• ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

ভারতের ‘রাম’ রাজনীতি!

usbnews
প্রকাশিত জুলাই ৯, ২০২৪
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

যার যার বিশ্বাস তার কাছেই থাক, একথা ভেবে কথাগুলো এভাবে বলতে চাইনি। এখন বলতে হচ্ছে কারণ, উগ্রবাদী রাজনীতিবিদরা মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে জঙ্গিবাদী চিন্তাধারায় রূপান্তরিত করে ক্ষমতা ধরে রাখার খেলায় মেতে সারা দেশের সংখ্যালঘু এবং দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। তাই সত্যটা খোলাখুলি ভাবেই বলতে চাই!

ইতিহাসে নেই, ভূগোলে নেই, স্মরণে নেই, খননে নেই, এমন একটি অদৃশ্য বস্তুর নাম ‘রামজন্মভূমি’। সেই রামজন্মভূমি রাজনীতিই আচ্ছন্ন করে রেখেছে ভারতের ১৩৭ কোটি জনগোষ্ঠী কে। তারা ভারতে রাম জন্মভূমি, রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেই ছাড়বে। আর সেই মানসিকতারই সাক্ষ্য নিয়ে ভারতের রাজনীতিতে ত্বরিত উত্থান ঘটেছে আজকের চরম সাম্প্রদায়িক বিজেপি নামক দলটির, যারা আজ ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসীন।

কি এই রাম রাজনীতি? রবীন্দ্রনাথ যার জন্ম ‘মনভূমে’ বলে উল্লেখ করেছেন, সুকুমার সেন বলেছেন, ‘রাম কবির কল্পনা ছাড়া কিছু হতে পারেনা’। আচার্য্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘রাম চরিত্রটির কোন ঐতিহাসিকতা নেই’। শুধু কি তাই, এইচ ডি সাঙ্কালিয়ার মত স্বনামধন্য প্রত্নতাত্ত্বিকরা রাম ইতিহাস প্রমাণের জন্য দেশময় খোঁড়াখুঁড়ি করেও কোন প্রমান হাজির করতে পারেনি। বরং যতই খোঁড়াখুঁড়ি করেছে, রাম কথার অনৈতিহাসিকত্ব তত সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাতে কি! রাম চরিত্রের বাস্তবতা যত অযৌক্তিক প্রমাণিত হোকনা কেন, রাম সেবকরা বলছেন, প্রমাণের কোন দরকার নেই, রাম ছিলেন, আছেন, এবং বাবরী মসজিদের নিচেই জন্মেছেন। এনিয়ে কোন তর্ক চলবে না। এরজন্য তারা ৪৯০ বছর আগে নির্মিত ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদটি ভেঙ্গে চুরচুর করেছে। সংখ্যালঘুদের পীড়ন করে ‘জয় শ্রী রাম’ উচ্চারণ করতে বাধ্য করছে, ইতিহাসের জঘন্যতম বর্বর গণহত্যা চালাচ্ছে, আস্ফালন করে বলছে, রামরাজ্যে মুসলমান আর শম্বুকশূদ্রদের ঠাঁই দেয়া হবেনা!

রাম জন্মভূমি সমস্যার সৃষ্টি হল কিভাবে?

রাম জন্মভূমি কথাটার সূত্রপাতও হয়েছিল এক আজগুবি ঘটনা থেকে। ‘ডিভাইড এ্যান্ড রুল’ পন্থায় শাসন নীতিতে তৎপর ব্রিটিশ আমলাদের ফয়েজাবাদ সংক্রান্ত নথিতে রামমন্দির গল্পটি প্রথম ঢোকানো হয় ১৯শতকের দিকে। গল্পটির জন্ম, ‘বাবরনামার’ অনুবাদিকা Annette Susannah Beveridgeএর একটি পাদটীকার সূত্র ধরে। উক্ত টীকায় বিভারিজের বক্তব্যটি ছিল এরকম—‘বাবর যেহেতু পয়গম্বরের অনুগামী, তাই অন্য ধর্মের প্রতি তার অসহিষ্ণু হওয়ারই কথা। তিনি নিশ্চয় বিধর্মীর মন্দির ভেঙ্গে সেই স্থানে মসজিদ বানানোকে ধর্মসম্মত কর্তব্য পালন ভেবে থাকবেন! বিভারেজের এই মনগড়া মন্তব্য থেকেই ভারতের আর্য হিন্দুরা রামজন্মভূমির খোঁজ পেয়ে গেলেন। শুরু হল মসজিদ নিধন যজ্ঞ।

