• ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৯ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ , ১২ই শাবান, ১৪৪৫ হিজরি

বজ্রপাতের কারণ ও আমাদের করণীয়

Usbnews.
প্রকাশিত ডিসেম্বর ২৩, ২০২৩
বজ্রপাতের কারণ ও আমাদের করণীয়
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

বজ্রপাতে গত মাসেই প্রায় অর্ধশত মানুষ মারা যায়। বজ্রপাতে এতো মানুষের মৃত্যু ঘটলেও তা প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থাই নেই। এমনকি সরকারের হুঁশও হচ্ছেনা। বজ্রপাতের এই সময়ে কিছু দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েই সরকার তাদের দায় শেষ করছে। বছরে দেড়শ’র মতো লোকের মৃত্যুর খবর বিচ্ছিন্নভাবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা ‘পাঁচ শতাধিক’ বলে আবহাওয়াসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলে থাকে। বজ্রপাত-ভয়াবহতার এমন প্রেক্ষাপটে টেকসই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষাসচেতনতা, বনায়ন, নির্মাণশিল্প, বিদ্যুৎ ও টেলিকম অবকাঠামোর সমন্বিত ও ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলোর ওপর নজর দেওয়ার সমন্বিত প্রয়াস জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আবহওয়াবিদরা বলেন, বেশি গাছপালা থাকলে বজ্র গাছের মধ্যে পড়লে জানমালে ক্ষতি কম হতো। বিষয়টি যে পরিবেশ বিপর্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বজ্রপাত আরও ঘন ঘন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বজ্রপাত আরও ঘনঘন হবে। এমনকি বায়ুদূষণেও বজ্রপাত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঢাকার আবাসিক এলাকাগুলোর ভূমির উষ্ণতা পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে অন্তত ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি, বাতাসের উষ্ণতাও তেমনই বেশি। নিরন্তর জ্যামে জ্বালানির দহন, অত্যধিক গরমের শহরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের অতি ব্যবহার, শক্তির যাবতীয় রূপান্তর, এনার্জি কনভারশন এসব মিলে উষ্ণতা ও দূষণ দুটোই বাড়াচ্ছে।
বজ্রপাত হবার কারণ হিসেবে জানা যায়, বাংলাদেশের দক্ষিণ থেকে আসা গরম আর উত্তরের ঠান্ডা বাতাসে সৃষ্ট অস্থিতিশীল আবহাওয়ায় তৈরি হয় বজ্র মেঘের। এ রকম একটি মেঘের সঙ্গে আরেকটি মেঘের ঘর্ষণে হয় বজ্রপাত। এ সময় উচ্চ ভোল্টের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ যখন মাটিতে নেমে আসে, তখন সবচেয়ে কাছে যা পায় তাতেই আঘাত করে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে বজ্রপাতের মূল কারণ ভৌগলিক অবস্থান। একদিকে বঙ্গোপসাগর, এরপরই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে আসছে গরম আর আর্দ্র বাতাস। আবার উত্তরে রয়েছে পাহাড়ি এলাকা। কিছু দূরেই হিমালয় পর্বত। যেখান থেকে ঠান্ডা বাতাস বয়ে আসে। এই দুই জায়গা থেকে আসা বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। গবেষকরা বলছেন, তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বাড়লে বজ্রপাতের সম্ভাবনা ৫০ ভাগ বেড়ে যায়। গত কয়েক দশকে বড় বড় গাছ কেটে ফেলাও তার একটি কারণ। উঁচু গাছপালা বজ্রনিরোধক হিসেবেও কাজ করে। খোলা স্থানে মানুষের কাজ করা এবং বজ্রপাতের বিষয়ে অসচেতনতাও বজ্রপাতে প্রাণহানি বৃদ্ধির জন্য দায়ী। বাংলাদেশে বজ্রপাতের কারণগুলোর মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে প্রথম ও প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি। যদিও অনেক জলবায়ু বিজ্ঞানী এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হলে বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে, তাই বেশি বজ্রঝড় তৈরি হতে পারে। বনায়ন কমে গেলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। কারণ হিসেবে বলা যায়, গ্রিন হাউস কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে গাছপালার খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহার করে। বর্তমান সময়ে বজ্রপাত বেড়েছে উল্লেখ করে এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ইদানীং বজ্রপাত অনেক লোক মারা যাচ্ছে। আমরা সাধারণত দেখতে পাই যে তাপমাত্রা বেড়েছে। বজ্রপাত বাড়ার ক্ষেত্রে বলা যায় যে, আমাদের ইকনোমিক অ্যাক্টিভিটি বেড়েছে। এছাড়াও বলা যায়, বজ্রপাতের যে তীব্রতা ছিল তাও কিছুটা বেড়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে যেখানে বেশি লোক বজ্রপাতে মারা যায়, তাদের কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়াও এর একটি কারণ হতে পারে। আর আগের চেয়ে বজ্রপাত রিপোর্টিং সিস্টেমটাও বেড়েছে’ ।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব জিওগ্রাফির অধ্যাপক ড. টমাস ডব্লিউ স্মিডলিনের ‘রিস্ক ফ্যাক্টরস অ্যান্ড সোশ্যাল ভালনারেবিলিটি’ শীর্ষক গবেষণা মতে, বাংলাদেশে বছরে ৮০ থেকে ১২০ দিন বজ্রপাত হয়। এর মধ্যে প্রতিবছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৪০টি বজ্রপাত হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় বজ্রপাতপ্রবণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। বিগত বছরগুলোতে দেশে বজ্রপাতের তীব্রতা বেড়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন। ২০১৩-২০ সাল পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে ১ হাজার ৮৭৮ জন মারা গেছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৯ এই এক দশকে দেশে বজ্রপাতে মোট মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ৮১। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে ২০১৮ সালে। ওই বছর বজ্রপাতে মারা গেছে ৩৫৯ জন। এর আগের বছর মারা যায় ৩০১ জন, যা গত এক দশকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০১৬ সালে বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা ছিল ২০৫। এ ছাড়া ২০১৫ সালে ১৬০, ২০১৪ সালে ১৭০, ২০১৩ সালে ১৮৫, ২০১২ সালে ২০১, ২০১১ সালে ১৭৯ ও ২০১০ সালে ১২৩ জনের মৃত্যু ঘটে বজ্রপাতে।

