• ৩০শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৩ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

বিষয়টির সত্যতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে আমরা পেতে পারি ?

usbnews
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২১
বিষয়টির সত্যতা  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে আমরা পেতে পারি ?
নিউজটি শেয়ার করুনঃ
অন্যের গবেষণা চুরির বিষয়ে সরব ভূমিকা পালন করা সাদেকা হালিমের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ রয়েছে।
ভোরের পাতার অনুসন্ধানে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
কথায় বলে চোরের মায়ের বড় গলা। ঠিক যেন তেমনটাই ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ঠাঁই পাওয়া প্রথম নারী ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের ক্ষেত্রে। তার বিরুদ্ধে চারটি গবেষণা পত্রে চুরির সুনিদিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। ভোরের পাতার হাতে সংরক্ষিত তথ্য প্রমাণ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১২ সালে ওয়ার্ল্ড জার্নাল অব এগরিকালচার সার্ভিসেস (আইএসএসএন নম্বর: ১৮১৭,৩০৪৭) এ প্রকাশিত মো. কাউসার আহমেদ, ড. সাদেকা হালিম এবং শামিমা সুলতানার সম্মিলিত একটি গবেষণা প্রকাশ পায়। প্রকাশিত গবেষণাটির বিষয়বস্তু ছিল ”Participation of Women in Aquaculture in Three Costal Districts of Bangladesh: Approaches Towards Sustainable Livelihood”। ওই গবেষণা পত্রে ৬৪ শতাংশ তথ্য ও লেখা হুবহু মিল পাওয়া গেছে অন্যান্য গবেষণাপত্র এবং বিভিন্ন বই থেকে।
এছাড়া মোস্তফা আসিফের ”Neither Sustenance Nor Securitz: Women and Forestrz in Bangladesh bz Sadeka Halim Phd” পিএইচডি গবেষণার সুপারভাইজার হিসাবে ছিলেন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। এই পিএইচডি গবেষণাপত্রটি ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর জমা দেওয়া হয়। ৮ হাজার ৫১ শব্দের এই গবেষণা পত্রটির নম্বর: ১২৩৮৮০১২৭৫। উল্লেখিত গবেষণাটিতেও ২৬ শতাংশ তথ্য ও উপাত্ত অন্যান্য গবেষণা ও বই থেকে হুবহু তুলে ধরা হয়েছে।
ভারতের নয়াদিল্লি থেকে ২০১১ সালে SAGE BOOKS থেকে প্রকাশিত ”Minorities and the State : Changing Social and Political Landscape of Bengal: Status of Hindu Women :Spheres of Human Rights Violation in Bangladesh” শীর্ষক গবেষণাধর্মী নিবন্ধে কন্ট্রিবিউটর হিসাবে কাজ করেছেন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। এই প্রকাশনাটিতে সম্পদনা করেছেন অভিজিৎ দাসগুপ্ত, মাসিকিও তংওয়া এবং আবুল বারাকাত। কিন্তু সাদেকা হালিম এই নিবন্ধটিতেও ৪৪ শতাংশ তথ্য ও উপাত্ত হুবহু কপি করেছেন।
উল্লেখ্য, গত ২৮ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের সভায় গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির শাস্তি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিয়া রহমানের পদাবনমন শাস্তি দেওয়া হয়। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এই শিক্ষককে সহযোগী অধ্যাপক থেকে এক ধাপ নামিয়ে সহকারী অধ্যাপক করে দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। আলোচিত সেই গবেষণা প্রবন্ধে তার সহকর্মী অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজানও শাস্তি পাচ্ছেন।
তাকে শিক্ষা ছুটি শেষে চাকরিতে যোগদানের পর দুই বছর একই পদে থাকতে হবে। যদিও সামিয়া রহমান বারবার গণমাধ্যমে বলেছেন, তিনি গবেষণাটির সাথে জড়িত ছিলেন না। মারজানের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রশের কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এটা নিয়ে কলকাঠি নেড়েছেন। সিন্ডিকেটের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সামিয়া রহমান ইতোমধ্যেই হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন। এমনকি খুব দ্রুতই সংবাদ সম্মেলন করে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার কথা জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া পিএইচডি থিসিসে জালিয়াতির আরেক ঘটনায় ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক ওমর ফারুককে সহকারী অধ্যাপক থেকে প্রভাষক পদে অবনমন ঘটানো হয়েছে। তার ডিগ্রিও বাতিল করা হয়েছে ওই বৈঠকে। এদিকে, অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এমনকি ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও তার প্রতিউত্তর করেননি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক নাম প্রকাশ করার না শর্তে ভোরের পাতার এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘সাদেকা হালিমের মতো অহংকারী ও পরশ্রীকাতর শিক্ষক আমি বিশ্ববিদ্যালয় চাকরি জীবনে কোনোদিন দেখিনি। তিনি নিজেই গবেষণা চুরি করে, অন্যের দোষ ধরতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। একজন শিক্ষক হিসেবে পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে এমন হীন কাজ অবশ্যই পরিতাপের বিষয়, কখনোই গ্রহণযোগ্য বলে মনে করি না। দায়িত্বের সাথে কাজ না করলে শিক্ষকদের প্রতি সাধারণ মানুষদের শ্রদ্ধা কমে আসবে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, আন্তজার্তিকভাবে স্বীকৃত কোনো গবেষণাপত্রে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ হুবহু মিল রাখার সুযোগ থাকলেও সেগুলোর মূল তথ্য ও উপাত্তের উৎস উল্লেখ করার নিয়ম রয়েছে। এর বেশি হলেই সেটি প্লেজারিজমের আওতায় অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। অধ্যাপক সাদেকা হালিমের তিনটি গবেষণাতেই ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি থেকে দ্বিতীয়বার স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি কমনওয়েলথ স্টাফ ফেলোশিপ নিয়ে পোস্ট-ডক্টরেট সম্পন্ন করেন যুক্তরাজ্যের বাথ ইউনিভার্সিটি থেকে। ২০০৯ সালের জুলাই মাস থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত তথ্য কমিশনে প্রথম নারী তথ্য কমিশনার পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
এছাড়া ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তিনি তিন মেয়াদে শিক্ষক সমিতির কার্যকরী পরিষদের সদস্য ও তিনবার সিনেট সদস্য ছিলেন। অধ্যাপক সাদেকা হালিম জাতীয় শিক্ষানীতি কমিটি-২০০৯ এর ১৮ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের কমিটিতে সদস্য ছিলেন। পেশাগত জীবনে সাদেকা হালিম অতিথি অধ্যাপক হিসেবে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার বকু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেছেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন স্টাডিজ বিভাগ ও আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টের কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হায়ার এডুকেশন লিংক প্রোগ্রামের অধীনে কুইন্স-এর ভিজিটিং ফেলো ছিলেন সাদেকা হালিম। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে তার লেখা প্রায় ৫০টি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। লিঙ্গ-সমতা, বন ও ভূমি, উন্নয়ন, আদিবাসী ইস্যু, মানবাধিকার এবং তথ্য অধিকার প্রভৃতি তার গবেষণার বিষয়। যদিও শিক্ষক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তিনি ধরে রাখতে পারেননি নিজের ব্যর্থতার কারণেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে সরকারপন্থি প্যানেল নীল দলের প্রায় সবাই বিজয়ী হলেও সহ-সভাপতি পদে হেরেছিলেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম।
–ভোরের পাতা