সব কাকেরই এক রা। বাবরী মসজিদে নামাজ পড়ার অধিকার কেড়ে নিয়ে তালা ঝুলিয়েছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু ১৯৪৯ সালে। বাবরী মসজিদ এলাকায় মন্দিরের শিলান্যাস করা হয় রাজীব গান্ধীর আমলে। আর কমান্ডো স্টাইলে দলবেঁধে বাবরী মসজিদ গুড়ো করে দেয়া হয় ১৯৯২ সালে নরসীমা রাও এর আমলে। এরা সবাই ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশধারী অহিংসার পূজারী নামে পরিচিত। কিন্তু এই ঘৃণ্য কাজের জন্য আর্য জনগোষ্ঠীর কারও মুখ থেকে ‘আহ’ শব্দটি পর্যন্ত শোনা যায়নি। এটাই আর্য সভ্যতা!

একজন মুসলমান হিসাবে আমি কোনদিনই সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ছিলাম না! তাই তথাকথিত আর্যহিন্দুদের মুসলমান নিপীড়ন, নিধন, শতশত মসজিদ নিধনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হওয়া সত্বেও চুপ থাকতাম। বর্তমান ভারতে বর্বরতার সীমা অতিক্রম করে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মনে হচ্ছে, নাহ! দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, এবার শুধিতে হইবে ঋণ।

শুধু কি বাবরী মসজিদ! ৪৭ এর পর ভারতীয় মুসলমানদের সংখ্যালঘুত্বের সুযোগ নিয়ে সেখানে তিন হাজার বারের মত দাঙ্গা বাধিয়ে ওরা লক্ষ লক্ষ মুসলমানদের হত্যা করেছে। ভারতীয়দের মুসলমান নিধন, ব্রিটিশদের দু’শ বছরের মুসলমান হত্যা কিংবা ইসরায়েলীদের প্যালেস্টানি মুসলিম হত্যাকেও ম্লান করে দিয়েছে! ‘৪৭ এর পর শতশত মসজিদ, মাজার, ঈদগাহ, এবং ওয়াকফ সম্পত্তি ওরা ধংস, জবরদখল, বাজেয়াপ্ত করেছে।

শুধু কি ধর্মনিরপেক্ষবাদী কংগ্রেস আর, উগ্র হিন্দুত্ব বাদী বিজেপি শাসকদের আমলেই ভারতীয় মুসলমানরা জান-মাল নিয়ে বাঁচতে পারছেনা! তথাকথিত প্রগতিশীল নামধারী কম্যুনিস্ট শাসন আমলেও পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা নিরাপদ ছিলনা! বামফ্রন্টের আমলে দাঙ্গা নামক মুসলমান হত্যার কথা মিডিয়ায় ছাপা নিষিদ্ধ ছিল।

