• ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৩ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

মধ্যরাতে যেভাবে উত্তাল হলো সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় , আবাসিক হলগুলো থেকে মিছিল রাজপথে

usbnews
প্রকাশিত জুলাই ১৫, ২০২৪
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

এমজেড আলম , বাংলাদেশ থেকেঃ কোটা’ সংস্কার নিয়ে প শেখ হাসিনার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তপ্ত হয় ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। রাতেই শিক্ষার্থীরা আবাসিক হলগুলো থেকে মিছিল নিয়ে রাজপথে নেমে আসেন। এ সময়, ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার-রাজাকার’, ‘কে বলেছে কে বলেছে, সরকার-সরকার’, ‘রাজাকার আসছে, রাজপথ কাঁপছে’, ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’-সহ বিভিন্ন স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠে ক্যাম্পাস।

ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে শুরু হলো –
ঘটনার সূত্রপাত রোববার (১৪ জুলাই) বিকেলে গণভবনে চীন সফর উপলক্ষ্যে আয়োজিত প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের পর থেকে। যদিও কয়েক দিন ধরে কোটা-বিরোধী আন্দোলনে রাজপথ উত্তাল করে রেখেছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ কেন? তাদের নাতিপুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে? এটা আমার দেশবাসীর কাছে প্রশ্ন। তাদের অপরাধটা কি? নিজের জীবন বাজি রেখে, নিজের পরিবার সব ফেলে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে, দিন-রাত খেয়ে না খেয়ে, কাদামাটি পেরিয়ে, ঝড়বৃষ্টি সব মোকাবিলা করে যুদ্ধ করে বিজয় এনে দিয়েছে। বিজয় এনে দিয়েছে বলেই তো আজ সবাই উচ্চপদে আসীন। আজ গলা বাড়িয়ে কথা বলতে পারছে। তা না হলে পাকিস্তানিদের বুটের লাথি খেয়ে থাকতে হতো।

যেভাবে আন্দোলন ছড়িয়ে পরে

শেখ হাসিনার এমন বক্তব্য অত্যন্ত ‘অবমাননাকর’ দাবি করে মধ্যরাতে একযোগে প্রতিবাদে নামেন দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

এছাড়াও এ অসন্তোষের আগুনে ঘি ঢালে ‘বৈষম্য-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদের ওপর হামলার ঘটনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলগেটে আটকে রাখা শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করতে গিয়ে হামলার শিকার হন আসিফ মাহমুদ। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে হল থেকে দলে দলে বেরিয়ে আসতে থাকেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তপ্ত এ পরিস্থিতির ঢেউ লাগে দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা হল থেকে বের হয়ে অবস্থান নেন রাজপথে। কোটা-বিরোধী বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে বিভিন্ন ক্যাম্পাস।

রোববার রাত ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হল থেকে বের হয়ে টিএসসিতে অবস্থান নেন।

হাজী মুহম্মদ মুহসিন হল, সূর্যসেন হল, বিজয় একাত্তর হল, জিয়াউর রহমান হল, বঙ্গবন্ধু হল, জসিম উদদীন হলসহ সব হল থেকে শিক্ষার্থীরা হলপাড়ায় মিছিল নিয়ে এসে সমবেত হন। এছাড়া শহীদুল্লাহ হল, জগন্নাথ হল, এফএইচ হল, একুশে হলের শিক্ষার্থীরা জড়ো হন টিএসসিতে। পরে টিএসসি থেকে মিছিল নিয়ে তারাও হলপাড়া গিয়ে যোগ দেন।

নারী শিক্ষার্থীরাও বের হয়ে
একই সময়ে বিভিন্ন হলের গেটের তালা ভেঙে রাস্তায় নামতে দেখা যায় ঢাবির নারী শিক্ষার্থীদেরও। তাদের হাতে থালা, বাটি, গ্লাস, ঝাড়ুসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র দেখা যায়। এসময় শামসুন্নাহার হল, রোকেয়া হল, সুফিয়া কামাল হল, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল ও বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হল থেকে নারী শিক্ষার্থীরা গেটের তালা ভেঙে রাস্তায় বের হয়ে আসেন।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ক্যাম্পাস ও রাজপথে জড়ো হন। এ সময় তাদের মুখে শোনা যায়, ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার-রাজাকার’, ‘কে বলেছে কে বলেছে, সরকার-সরকার’, ‘রাজাকার আসছে, রাজপথ কাঁপছে’, ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ প্রভৃতি স্লোগান।

শিক্ষার্থীরা জানান, চলমান সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে কিছুদিন ধরে উত্তপ্ত দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়। এরই মাঝে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেই বক্তব্য তাদের স্তম্ভিত ও ব্যথিত করেছে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, আমাদের কোটা আন্দোলন মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ছিল না। এটি আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যে বৈষম্য তৈরি করেছে, তার বিরুদ্ধে আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ছিল। কিন্তু আমরা প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে দেখতে পেলাম যে, তিনি দেশের শিক্ষার্থীদের হেয়-প্রতিপন্ন করে বক্তব্য দিয়েছেন। আমরা অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীকে বলব, আপনি আপনার বক্তব্য প্রত্যাহার করবেন। পাশাপাশি আমাদের ছাত্রসমাজের এক দফা দাবি মেনে নিয়ে সংসদে আইন পাস করার ব্যবস্থা করবেন।

পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেয়া হলো –

অন্যদিকে, রাজু ভাস্কর্যের সামনে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বৈষম্য-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। সোমবার (১৫ জুলাই) দুপুর ১২টা থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রত্যাহার এবং এক দফা দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করবে বৈষম্য-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন।অপরদিকে, বিকেল ৩টায় রাজু ভাস্কর্যের সামনে প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের এক দফা দাবি হলো, সব গ্রেডে সব ধরনের অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে সংবিধানে উল্লিখিত অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য কোটাকে ন্যূনতম পর্যায়ে এনে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে কোটা পদ্ধতিতে সংশোধন আনা।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের দাবিকে ন্যায্য মনে করেন অভিজ্ঞ মহল। উত্তেজনা নিরসনে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সংযত আচরণের বিষয়ে দলীয়ভাবে ঘোষণা না দিলে সহিংসতা বাড়বে বলে মনে করেন সচেতন মহল।

 

INQ