বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছিল।সেই দিনটি ছিলো ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর । ১৫২৭ খ্রীষ্টাব্দে ভারতের প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর কোন স্থাপনা ছিল না সম্পূর্ণ খালি জায়গায় বাবরি মসজিদ নির্মাণ করেন।
১৯৯২ সালের ৬ডিসেম্বর সাম্প্রদায়িক বিজেপি ও তাদের সহযোগী দলগুলোর রাজনৈতিক সমাবেশের উদ্যোক্তারা, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে, মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় একটি রাজনৈতিক সমাবেশ শুরু করে,পরবর্তীতে সমাবেশকারীরা মসজিদটি সম্পূর্ণরূপে ভূমিসাৎ করে দেয়।
বাবরি মসজিদ: ভারতের অযোধ্যায় মসজিদ ভাঙ্গার ঘটনা ‘পূর্ব পরিকল্পিত ছিল না’, সব আসামিকে অব্যাহতি দিয়েছে আদালত (৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০)
বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পর ১৯৯৩-র অক্টোবরে বিজেপি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল প্রভৃতি সংগঠনের ৪০ জন শীর্ষ নেতাকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেছিল ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই।
ষোড়শ শতকে মোঘল সম্রাট বাবরের সময় তৈরি করা বাবরি মসজিদ ১৯৯২-এর ৬ই ডিসেম্বরে হিন্দুত্ববাদী ভিএইচপি, বিজেপি এবং শিবসেনা পার্টির সদস্যরা ধ্বংস করে।
কিছু হিন্দুদের মতে, মসজিদের ওই জায়গাটি ছিল হিন্দুধর্মের অন্যতম আরাধ্য দেবতা রামের জন্মস্থান এবং সেখানে মসজিদ হওয়ার আগে একটি মন্দির ছিল।
১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পর হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে হওয়া দাঙ্গায় ভারতে দুই হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। ( বিবিসি )
অধ্যাপক নাজমা রেহমানি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে বলেছিলেন –
“আমার প্রশ্ন হল, বাবরি মসজিদই বলুন বা বিতর্কিত কাঠামো – আজও যদি সেটা অক্ষত অবস্থায় ওখানে দাঁড়িয়ে থাকত, তাহলেও কি সুপ্রিম কোর্ট আজকের এই রায় শোনাতে পারত?”
তা ছাড়া প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের (আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া) একটি রিপোর্টকে আদালত সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। কিন্তু সেই রিপোর্টের কি ঠিকমতো বিশ্লেষণ করা হয়েছিল?
আমি বলতে চাইছি, ওই রিপোর্টের বক্তব্য অনুযায়ী কোর্ট মেনে নিয়েছে মসজিদের নিচে কিছু একটা স্থাপনা ছিল। কিন্তু সেটা কি কোনও মন্দির, বা মন্দির হলেও রামের মন্দির না কি অন্য কোনও দেবতার – সেটাই বা কে বলল?
আসলে প্রশ্নটা তো শুধু এক টুকরো জমির নয়, এখানে ভারতের সামাজিক সম্প্রীতির চেহারা কিংবা এ দেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থানের চিত্রটাও কিন্তু এই মামলার সঙ্গে জড়িত।
ড: মীরাতুন নাহার আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে বলেছিলেন –
একটা সম্পূর্ণ ‘তৈরি করা বিবাদ’ যে এভাবে দেশের শীর্ষ আদালত পর্যন্ত গড়াতে দেওয়া হল, আমি তাতে প্রচন্ড ক্ষুব্ধ।
দেশপ্রেমী একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে আমি ভাবতেই পারি না, যাদেরকে আমরা দেশের ক্ষমতায় বসিয়েছি তারা কীভাবে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিকে এভাবে উসকানি দিতে পারেন!
শুধুমাত্র নিজেদের সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থের কথা ভেবে তারা ভারতের মহান সংবিধানকেও অপমান করলেন।
জমির দখল নিয়ে বিবাদ, সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ দুটো পরিবারের মধ্যে হয়, কখনও বা কোর্টেও গড়ায় – এটাই চিরকাল জেনে এসেছি।
কিন্তু সেই জমির বিবাদকে ঘিরে দেশের দুটো ধর্মীয় সম্প্রদায়কেও যে লড়িয়ে দেওয়া যায় তা কখনও ভাবতেও পারিনি – আর সে কারণেই পুরো বিষয়টা আমার কাছে এতটা কষ্টদায়ক!
আজকের রায় নিয়ে আর কী বলব? কোর্টে গেলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে, তাই সেটা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার মানে হয় না।
আমার প্রশ্ন তাই একটাই, এই যে বিবাদ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া হয়েছিল সেটা কি আপনা থেকেই তৈরি হয়েছিল না কি সচেতনভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল?
মুম্বাইতে ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলনের কর্ণধার ও সমাজকর্মী নূরজাহান সাফিয়া নিয়াজ, দিল্লিতে রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্ট ও অধ্যাপক নাজমা রেহমানি এবং কলকাতায় শিক্ষাবিদ ড: মীরাতুন নাহার।
জানুয়ারি ২০০৩: ঐ স্থানে ইশ্বর রামের মন্দিরের নিদর্শন আছে কিনা, তা যাচাই করতে আদালতের নির্দেশে নৃতত্ববিদরা জরিপ শুরু করেন। কিন্তু কিছুই খুঁজে পায়নি তারা।
সেপ্টেম্বর ২০০৩: বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পেছনে উস্কানি দেয়ায় সাত জন হিন্দু নেতাকে বিচারের আওতায় আনা উচিত বলে রুল জারি করে একটি আদালত। তবে সেসময়কার উপ-প্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানির – যিনি ১৯৯২ সালে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন – বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি।
অক্টোবর ২০০৪: বিজেপি নেতা আদভানি জানান তার দল এখনও অযোধ্যায় মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তা ‘অবশ্যম্ভাবী।
নভেম্বর ২০০৪: উত্তর প্রদেশের একটি আদালত রায় দেয় যে মসজিদ ধ্বংস করার সাথে সম্পৃক্ত না থাকায় মি. আদভানিকে রেহাই দিয়ে আদালতের জারি করা পূর্ববর্তী আদেশ পুনর্যাচাই করা উচিত।
নভেম্বর ২০১৯: সে জায়গাটিতে মন্দির তৈরির পক্ষেই চূড়ান্ত রায় দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।