মুসলমান কবিদের মধ্যে প্রাচীনতম কবি হলেন শাহ মুহম্মদ সগীর। ধারণা করা হয়, তিনি ১৪-১৫ শতকের কবি ছিলেন। গৌড়ের সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের রাজত্বকালে (১৪৮৯-১৪১১ খ্রিষ্টাব্দ) ইউসুফ জুলেখা কাব্যটি লিখেন।
হাকিম আবুল কাশেম ফেরদৌসী তুসি, ফেরদৌসী নামে অধিক পরিচিত (৯৪০-১০২০ খ্রিস্টাব্দ) পারস্যের (বর্তমান ইরান) একজন বিখ্যাত কবি। তাঁর কাব্যিক অনুকরণ ছিল শাহ মুহম্মদ সগীর এর লেখায়।
হাকিম আবুল কাশেম ফেরদৌসী তুসি, ফেরদৌসী নামে অধিক পরিচিত (৯৪০-১০২০ খ্রিস্টাব্দ) পারস্যের (বর্তমান ইরান) একজন বিখ্যাত কবি। তাঁর কাব্যিক অনুকরণ ছিল শাহ মুহম্মদ সগীর এর লেখায়। মুহম্মদ সগীরই প্রথম বাংলা ভাষার মাধ্যমে আরবি-ফারসি সাহিত্যের বিষয় এদেশের পাঠকের কাছে তুলে ধরেন।
তার অন্যতম কাব্য পদ্মাবতী কাব্যটি পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম দশকে রচনা করা হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। তাঁর কাব্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কতিপয় শব্দের ব্যবহার লক্ষ করে ড. মুহম্মদ এনামুল হক তাঁকে চট্টগ্রামের অধিবাসী বলে বিবেচনা করেছেন। তিনি কাব্যচর্চায় সুলতান গিয়াসউদ্দিনের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। তাঁর কাব্যে ধর্মীয় পটভূমি থাকলেও তা হয়ে উঠেছে মানবিক প্রেমোপাখ্যান। সূত্র – রফিকুল ইসলাম ও অন্যান্য সম্পাদিত; কবিতা সংগ্রহ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; জুলাই ১৯৯০; পৃষ্ঠা- ৪৩৮।
‘শাহ’ উপাধি থেকে অনুমান করা হয় কবি শাহ মুহম্মদ সগীর কোনো দরবেশ বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর কাব্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কতিপয় শব্দের প্রয়োগ দেখে ড. মুহম্মদ এনামুল হক তাঁকে চট্টগ্রামের অধিবাসী বলে ধরে নিয়েছেন। কবি তার কবিতার রাজবন্দনায় উল্লেখ করেছেন, ‘মুহম্মদ সগীর তান আজ্ঞার অধীন’—এ কথা থেকে ধারণা করা হয় তিনি হয়ত সুলতানের কর্মচারী ছিলেন। অথবা কাব্যচর্চায় কবি শাহ মুহম্মদ সগীর সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন।
বন্দনা
(স্তুতি বা প্রশংসা)
শাহ মুহম্মদ সগীর
দ্বিতীয়ে প্রণাম কঁরো মাও বাপ পাএ।
(মাও- মা। পাএ- পায়ে)
দ্বিতীয়ত সালাম/প্রণাম করি মাবাবাকে।
যান দয়া হন্তে জন্ম হৈল বসুধায়।।
(যান- যাদের। হন্তে- হতে/দ্বারা। বসুধা- পৃথিবী।
যাদের দয়ায় পৃথিবীতে আমার জন্ম হলো।
পিঁপিড়ার ভয়ে মাও না থুইলা মাটিতে।
(পিপিঁড়া- পিঁপড়া/পোকামাকড়। না থুইলা- না রাখা।
পিঁপড়া বা পোকামাকড় থেকে রক্ষা করতে মা শিশুকে খুব সাবধানে রাখতেন।
কোল্ দিয়া বুক দিয়া জগতে বিদিত।।
(বিদিত- জানত।)
কোলে করে, বুকে করে আগলে রেখেছেন যা পৃথিবীর সবাই জানে।
অশক্য আছিলুঁ মুই দুর্বল ছাবাল
(অশক্য- দুর্বল/শক্তিসামর্থ্যহীন। আছিলঁ- ছিলাম। ছাবাল- শিশু।
শক্তি সামর্থ্যহীন এক দুর্বল শিশু ছিলাম আমি।
তান দয়া হন্তে হৈল এ ধড় বিশাল।।
(তান- তার। হন্তে- দ্বারা। ধড়- শরীর।)
তাঁর দয়া ও যত্নে আমি এত বড় হয়েছি।
না খাই খাওয়াএ পিতা না পরি পরাএ।
(পরাএ- পোশাক পরিধান করানো।)
পিতা না খেয়ে আমাকে খাওয়াতেন, নিজে না পরে আমাকে পরাতেন।
