১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয় এবং সিলেটকে আবার আসামে সংযুক্ত করা হয়। বঙ্গভঙ্গের পর থেকে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ সম্মেলিত ভাবে যখন ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনে ঝাপিয়ে পরেন ( সূত্র বাংলাদেশের ডায়েরী, “‘বঙ্গভঙ্গ রদ পৃষ্ঠা ৭১১-১২, সংস্করণ: আগস্ট ২০০২)।
এ সময় সিলেটবাসীও রাজনীতির সাথে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। বিভিন্ন সময়ে সিলেটের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ খিলাফত আন্দোলন, কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে সিলটবাসীর পক্ষে অবদান রাখেন। সিলেট শহরে বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠিত হয়েছে রাজনৈতিক সম্মিলন।
বালাগঞ্জের আরঙ্গপুর গ্রামে ১৯১৮ সালে অনুষ্ঠিত উলামা সম্মেলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন মৌলানা আব্দুল হক চৌধুরী, সৈয়দ আফরুজ বখত। ১৯২০ সালে ২২ ডিসেম্বর সর্বভারতীয় কংগ্রেস ও খেলাফত সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয় নাগপুরে। সিলেট থেকে মুসলিম লীগের প্রতিনিধি মৌলানা আব্দুর রহমান সিংকাপনী অনেকজন সহকর্মি নিয়ে উক্ত সম্মিলনে অংশগ্রহণ করে ছিলেন।
ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে দেশীয় সৈন্য বাহিনী যখন বিদ্রোহ ঘোষণা কর, এ সময় চট্টগ্রামের ৩৪ নং বেঙ্গল পদাতক রেজিমেন্টের ২,৩,ও ৪ নম্বর কোম্পানী হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামের অস্ত্রগার ও ট্রেজারীতে হামলা করে এবং জেলখানার বন্ধি মুক্তি করে তারা পালিয়ে আসে সিলেটের দিকে। ত্রিপুরা পার হয়ে সিলেট প্রবেশ করলে সিলেটের মৌলভীবাজার অঞ্চলের পৃথিমপাশার জমিদার গউছ আলী খান তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করে পাহাড়ি অঞ্চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে ইংরেজ প্রেরিত এক বিরাট বাহিনী বিদ্রোহী সিপাইদের গতিরোধ করতে প্রতাপগরের দিকে অগ্রসর হয়। চট্টগ্রাম হতে আগত সৈন্য সহ তিনশ’র ও বেশি স্বদেশী বাহিনী ইংরেজদের মোকাবেলা করতে বড়লেখা থানার পাশে লাতু নামক স্থানে অবস্থান নেয় এবং এ লাতু অঞ্চলে বিদ্রোহী সিপাইদের সাথে ইংরেজ বাহিনীর মুখোমুখি যুদ্ধ হয়। তখন বিদ্রোহী সিপাইদের গুলিতে ইংরেজ সেনাপতি মেজর ব্যাং সহ আরো অনেক ইংরেজ সৈন্য নিহত হয়। (সূত্র Rethinking 1857, Sabyasachi Bhattacharya, Indian Council of Historical Research Orient Longman, 2007 – India ) এ যুদ্ধ ৩ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। শহিদ হন অনেক দেশীয় সিপাই। অবশেষে ইংরেজ বাহিনী সুবেদার অযোধ্যা নামক যোদ্ধার রণ কৌশলে বিদ্রোহী সিপাইদের অনেক জন আহত হলে বাকিরা পালয়ন করেন। এরপর ইংরেজরা বিভিন্ন স্থানে ধাওয়া করে পলাতক সিপাইদের নিহত ও বন্দি করে সিপাই বিদ্রোহ দমন করে। জমিদার গাউস আলী খানকেও এ সময় গ্রেফতার করা হয় কিন্তু বিদ্রোহের সাথে সরাসরি জড়িত থাকার পর্যাপ্ত প্রমানের অভাবে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।
