিকার সরকার ১৯৩৩ সালে ‘কমোডিটি ক্রেডিট করপোরেশন’ নামে একটি কর্মসূচি চালু করে, যার একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো ‘কৃষি ঝুঁকি/মূল্য ক্ষতি মোকাবিলা করা’। প্রতিবেশী দেশ ভারতের ‘কৃষি খরচ ও মূল্য কমিশন’ ২৩টি কৃষিপণ্যে সর্বনিু দাম সহায়তা দেয়। ভারতে মোট উৎপাদিত পণ্যের ১৫ শতাংশ ক্রয় করা হয় পূর্বনির্ধারিত মূল্যে। কৃষিব্যয় ও মূল্য কমিশন আমাদের খুবই প্রয়োজন। আমাদের দেশে পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী দলিল ও ‘কৃষিনীতি ১৯৯৯তে’ কৃষি মূল্য কমিশনের কথা বলা থাকলেও এর কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। উৎপাদিত কৃষিদ্রব্যের সঠিক মূল্য নির্ধারণের জন্য ‘মূল্য নির্ধারণ কমিশন’ গঠন করা প্রয়োজন; যার প্রধান প্রধান কাজ হবে চাহিদা, জোগান ও মূল্য বিষয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে পূর্বাভাস প্রদান করা, অন্যান্য দেশের মতো অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্যের ‘দামের ব্যান্ড’ ঘোষণা ও তার বাস্তবায়ন, যাতে করে বাজারে অংশগ্রহণকারী যেমন কৃষক, উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সবার স্বার্থই সংরক্ষিত হয়। সর্বোপরি, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করা এবং বাজার চাহিদা অনুযায়ী কৃষিপণ্য উৎপাদন করা, কৃষি উপকরণ ও ঋণ সজলভ্য করা এবং সব বাণিজ্যিক ব্যাংকে কৃষি ঋণের সুবিধা বৃদ্ধি। কৃষিপণ্য পরিবহণে গুণগত ও কাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহণ ও বিপণন সম্পর্কিত সমস্যাগুলো সম্পূর্ণভাবে সমাধান করা না গেলেও এর তীব্রতা কমিয়ে আনা সম্ভব বলে আশা করা যায়।

কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণ করতে হলে উৎপাদনকেন্দ্রিকতাই যথেষ্ট নয়, কৃষির সঠিক বাজারজাতকরণ ও তার সঙ্গে লজিস্টিক আধুনিকীকরণ প্রয়োজন। যে খাত আমাদের খাদ্য, আয় ও কর্মসংস্থান দেয়, ‘অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে আলো’ দেখায়, তার টেকসই উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের কোনো বিকল্প নেই। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি কমতে থাকাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতে খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ উন্নতি সাধন করতে পারলেও কৃষি বহুমুখীকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রূপকল্প-২০২১, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০ এবং রূপকল্প-২০৪১-এর আলোকে জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮ ও তার কর্মপরিকল্পনা, ৮ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতি ২০২০, জাতীয় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, ডেল্টাপ্লান ২১০০ এবং অন্যান্য পরিকল্পনা দলিলের আলোকে সময়াবদ্ধ কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা রূপান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কৃষিক্ষেত্রে আমূল অবকাঠামোগত পরিবর্তন আসবে, যার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবে রূপ পাবে।