মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের শান প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে জান্তা বাহিনী। এতে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। হামলায়, লাসিওর মূল সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় শহরটির সঙ্গে আশপাশের এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার এ খবর জানিয়েছে মিয়ানমার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরাবতী। মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর জোট থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের সঙ্গে জান্তা সেনাদের ব্যাপক লড়াই চলছে। গেল অক্টোবর থেকে জোরদার হওয়ায় এই লড়াইয়ে এরইমধ্যে বিভিন্ন শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে জোটটি। তবে শহরের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে মরিয়া জান্তা বাহিনী পাল্টা বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম ইরাবতী জানিয়েছে, শান প্রদেশের প্রধান শহর লাসিওর বেশ কয়েকটি গ্রামে বিমান হামলা চালায় জান্তা সেনারা। এতে বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক হতাহত হন বলেও জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সও। খা মং ওয়া এলাকায় হামলা চালিয়ে জান্তা বাহিনীর কয়েকটি সেনা চৌকি দখল করে নিয়েছে গোষ্ঠীটি। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই দেশটির চিন রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চল থেকে জান্তাবাহিনীকে বিতাড়িত করার ঘোষণা দিয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, এখনো বেশ কয়েকটি ছোট ও বড় ঘাঁটির জান্তা সেনারা আত্মসমর্পণ করেনি। তবে শিগগিরই তাদের এসব ঘাঁটি থেকে নির্মূল করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে আরাকান আর্মি।
অপর এক খবরে বলা হয়, এক সময় স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন ২৬ বছরের অ্যাঞ্জেলিক মো। কিন্তু এখন তিনি একদল নারী সেনাদের ইউনিট কম্যান্ডার। তিনি ‘কারেনি ন্যাশনালিটিস ডিফেন্স ফোর্স’ বা কেএনডিএফ বাহিনীর সদস্য। মিয়ানমারের পূর্বাঞ্চলীয় কায়াহ প্রদেশে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ গড়ে তুলেছে এই বাহিনী। মো বলেন, আমি বেশ কয়েকবার ফ্রন্টলাইনে গিয়েছি। আমার মনে আছে, আমি একবার জান্তা সেনাদের থেকে মাত্র ৫০ মিটার দূর থেকে যুদ্ধ করছিলাম। আমাদের যোদ্ধারা তাদের আগেই দেখে ফেলে এবং গুলি চালায়। যদি আমরা আগে তাদের না দেখতাম তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমাদের সবাইকে মরতে হতো। জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বাহিনীগুলোর মধ্যে কেএনডিএফ শক্তির বিচারে প্রথম দিকে থাকবে। মূলত স্থানীয় তরুণদের নিয়ে এই বাহিনী গঠিত।
এছাড়া মিয়ানমারের জাতিগত বিদ্রোহী গ্রুপ কারেনি আর্মিও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই যুদ্ধে যোগ দেয়ার আগে মো একটি পাবলিক স্কুলে পাঁচ বছর ধরে কাজ করেন। তিনি কখনও কল্পনাও করেননি যে তাকে বন্দুক ধরতে হবে। তিনি বলেন, সেই সময় আমি জানতাম না এর পরিণতি কী হবে। আমার দাদা-দাদি আমাকে সাবধান করেছিলেন। কিন্তু তিনি বিক্ষোভ এবং আইন অমান্য করে আন্দোলনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সামরিক শাসন নিয়ন্ত্রিত স্কুলগুলিতে চাকরি করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। সামরিক বাহিনী বিদ্রোহীদের দমনে প্রথম থেকেই কঠিন পথে হেটেছে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা দখলের পর তারা অন্তত ৪ হাজার ২০০ বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে। বন্দী করেছে ২০ হাজারের বেশি। মো প্রাথমিকভাবে সশস্ত্র প্রতিরোধে যোগ দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তার বন্ধুরা তাকে বারবার আহ্বান জানালেও তিনি আগ্রহী ছিলেন না। যুদ্ধ এবং বিমান হামলার তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার পরেও তিনি শিক্ষকতা চালিয়ে যান। কিন্তু দিন দিন পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে থাকে। এক পর্যায়ে তিনি অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মিয়ানমারের অনেক তরুণীই এই কাজ করেছেন। তারা একেকজন একেক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন। কেউ চিকিৎসক, কেউবা নার্স, শিক্ষক, গৃহিণী, বিক্রয়কর্মী ও সরকারী কর্মচারী।
কেএনডিএফ বলছে তাদের প্রায় ৬০০ নারী যোদ্ধা রয়েছে। ২০২২ সালের মে মাসে কেএনডিএফ সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে নারীডের অংশগ্রহণকে তুলে ধরতে একটি নারী ইউনিট প্রতিষ্ঠা করে। মো কমান্ডার হওয়ার আগে সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণ নেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি আমার পুরো জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল। তবে সব নারী সদস্য ফ্রন্টলাইনে যান না। কিছু আছেন যাদেরকে অন্যান্য দায়িত্ব দেয়া হয়। যেমন ফাঁড়ি এবং চেকপয়েন্ট পাহারা দেয়া। এখনও অন্যরা তহবিল সংগ্রহ এবং প্রশাসনিক পরিষেবাগুলির মতো সহায়ক কাজগুলি সম্পাদন করে। কেউ কেউ অস্ত্র সামলাতে চায় না। তবুও, তারা বিভিন্নভাবে এই বিপ্লবকে সাহায্য করে। ইরাবতী, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।