
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কলেজে মুসলিম ছাত্র ভর্তি নিষিদ্ধ ছিল। আর এই নিষিদ্ধের কাজটি ঈশ্বরচন্দ্র নিজেই লিখিত ঘোষণা দিয়েই করেন।
১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন ।
বাংলার হিন্দু নবজাগরণের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব দেশের হিন্দু জনসাধারণের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘দয়ার সাগর’ নামে। কিন্তু প্রতিবেশী সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় তিনি কিছুই করেননি এমনকি তার প্রতিষ্ঠিত কলেজে মুসলমানদের পড়াশোনা করার সুযোগ তিনি উইল করে নিষিদ্ধ করেছিলেন ।
উনিশ শতকের বঙ্গীয় রেনেসা পাশ্চাত্যের ধারায় নবজন্ম না হয়ে হিন্দুত্ববাদের পুনর্জন্ম(Revivalism)হিসেবে জায়গা করে নেয় । বাংলার এই হিন্দু পুনর্জন্মবাদের প্রবক্তা ছিলেন উচ্চবর্ণের হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা । রামমোহন,রামতনু লাহিড়ী,ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর,বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন এধারার হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের শীর্ষস্থানীয় নেতা ।
ইংরেজের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষার সংস্কার সম্পর্কে আবদুল মওদুদ লিখেছেন:তা কেবল সংস্কৃতঘেঁষা নয়,একেবারে সংস্কৃতসম । আর এটিও হয়েছে সুপরিকল্পিত সাধনায়-হিন্দু পন্ডিতরা উল্লসিত হলেন ।–মুসলমানের মুখের ভাষা কেড়ে নিয়ে তাকে সাহিত্য ও কালচারের দিক দিয়েও নিঃস্ব করে দিতে । (মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ,পৃষ্ঠা৩৮৫)
অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছেন – অনেকেই বলতে চাচ্ছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন উদার ও অসাম্প্রদায়িক কিন্তু বাস্তবের সাথে এর মিল নেই । বিদ্যাসাগর কলেজে মুসলমান ছাত্রদের ভর্তি হওয়ার সুযোগ ছিল না ।
১৫৫৬ সালে আকবরের ক্ষমতারোহণের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের ধ্রূপদী যুগ শুরু হয়। সেই আমলে হিন্দুদের বিধবা প্রথার করুন কাহিনী শুনে মোগল শাসকেরা শান্তির নীতিতে হিন্দুদের নিয়ে আসেন। হিন্দু কথিত পন্ডিতরা বিরোধিতা করেন কিন্তু নিচু বর্ণের হিন্দুরা সেটা মেনে নিতে আগ্রহী হয়। ধীরে ধীরে সেটাই কার্যকর হয়। অথচ বলা হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিধবা বিয়ে নিয়ে মহাবিপ্লব করেন।
আরেকটি কথা প্রায় পিচঢালা করে দেয়া হয়েছে। কেউ স্বীকার করে না। সেটা হলো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন জনগণের বাংলা ভাষা হত্যাকারী!তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের সহযোগিতা নিয়ে সুলতানী আমলের বাংলাভাষাকে হত্যা করেছিলেন । বাংলা ভাষা থেকে আরবী/ফার্সি শব্দকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন । তিনি তৈরি করেছেন সংস্কৃত ঘেঁষা হিন্দুয়ানী বাংলাভাষা ।
১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর, হঠাৎ ব্রিটিশ সরকারের টনক নড়ে— এখন তো কোম্পানির শাসন নেই; ভারতীয় মুসলমানরা এখনও কেন মহারানির বিরোধিতা করছে? ভাইসরয় লর্ড মেয়ো বিষয়টি দেখার ভার দেন ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারকে। ১৮৭১ সালে হান্টার লিখলেন দ্য ইন্ডিয়ান মুসলমানস নামে একটি সন্দর্ভ বই আকারে। ডেপুটি কালেক্টার পদে বীরভূমে থাকার অভিজ্ঞতা-সূত্রে কাছ থেকে দেখেছেন সেখানকার মুসলমানদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দখল নেওয়ার আগে যে-পরিবারের বাৎসরিক আয় ছিল পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড। সেই বই থেকে হান্টারের একটি বাক্য এখানে রইল—
‘A hundred and seventy years ago it was almost impossible for a well-born Musalman in Bengal to become poor; at present it is almost impossible for him to continue rich.’ (পৃষ্ঠা ১৫৮)
হান্টার লিখেছেন,
“এ পর্যন্ত যে সব হিন্দু গোমস্তা অত্যন্ত ছোটখাট স্তরের কাজে নিযুক্ত ছিল,চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে তারা সবাই জমিদার বনে গেল,জমির মালিকানা স্বত্ব লাভ করলো এবং তাদের ঘরে সেই সব ধনদওলত জমা হতে লাগলো যেগুলি পুর্বে মুসলমানদের আমলাদারিতে তাহাদের ঘরেই জমা হতো ।”
পারসিয়ান পণ্ডিত ও যন্ত্রপ্রকৌশলী ফতুল্লাহ শিরাজী সম্রাট আকবরের জন্য কয়েক ব্যারেল বিশিষ্ট বন্দুক তৈরি করেছিলেন। (সূত্র – Journal of History of Science। New দিল্লি: ভারতn National Science Academy। 40 (3): 431–436। )
আকবর সর্বপ্রথম ধাতব সিলিন্ডারের রকেট ব্যবহার করেন। সানবালের যুদ্ধের সময় যুদ্ধ হাতির বিরুদ্ধে এগুলো ব্যবহৃত হয়। (সূত্র – “Islamic Mughal Empire: War Elephants Part 3 )
১৬৫৭ সালে মুঘল সেনাবাহিনী বিদার অবরোধের সময় রকেট ব্যবহার করে।আওরঙ্গজেবের সেনারা দেয়ালের উপর রকেট ও গ্রেনেড ছুড়তে থাকে। বারুদের ভান্ডারে রকেট আঘাত করলে সিদি মারজান মারাত্মকভাবে আহত হন। ২৭ দিন তুমুল লড়াইয়ের পর বিদার মুঘলদের হাতে আসে। ( (সূত্র The Mughal Empire – Ishwari Prasad )
পরবর্তীতে মুঘল রকেটের উন্নত সংস্করণ মহীশুর রকেটের উদ্ভব হয়। হায়দার আলির বাবা ফাতাহ মুহাম্মদ আরকোটের নবাবের পক্ষে রকেট চালাতে সক্ষম ৫০ জন সেনার নেতৃত্ব দেন। হায়দার আলি রকেটের গুরুত্ব অনুধাবন করে ধাতব সিলিন্ডারের উন্নত সংস্করণের সূচনা করেন। দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশুর যুদ্ধের সময় এই রকেট ব্যবস্থা মহীশুর সালতানাতের জন্য সুবিধা নিয়ে এসেছিল।
উপরের ইতিহাস থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মের বহু বছর আগেই মুসলিম সমাজ পুরো ভারতকে সাজিয়েছে। ভাষা সৎকারের পর ও কি করে তার নাম হলো বিদ্যাসাগর নামটি এখনো খুব বেমানান।