১৯৭৭ সালে জ্যোতি বসু সরকার পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মুসলিম লীগ সংসদ সদস্য হাসানুজ্জামানের প্রশ্নের উত্তরে তৎকালীন বিচার মন্ত্রী হাসিম আব্দুল হালিম পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভায় লিখিত ভাবে জানিয়ে ছিলেন—কলিকাতা আমহার্ষ্ট স্ট্রিটে ১০নং ছকু খানসামা লেনের মসজিদে কর্পোরেশনে ৫-৬ শ্রমিক বাস করছে, বেলেঘাটার ৩৮ নং লতাফত হোসেন লেনের মসজিদটি কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক অলোক দাস ও সন্তোষ দাস বেআইনিভাবে দখল করে রেখেছে। হাওড়া জেলায় লিলুয়া থানার একটা মসজিদে সি পিআই সমর্থক মোহানা নামে ক্লাব ঘর করেছে। ১০১(১১৮) উল্টোডাঙ্গা রোডের মসজিদটিতে শূকর রাখা হয়। প্রগতিশীল কম্যুনিস্টের ২২ বছর ব্যাপী সুদীর্ঘ শাসন আমলে কি এইসব শতশত দখলীকৃত মসজিদ উদ্ধার হয়েছিল? না হয়নি! এসব ঘটনাতো আমার দেখে আসা ৬০-৭০ আগের ঘটনা। বর্তমান ভারতের মুসলমানরাতো নাজী টর্চার সেলে বাস করছে। সরকারি বাহিনীসহ ফ্যানাটিক হিন্দু রামসেবক বাহিনী মুসলমানদের দেখলে প্রকাশ্য রাস্তায় নেড়ী কুকুরের চাইতেও নির্মম ভাবে পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙে দিচ্ছে, এ চিত্র ভারতের নিত্যদিনের খবরের কাগজে পাওয়া যায়। সবাই দেখছে, কোন প্রতিকার নেই।

জায়নবাদি ইসরালাইলের মত হিন্দুত্ববাদী ভারতের পেটের মধ্যে ১৮ কোটি মুসলমানের দেশ, বাংলাদেশের অবস্থান। পরধর্ম বিদ্বেষ, মানুষ হত্যা, সভ্যতা বিনাশই যাদের ঐতিহ্য সেই হিন্দুত্ববাদী ভারতের হাতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ও তার ১৭কোটি মুসলমান আজ জিম্মি হয়ে পড়েছে একথা দেশবাসী হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে। একটি পতাকা ছাড়া বাংলাদেশের সবকিছুতে ভারতের অধিকার প্রতিষ্ঠিত। কেয়ার টেকারের মত, ভারতের অর্থও সুবিধাপুষ্ট আওয়ামীলীগ নামক একটি দল ও উক্ত দলের নেতা-নেত্রী দেশ শাসন করছে। তাদের কথায় ‘ভারত নাকি বাংলাদেশের পরিক্ষিত বন্ধু’! জায়নবাদি ইহুদীরা যেমন মুসলমানদের বন্ধু হতে পারেনা, তেমনি হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়রা কোনদিন মুসলমানদের বন্ধু হতে পারে না, একথা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। দেশের মানুষ আজ দিশাহারা!

বাংলাদেশের মানুষের সামনে আজ একটি দেশের উদাহরণ রেখে লেখা শেষ করবো। দেশটি হল কাশ্মীর রাজ্য! বাংলাদেশের চাইতে বড় ৮৭ হাজার বর্গমাইলের দেশ ছিল হিমালয় কন্যা কাশ্মীর রাজ্য, যাকে মুসলমান শাসকরা ভূস্বর্গ নামে অভিহিত করেছিল। আজও সেখানে ৯৭% মুসলমান বাস করে। একবার খবর নিয়ে দেখুন হিন্দুত্ববাদী শকুনের ধারালে ঠোঁট আর নখর থাবার পীড়নে কাশ্মীরবাসী দিন কিভাবে যায় রাত কিভাবে আসে!

বাংলাদেশের মত বন্ধু সম্পর্ক গড়ে এক স্বার্থবাদী নেতা নিজের স্বার্থে কাশ্মীরবাসীদের জিম্মি করে এভাবেই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল। তার নাম ছিল শেখ আবদুল্লাহ। সে ও ছিল এক ‘শেখ’! সেই শেখের পাওনা কাশ্মীর বাসীরা আজ ৭৬ বছর ধরে কি ভাবে শোধ দিচ্ছে, বাংলাদেশের জনগন একটু চোখ মেলে দেখলে তাদেরই উপকার হবে! সুতরাং ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিওনা!

লেখক: আরিফুল হক , বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বহু গ্রন্থের লেখক