সুনামগঞ্জ, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ (বাসস) : বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিজয় মিছিলে গিয়ে নিভে গেলো মাদ্রাসা ছাত্র আয়াতুল্লাহ’র বড় আলেম হওয়ার স্বপ্ন। গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনার পতনের পর বিজয় মিছিলে যোগ দিয়ে শফিপুর আনসার একাডেমির সামনে শহিদ হন আয়াতুল্লাহ।
পুত্রশোকে কাতর শহিদ আয়াতুল্লাহ’র পিতা সিরাজুল ইসলাম বাসসকে বলেন, “গত ৫ আগস্ট সোমবার গাজীপুরের শফিপুরে অবস্থিত আনসার ভিডিপি একাডেমির সামনে গুলিবিদ্ধ হয় আমার ছোট ছেলে মো.আয়াতুল্লাহ (১৯)। বড় ভাই সোহাগ মিয়ার সাথে ওইদিন সে স্বৈরাচার হাসিনার পতনের পর বিজয় মিছিলে যোগ দিয়েছিল। মিছিলটি বিকেল পাঁচটার দিকে কালিয়াকৈরের মৌচাক পয়েন্ট থেকে আনসার একাডেমির কাছে পৌঁছালে এলোপাতাড়ি গুলি আসতে থাকে। এতে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে ছাত্র-জনতা। দুই ভাই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সাড়ে ৫টার দিকে আয়াতুল্লাহর সঙ্গে মোবাইল ফোনে সর্বশেষ কথা হয় সোহাগের। এরপর থেকে ফোন রিসিভ হচ্ছিলো না। কোথাও খোঁজ মিলছিল না আয়াতুল্লাহর।”
তিনি বলেন, “ছেলের সন্ধানে গ্রামের বাড়ী থেকে গাজীপুর ছুটে যাই আমি। ধর্না দেই আনসার একাডেমিতে। সন্ধান চাই ছেলের, জীবিত না থাকলে লাশটি অন্তত ফেরত পাওয়ার আকুতি জানাই। কিন্তু কোনো সহযোগিতা পাইনি সেখান থেকে। ছুটে যাই একের পর এক হাসপাতাল ও ক্লিনিকে। লাশের স্তুপে খুঁজতে থাকি নিজের সন্তানকে। এরপর শূন্য হাতে বাড়ি ফিরে আসি। ”
তিনি জানান, ঘটনার পর গাজিপুর জেলার কালিয়াকৈর থানায় ছোট ভাইয়ের সন্ধান চেয়ে বড় ভাই মোঃ সোহাগ মিয়া থানায় জিডি করে (জিডি নং ৩৭৫ তাং ১৬/৮/২০২৪ইং)।একটি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত খবরের সূত্রে ১১ দিন পর ১৬ আগস্ট ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে আয়াতুল্লাহর লাশের সন্ধান পায় তার পরিবার। সেখান থেকে ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সহায়তায় ১৭ আগস্ট শনিবার বিকেলে হাসপাতাল থেকে লাশটি গ্রহণ করেন তিনি। ওইদিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে স্থানীয় উব্দাখালী নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুর ওপর জানাজা শেষে রাত আড়াইটার দিকে গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার চামারদানী ইউনিয়নের জলুষা গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে আয়াতুল্লাহ’র লাশ দাফন করা হয়।
ছেলের কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন আয়াতুল্লাহ’র পিতা সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, “আয়াতুল্লাহকে বড় আলেম বানানোর ইচ্ছে ছিলো। আমার ছেলেকে যারা খুন করেছে তাদের বিচার চাই। খুনির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, আয়াতুল্লাহর পিতৃভিটা সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার চামারদানী ইউনিয়নের জলুষা গ্রামে। তার দাদা মরহুম আব্দুর রহীম কালারচান ফকির এলাকার একজন মরমী সাধক ছিলেন। এছাড়া ১৯৭১’ এর মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বিত্তবান সালিশী ব্যক্তিত্বও ছিলেন তিনি।
মো.আয়াতুল্লাহ’র জন্ম ২০০৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর গ্রামের বাড়ীতে। মো. সিরাজুল ইসলাম ও মাতা শুভা আক্তার দম্পতির চার ছেলেমেয়ের মধ্যে আয়াতুল্লাহ সবচেয়ে ছোট। তিনি গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক কলাবাঁধা এলাকাধীন দক্ষিণ ভান্নারাস্থ মারকাযুল ঈমান মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি একটি নূরানী মাদ্রাসায় কিছুদিন শিক্ষকতাও করেছেন। সময় দিয়েছেন তাবলীগেও।
দরিদ্র পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে এ বছর জুলাই মাসে খণ্ডকালীন চাকুরিতে যোগ দেন গাজীপুরের এক ইন্ডাস্ট্রিতে। বড় ভাই সোহাগের সাথে কালিয়াকৈরের জামতলা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। পলাতক স্বৈরাচার সরকারকে রক্ষায় মারমুখী আনসার বাহিনীর গুলিতে তার সব স্বপ্ন রক্তের উজানে ভেসে গেছে।