কত দুক্ষে একে একে বছর গোঞাএ।।
(দুক্ষে- দুঃখে। গোঞাএ- পার করে।)
দুঃখকষ্টে বছরের পর বছর পার করেছেন।
পিতাক নেহায় জিউ জীবন যৌবন।
(পিতাক- বাবা। নেহায়- অতিক্রম করে/বিসর্জন দিয়ে। জিউ- প্রাণ/মন)
বাবা তার মনপ্রাণ, জীবনযৌবন সব বিসর্জন দিলেন।
কনে না সুধিব তান ধারক কাহন।।
(কনে-কখনো। সুধিব- শোধ করা। ধারক- ঋণ। কাহন- কাহিনী।)
কখনো তাঁর ঋণ শোধ করা যাবে না।
ওস্তাদে প্রণাম করোঁ পিতা হন্তে বাড়।
(ওস্তাদ-শিক্ষক। হন্তে- হতে/থেকে। বাড়-বেশি।)
শিক্ষককে সম্মান কর পিতার চাইতে বেশি।
দোসর-জনম দিলা তিঁহ হে আন্ধার।।
(দোসর-দ্বিতীয়। দিলা-দিলেন। তিঁহ-তিনিও। আন্ধার- অজ্ঞতা।)
তিনিও ২য় বার আমাকে জন্ম দিলেন অন্ধকার থেকে আলোয় এনে।
আন্ধা পুরবাসী আছ জথ পৌরজন।
(আহ্মা- সমগ্র। পুরাবাসী-নগরবাসী। আছ-আছেন। জথ-যতজন। পৌরজন-নাগরিক।)
এই সমগ্র পৃথিবীতে যত শিক্ষিত ব্যক্তি আছেন।
ইস্ট মিত্র আদি জথ সভাসদগণ।
(ইস্ট-আত্মীয়। মিত্র-বন্ধু। আদি-বয়োজ্যেষ্ঠ। সভাসদগণ-রাজার মন্ত্রীসভার সদস্যগণ)
আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সভার বয়োজ্যেষ্ঠ সকল সদস্য।
তান সভান পদে মোহার বহুল ভকতি।
(তান-তাঁদের। সভান-সকলের। পদে-পায়ে। মোহার-আমার। ভকতি-শ্রদ্ধা।)
তাদের সকলের পায়ে আমার কদমবুচি/শ্রদ্ধা।
সপুটে প্রণাম মোহার মনোরথ গতি।।
সপুটে-নিজহাতে। প্রণাম-(সম্মান/কদমবুচি। মোহার-আমার। মনোরথ-মনের ইচ্ছা। গতি-স্বভাব।)
আমার মনের ইচ্ছা হলো তাদের সবাইকে কদমবুচি করি।
মুহম্মদ সগীর হীন বহোঁ পাপ ভার।
(হীন-অধম। বহোঁ-বহন করা। পাপভার- পাপের বোঝা)
আমি অধম ও পাপী মুহম্মদ সগীর
সভানক পদে দোয়া মাগোঁ বার বার।
(সভানক-সভার সদস্য। মাগোঁ-চাওয়া/প্রার্থনা করা।)
সভায় উপস্থিত সকলের কাছে বার বার দোয়া প্রার্থনা করছি।
পুরাবাসী- নগরবাসী। বন্দনা- স্তুতি, প্রশংসা। করোঁ – করি। যান- যার। হন্তে- হতে, থেকে । থুইলা- রাখল । অশক্য- অশক্ত, দুর্বল। আছিলু- ছিলাম। মুই- আমি । ছাবাল- ছাওয়াল, ছেলে, সন্তান । তান – তাঁর । গোঙাও- গুজরান করে, অতিবাহিত করে। পিতাক- পিতাকে। নেহায়- স্নেহে। বিদিত- জানা। মনোরথ- ইচ্ছা, অভিলাষ । জিউ- আয়ু জীবিত থাকা। কনে- কখনও। ধারক- ধারের, ঋণের। কাহন- ষোলোপণ, টাকা ।
বাড়- বাড়া, বেশি। দোসর- দ্বিতীয়। মোহার- আমার। সপুটে- করজোড়ে। সভান- সবার । সভানক- সবার। বসুধায়- পৃথিবীতে। তিঁহ- তিনিও। আহ্মার- আমার। বিদিত- জানা। পিঁপিড়ার ভয়ে মাও না ধুইলা মাটিত- মায়ের স্নেহ মমতার তুলনা নেই। মায়ের সদাজাগ্রত কল্যাণদৃষ্টি সন্তানের জীবনপথের পাথেয় স্বরূপ। শিশুকে মা বহু যত্নে লালন-পালন করেন। পিঁপড়ার ভয়ে মা সন্তানকে মাটিতে রাখে নি- এই কথা উল্লেখ করে কবি মায়ের সেই স্নেহ মমতা ও কল্যাণ দৃষ্টিকেই বড় করে তুলেছেন। অশক্য আছিলঁ মুই দুর্বল ছাবাল-এখানে কবি মানব শিশুর শৈশবকালীন অসহায় অবস্থার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। মায়ের আদর-যত্ন ও পরিচর্যা লাভ করে শিশু ধীরে ধীরে পরিণত মানুষ হয়ে উঠে। কবি তাঁর স্নেহময়ী মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে এই পঙ্ক্তিটি ব্যবহার করেছেন।
- সকল তথ্য বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগ্রহীত