• ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

ছাত্র জনতার বিপ্লব : গৌরব গাঁথা , ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে শহীদ হন ইরফান ভূঁইয়া

usbnews
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৫
ছাত্র জনতার বিপ্লব : গৌরব গাঁথা ,  ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে শহীদ হন ইরফান ভূঁইয়া
নিউজটি শেয়ার করুনঃ
অন্যান্য ছবি রেখে এটাই বেছে নিলাম এ কারণে যে, যখন দেখবেন, ইরফানের প্রাণশক্তিও কেমন ছিল, ইরফানও কেমন জীবন যাপন করতে চাইত এবং করত, তখন আরো ভালোভাবে বুঝবেন, কেন শহীদ ইরফানের মত প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর ছেলেও এভাবে নিজেকে বিলায়ে দিয়েছে, আর কী ছিল এ জীবন বিলানোর মাহাত্ম্য! যারা কোনো দিন সরকারি চাকরি করবে বলে চিন্তাও করে না তারাও কোটা সংস্কারের লক্ষ্যে গড়ে উঠা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গিয়ে শহীদ হয়েছে, অকাতারে জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। শহীদ ইরফান ভূঁইয়া ছিল ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। নারায়ণগঞ্জে জন্মগ্রহণ করা ইরফান মাত্র ২১ বছর বয়সে ১৮ জুলাই ২০২৪ বৃহস্পতিবার জুলাই-আগস্ট ২০২৪ এর বিপ্লবের সময় শহীদ হয়। ১৮ জুলাই ২০২৪ বৃহস্পতিবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের সঙ্গে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) শিক্ষার্থী ইরফান ভূঁইয়া শহীদ হয়।
মো. ইরফান ভূইয়া ইউআইইউ’র কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই ২০২৪ সন্ধ্যার পর পুরান ঢাকার ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ঐদিনই রাত আটটার দিকে হাসপাতালটির ইন্টার্ন চিকিৎসক সজল বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, নিহত শিক্ষার্থীর আইডি কার্ড দেখে তার লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। ইরফান শহীদ হওয়ার পর হাসপাতালে ছিল তার লাশ, পরে স্বজনরা এসে তার লাশ নিয়ে আসে। এর আগে হাসপাতালটির ইন্টার্ন চিকিৎসক মাজহারুল ইসলাম নিহত শিক্ষার্থীর আইডি কার্ডের ছবি দিয়ে ফেসবুকের এক পোস্টে জানান, নিহত শিক্ষার্থীকে মৃত অবস্থায় ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়েছে। তাকে কেউ চিনে থাকলে জরুরি যোগাযোগ করবেন বলেও ফেইসবুকে পোস্ট করেন।
জুলাই বিপ্লবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান : জুলাই বিপ্লবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকার প্রশংসার দাবি রাখে। তাদের সম্পর্কে আগে মানুষের ভিন্ন রকম ধারণা ছিল। সেটা তারা বদলে দিয়েছে ৫ আগস্টে বিপ্লবের মধ্যদিয়ে। ৫ আগস্টের আগের বাংলাদেশ ও পরের বাংলাদেশের মধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তরুণ ছাত্ররা এ পরিবর্তন এনেছে। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের ফসল নতুন বাংলাদেশের সামনে বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। তরুণরাই পারবে এ পরিবর্তন ধরে রাখতে। ৫ আগস্টের আগের নৈরাজ্যের ক্যাম্পাসে এবং নৈরাজ্যের সড়কে আমরা আর ফিরতে চাই না। আমরা চাই, কোনো ক্যাম্পাসে আর একজনেরও রক্ত ঝরবে না। পুলিশ আর কোনোদিন ছাত্রদের বুকে গুলী চালাবে না। এসব পরিবর্তন কার্যকর করতে রাজনীতিবিদদের বাধ্য করতে হবে।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীর বর্ণনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই বিপ্লব : ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মোঃ মুশফিকুর রহমান (তুহিন) বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান সন্দেহাতীতভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে যৌক্তিক কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়ে সেটা পরবর্তীতে স্বৈরাচার পতন আন্দোলনে রূপ নেয়। আমরা যদি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে নজর দেই, গ্র্যাজুয়েশনের পর হয়তো পরিস্থিতির কারণে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে যোগ দেয়। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে চিন্তাও করে না যে, সে সরকারি চাকরিতে যোগ দিবে। এখানকার বেশিরভাগ শিক্ষার্থী বিদেশমুখী এবং বেসরকারি চাকরি করতে কিংবা উদ্যোক্তা হতেই বেশি আগ্রহী।
যেখানে সরকারি চাকরিতে যোগ দেয়ার আগ্রহ খুবই কম, সেখানে কোটা সংস্কার আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এভাবে রাস্তায় নামবে, আন্দোলনের অন্যতম মেরুদণ্ড হয়ে আন্দোলনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সেটা সরকারেরও সিলেবাসের বাইরে ছিলো। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলো নিঃস্বার্থভাবে দেশের প্রয়োজনে, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ভাই বোনদের প্রতি সহমর্মী হয়ে।