বজ্রপাতে আহত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হৃৎস্পন্দন দ্রুত ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করতে পারলে বাঁচানো সম্ভব হতে পারে। বেশি দেরি হলে আহত ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে।যদি আহত ব্যক্তির হৃৎপিণ্ড সচল থাকে তাহলে তাকে সাথে সাথে সিপিআর দিতে হবে। সেজন্য সিপিআর সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি। সিপিআর দিয়ে হৃদপিণ্ড সচল রাখতে হবে। এর মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স বা কোন গাড়ি ডেকে দ্রুত আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে হবে। আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেবার ক্ষেত্রে বিলম্ব করা যাবে না।

যত্রতত্র বাড়ি ছাদে, উঁচু বাড়ির সাইড ওয়ালে টেলিকমের অ্যানটেনা মাউন্ট করে একদিকে নাগরিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে এগুলো বজ্রপাতেও ঝুঁকিও তৈরি করছে। একইভাবে গত দশকে নগর বনায়ন একেবারেই অবহেলিত থেকেছে। দুর্বৃত্তরা শুধু গাছই কেটেছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ওসমানী উদ্যান, বনানী, গুলশান ও বিমানবন্দর সড়কের উন্নয়নের নামে নির্বিচার বৃক্ষনিধন হয়েছে। সড়কের পার্শ্ব ও সড়কদ্বীপের বনায়ন যা ছিল, তাও ধীরে ধীরে কমে আসছে। বজ্রঝুঁকি মাথায় রেখে এলাকাভিত্তিক নতুন বনায়ন উদ্যোগ দরকার, যেখানে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর একটি সুউচ্চ গাছ রাখার পরিকল্পনা হবে।