১৯০৫ সালে ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতে প্রথম পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলটিকে পূর্ববঙ্গ থেকে পৃথক করা হয়। হিন্দুরা পশ্চিমবঙ্গ ও মুসলমানরা পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পশ্চিম বঙ্গ হতে ব্যাপক গণ-আন্দোলন শুরু হয়। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা বিভাগীয় শাসন প্রতিষ্ঠার আশায় যখন ঢাকায় নতুন নতুন অট্টালিকা যেমন, বিচার বিভাগ, হাইকোর্ট, সেক্রেটারিয়েট ও আইন পরিষদ প্রভৃতি নির্মাণে উজ্জীবিত, তখনই এর বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ হতে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। জাতীয়তাবাদি হিন্দু নেতৃবৃন্দ একে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে অনৈক্য এবং মাতৃভূমি বিভক্তিকরণ ইত্যাদি আখ্যায়িত করে তিব্র আন্দোলন আরম্ভ করেন।
ফলশ্রুতিতে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয় এবং সিলেটকে আবার আসামে সংযুক্ত করা হয়। বঙ্গভঙ্গের পর থেকে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ সম্মেলিত ভাবে যখন ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনে ঝাপিয়ে পরেন। এ সময় সিলেটবাসীও রাজনীতির সাথে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। বিভিন্ন সময়ে সিলেটের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ খিলাফত আন্দোলন, কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে সিলটবাসীর পক্ষে অবদান রাখেন। সিলেট শহরে বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠিত হয়েছে রাজনৈতিক সম্মিলন। বালাগঞ্জের আরঙ্গপুর গ্রামে ১৯১৮ সালে অনুষ্ঠিত উলামা সম্মেলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন মৌলানা আব্দুল হক চৌধুরী, সৈয়দ আফরুজ বখত।
১৯২০ সালে ২২ ডিসেম্বর সর্বভারতীয় কংগ্রেস ও খেলাফত সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয় নাগপুরে। সিলেট থেকে মুসলিম লীগের প্রতিনিধি মৌলানা আব্দুর রহমান সিংকাপনী অনেকজন সহকর্মি নিয়ে উক্ত সম্মিলনে অংশগ্রহণ করে ছিলেন। ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধী, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ও মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ খেলাফত কমিটির আমন্ত্রণে সিলেটের শাহী ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। ১৯৩২ সালে সুরমাভ্যালি কৃষক সম্মিলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন শাহ ইসমাইল আলী।
১৯২১ সালে দু-দিন ব্যাপী মৌলভীবাজারে অনুষ্ঠিত হয় ভারতীয় খেলাফত সম্মিলন। এ সম্মিলনে ভারত খিলাফত আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের মধ্যে ভারত হতে আসেন প্রখ্যাত ইসলামিক চিন্তাবিদ মৌলানা হুসেন আহমদ মদনী ও সরোজিনী নাইডু। সমাবেশের আয়োজক ও অভ্যর্থনা কমিটির প্রথম কাতারের নেতৃবৃন্দ ছিলেন; মৌলানা নাজির উদ্দীন, মৌলানা আব্দুর রহমান সিংকাপনী, ডঃ মুর্তজা চৌধুরী, মৌলানা আব্দুল্লা বি, এল ও সৈয়দ আব্দুস সালাম।
১৯২৭ সালে সিলেটের বর্তমান শারদা হলে অনুষ্ঠিত হয় মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন সম্মিলন। এ সম্মিলনের অতিথিবৃন্দ ছিলেন বিদ্রোহ কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও বেগম যুবেদা খাতুন চৌধুরী। এভাবে সিলেটবাসীর উত্সাহে আমন্ত্রীত হয়ে বিভিন্ন সময় ভারতে ব্রিটিশ বিরুধী আন্দোলনের প্রথম কাতারের নেতৃবৃন্দ সিলেট এসেছেন এবং সিলেটবাসীকে আন্দোলের জন্য উৎসাহিত করেছেন।