তিনি বলেন, সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যানারে প্রথম ১০ জুলাই শিক্ষার্থীরা রামপুরায় কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দেয়। যেখানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, গ্রিন ইউনিভার্সিটি ও ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরাসহ অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে এই আন্দোলন চলতে থাকে। শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যোগ দিয়েছিলো, ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতন পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে নিয়েছিলো। এই আন্দোলনে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান কম নয়, কাউকে বাদ দিয়ে কাউকে কৃতিত্ব দেয়াটা একদমই সমীচীন হবে না। ১৫ জুলাই থেকে বড় আকারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আন্দোলন শুরু হয়। ঐ দিন সকাল ১০টায় ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ) ও ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা নতুন বাজারে অবস্থিত আমেরিকান দূতাবাসের সামনের মূল সড়ক অবরোধ করে। পরবর্তীতে তাদের সাথে ইউনিভার্সিটি অফ ইনফরমেশন টেকনোলজি এন্ড সাইন্স (ইউআইটিএস) সহ আশেপাশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালের শিক্ষার্থীরা যোগ দেয়।
একই দিনে রামপুরায় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা, যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (এআইইউবি) ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করে। ফলে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক কার্যত অচল হয়ে যায়। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর আওয়ামী লীগ সরকারের সন্ত্রাসী ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা করে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের উপর ন্যক্কারজনক হামলার ছবি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ ১৬ জুলাই সারাদেশের শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং সারাদেশ অগ্নিগর্ভ হয়ে যায়।
সন্ত্রাসী ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের উপরেও হামলা করে। ১৬ জুলাই নতুন বাজার থেকে ইউআইইউ যাওয়ার যে রাস্তা সেখানে প্রতিটি মোড়ে মোড়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সকাল থেকে অবস্থান নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে গমনকারী শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ড চেক করে হেনস্তা ও মারধর করে। এমনকি শিক্ষার্থীরা রিকশা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাওয়ার সময় তাদের রিকশা আটকে ব্যাগের ভেতর আইডি কার্ড আছে কি না তা চেক করে এবং আইডি কার্ড পেলে মারধর করে। একইসময় সন্ত্রাসীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল বাসেও হামলা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে জমায়েত হয়ে মিছিল নিয়ে নতুন বাজারের দিকে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীরা শিক্ষার্থীদের মিছিলে হামলা করে এবং ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়, পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়।
ইউআইইউতে শহীদ ইরফান ‘স্বাধীনতা কর্নার’ উদ্বোধন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বেসরকারি ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) শিক্ষার্থী ইরফান ভূইয়াসহ নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে রাজধানীর মাদানী অ্যাভিনিউ ইউনাইটেড সিটিতে অবস্থিত মসজিদ আল-মুস্তফাতে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ শনিবার দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ইউআইইউ লাইব্রেরিতে ‘স্বাধীনতা কর্নার’ উদ্বোধন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং ইউনাইটেড গ্রুপের পক্ষ থেকে ইরফান ভূইয়ার পরিবারকে ৫০ লাখ টাকার একটি চেক প্রদান করা হয়। ইরফান ভূইয়ার নামে ইউআইইউ লাইব্রেরি এবং মেইনটেনেন্স ল্যাবের নামকরণ করা হয়। ইউআইইউ লাইব্রেরিতে ‘স্বাধীনতা কর্নার’ উদ্বোধন করেন ইউআইইউর উপাচার্য মো. আবুল কাশেম মিয়া। ইউআইইউর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাশেম মিয়া বলেন, স্বাধীনতা কর্নারের মাধ্যমে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের মধ্যে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে এবং বৈষম্যহীন একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস ও তথ্য-উপাত্ত এখানে সংরক্ষিত থাকবে এবং প্রতিনিয়ত এগুলো সমৃদ্ধ হবে। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক ও অন্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ছাত্রদলের দাবি প্রত্যাখ্যান ইউআইইউ ছাত্র শহীদ ইরফান ভূঁইয়ার বাবার : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ৪৯ জন নেতা-কর্মী শহীদ হয়েছে জানিয়ে এসব শহীদের তালিকা প্রকাশ করে ছাত্রদল। ২১ আগস্ট ২০২৪ বুধবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এ তালিকা প্রকাশ করেন। এতে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির (ইউআইইউ) ছাত্র শহীদ ইরফান ভূঁইয়াকে ঢাকা মহানগর (পশ্চিম) ছাত্রদলের কর্মী বলে দাবি করা হয়। তবে ছাত্রদলের কর্মী দাবি করাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরফান ভূঁইয়ার বাবা। তিনি জানান, ইরফান ছাত্রদলই নয়, কোন রাজনৈতিক দলের সাথেই জড়িত ছিল না।
২২ আগস্ট ২০২৪ ইনকিলাবে পাঠানো এক বার্তায় বাবা মো. আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া লিখেন, দৈনিক ইনকিলাবের তথ্যসূত্রে জানতে পারলাম যে, মো. ইরফান ভূঁইয়া ছাত্রদলের সাথে জড়িত। এটি সম্পূর্ণ অসত্য। সে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত ছিল না। উল্লেখ্য, ছাত্রদল ৪৯ জন শহীদের যে তালিকা প্রকাশ করেছে তা দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশ করা হয়।
– দৈনিক সংগ্রাম , প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