আজাদী আন্দোলন ১৮৫৭-
অখ্যাতদের নেতা বানিয়েছে কথিত ইতিহাস রচয়িতাগণ। ইতিহাসে লোকানো হয়েছে মূল মানুষগুলোকে।
১৮০৩ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ক্ষমতা চলে যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। ঘটনা আকস্মিক ছিল না। বহুদিন আগে থেকেই ভারতের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা তাকে এই অনিবার্য পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছিল। চকিত হয়ে উঠল সবাই। যারা ঘুমিয়ে ছিল তারা জেগে উঠল, যারা বসে ছিল তারা দাঁড়িয়ে গেল। বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ ক্রমে ক্রমেই জমে উঠছিল।
এর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ তুললেন বিখ্যাত ধর্মীয় আলিম ও দার্শনিক শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী। মুসলমানদের হাত থেকে যেহেতু ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, কাজেই আঘাতটা মুসলমানদের মনেই বেশি করে বাজবে, এটা স্বাভাবিক। আর এই বিরোধিতা তাত্ত্বিক রূপ লাভ করেছিল শাহ ওয়ালিউল্লাহর ধর্মীয় মতামতের মধ্য দিয়ে। তিনি স্পষ্টই রায় দিলেন, ‘ইসলাম ধর্মীয় বিধান ও রাজনৈতিক ক্ষমতা, এই দুই ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। কাজেই এই পরাধীন পরিবেশে ইসলাম কখনই সজীবতা ও স্ফূর্তি লাভ করতে পারে না।’

তার এই সূত্রটির যুক্তিযুক্ত রূপায়ন ও অনুসরণের মধ্য দিয়ে তার শিষ্য প্রশিষ্যবর্গ বৃটিশ সরকারের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম শুরু হয়। তারই সুপুত্র আবদুল আজিজ হিন্দুস্তানকে দারুল হারব ঘোষণা দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরো জোরদার করে তোলেন। তার প্রেরণায়ই জেগে উঠেন সৈয়দ আহমাদ বেরেলভী। এখান থেকেই শুরু হয় মুসলমানদের সংগ্রাম, ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে। ব্যাপকভাবে এই আন্দোলনে মুসলমানরা সাড়া দিয়েছিল। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন যোগ্য উলামা ও শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ। যেমন, ফজলে হক খায়রাবাদী, মাওলানা কাসেম নানুতবী, রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহী, শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান, মৌলভী বরকতুল্লাহ, ওবাইদুল্লাহ দিন্ধী, রহমত আলী জাকারিয়া, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মওলানা মুহাম্মদ আলী, ড. সাইফুদ্দিন কিচলু, মুখতার আহমদ আনসারী, হাসরত মোহানী, মাওলানা হোসেন আহমদ মাদানী, হাবিবুর রহমান লুধিয়ানী প্রমুখ।
ফজলে হক খায়রাবাদী: তিনি (১৭৯৭ – ১৮৬১) ছিলেন একাধারে দার্শনিক, যুক্তিবিদ, ধর্মতাত্ত্বিক, কবি ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবে মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য তিনি জেহাদের ফতোয়া দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমেই তিনি আজাদী আন্দোলনের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। সিপাহী বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর ফতোয়ার অভিযোগে আন্দামান দ্বীপে নির্বাসন দেয়া হয় তাকে। সে দ্বীপে তাকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল, তার এক হৃদয় বিদারক বর্ণনা এবং উপমহাদেশে ইংরেজদের ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে সাথে থাকা কাপনের কাপড়ে কয়লা দিয়ে তিনি এক কিতাব লিখেছিলেন।
অবশেষে সারা দুনিয়াব্যাপী বিশ্বখ্যাত এ জ্ঞান সাধকের কারা নির্যাতনের প্রতিবাদ ও আল্লামা খায়রাবাদী (রাহঃ)-এর জ্ঞান-প্রতিভার প্রতি আকৃষ্ট উর্ধ্বতন এক ইংরেজ কর্মকর্তার জোর তদবিরে কয়েক বছর পর তাকে বৃটেনের প্রিভি কাউন্সিল মুক্তির নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়। এ মুক্তির নির্দেশনামা নিয়ে খায়রাবাদীর ছেলে যখন আন্দামানে গিয়ে উপস্থিত হলেন, দেখলেন আন্দামানবাসীরা একটি জানাজার নামাজে মিলিত হচ্ছেন। উক্ত জানাজায় শরীক হয়ে জানতে পারলেন এটা তার পিতা বিশ্বখ্যাত জ্ঞান সাধক আল্লামা খায়রাবাদী’র জানাজা। অবশেষে এক হৃদয় বিদারক ঘটনা অবতারণার পর পিতার কাফনে লিখিত কিতাবখানি নিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছিল তাকে।
আল্লামা ফজলে হক খায়রাবাদী’র শত শত কিতাবের মধ্যে এটিও একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী কিতাব, যাতে ব্রিটিশ শাসনের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। গ্রন্থটি পরবর্তীতে ‘আস-সাওরাতুল হিন্দিয়াহ’ নামে প্রকাশিত হয়। আরবি থেকে বিভিন্ন ভাষায় এটি অনূদিত হয়।