• ১১ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৮শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ২৩শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

দলে দলে ‘নিঃশর্ত ক্ষমা’ চাইছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা , রাষ্ট্র ক্ষমা করবে কি না, জানি না: চেয়ারম্যান

Usbnews.
প্রকাশিত জুলাই ১০, ২০২৫
দলে দলে ‘নিঃশর্ত ক্ষমা’ চাইছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা , রাষ্ট্র ক্ষমা করবে কি না, জানি না: চেয়ারম্যান
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

সাজা থেকে বাঁচতে দল বেঁধে চেয়ারম্যানের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন আন্দোলনে অংশ নেওয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা। গত দুই দিনে আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডারের তিন শর বেশি কর্মকর্তা চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের কাছে ‘নিঃশর্ত ক্ষমা’ চেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এমন কর্মকর্তারা রয়েছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

এনবিআরের এত কর্মকর্তা ক্ষমা চাওয়ায় তাঁদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এ প্রসঙ্গে বলছেন, জন বা রাষ্ট্রের স্বার্থে সরকারি কর্মকর্তাদের আন্দোলনের নজির নেই। আমলারা সাধারণত নিজেদের স্বার্থ আদায়েই আন্দোলন করে থাকেন।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, বিষয়টা আক্ষরিক অর্থে ক্ষমা চাওয়া নয়। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝির কারণে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা দূর করে কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তাঁরা।

দুই দিনে ‘ক্ষমা চেয়েছেন’ তিন শর বেশি কর্মকর্তা
‘ক্ষমা চাওয়া নয়, দূরত্ব ঘোচানোর উদ্যোগ’
রাষ্ট্র ক্ষমা করবে কি না, জানি না: চেয়ারম্যান

নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, গতকাল বুধবার সকাল ৯টার দিকে আয়কর ক্যাডারের বিভিন্ন ব্যাচের প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তা চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে নিঃশর্ত ক্ষমা চান। একই উদ্দেশ্যে সোয়া ৯টার দিকে কাস্টমস ও ভ্যাট ক্যাডারের প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তা চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করেন।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাটি বলেন, আন্দোলনের কারণে রাজস্ব আদায় কার্যক্রম তথা দেশ ও অর্থনীতির ক্ষতির কথা স্বীকার করে কর্মকর্তারা দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা সরকারের নির্দেশনা মানা ও রাজস্ব ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কাজ করার ব্যাপারে চেয়ারম্যানের কাছে অঙ্গীকার করেছেন।

সূত্র জানায়, এর আগে মঙ্গলবার এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে আয়কর বিভাগের ক্যাডার কর্মকর্তারা ব‍্যাচভিত্তিক দেখা করে ক্ষমা চান। এর মধ‍্যে ৪০, ৩৮, ৩৩, ৩১, ৩০,২৯ ও ২৮ ব‍্যাচের কর্মকর্তারা ছিলেন। তা ছাড়া সদ্য পদোন্নতি পাওয়া ৫০ জনের বেশি কর্মকর্তা চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁরা দেশের স্বার্থে কাজের পরিবেশ ফিরিয়ে এনে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের জনসংযোগ কর্মকর্তা আল-আমিন শেখ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘চেয়ারম্যান স্যারের সঙ্গে কর্মকর্তারা দেখা করেছেন। কিন্তু কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা আমার জানা নেই।’

চেয়ারম্যানের কাছে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আন্দোলনে অংশ নেওয়া কাস্টমস ক্যাডারের একজন অতিরিক্ত কমিশনার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দলে দলে গিয়ে ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে বিষয়টা সে রকম নয়। চেয়ারম্যান স্যার ডেকেছিলেন, আমরা যারা ঢাকায় আছি, তারা গিয়েছিলাম। চেয়ারম্যান স্যারের সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, সেটা কাটাতে আমরা বলেছি যে “যেটা হয়েছে, আপনি ভুলে যেতে বলেছেন, আমরা ভুলে গেছি। নতুন করে দেশ গঠনে আমরা কাজ করব।” চেয়ার‍ম্যান স্যার বলেছেন, “তোমার রেজাল্টেই (রাজস্ব আদায়) বুঝতে পারব।” যদি এটাকে মাফ চাওয়া বলেন, তাহলে আর কী বলব?’

‘সরকারি কর্মচারীরা আন্দোলন করেন নিজের ও গোষ্ঠীর স্বার্থে। তাঁদের আন্দোলন কখনো জনস্বার্থে হয় না। এটা কেবল এনবিআরের কর্মকর্তা নয়, সকল সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এনবিআরের কর্মকর্তারা হয়তো সুযোগ-সুবিধা, ক্ষমতার বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন করেছেন। কোনো কারণে এখন সেখান থেকে সরে এসেছেন। তবে এতে রাষ্ট্রের অনেক ক্ষতি হয়েছে।’

আন্দোলনের যৌক্তিকতার বিষয়ে প্রশ্ন করলে ওই অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, ‘আমাদেরকে দেশের জন্য কাজ করতে হবে। সরকার উপদেষ্টাদের কমিটি করেছে। তাঁরা আমাদের মতামত চেয়ে বলেছেন, তা যতটা সম্ভব গ্রহণ করবেন। চেয়ারম্যান স্যারও এ বিষয়ে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন। আমাদের মতামত আগে গ্রহণ না করায় এবং এ বিষয়ে তৎপরতার ঘাটতি থাকায় আমরা আবেগের জায়গা থেকে চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি করেছিলাম। সেটা এখন দূর হয়েছে।’

গত ১২ মে মধ্যরাতে জারি করা এক অধ্যাদেশে এনবিআর ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামের দুটি বিভাগ গঠনের ঘোষণা দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ উদ্যোগ বাতিলের দাবিতে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে কর্মবিরতি, রাজস্ব আদায় কর্মকাণ্ডে ‘শাটডাউন’সহ নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

প্রথম দিকে এনবিআর বিলুপ্তির অধ্যাদেশ সংশোধনসহ কয়েকটি দাবি থাকলেও শেষ পর্যায়ে এসে চেয়ারম্যানের অপসারণের এক দফা দাবিতে আন্দোলন চলতে থাকে। তবে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়ে ২৯ জুন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সব শ্রেণির চাকরিকে অত্যাবশ্যকীয় সেবা ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কঠোর শাস্তির ভয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এনবিআর কর্মকর্তারা। এর প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় সেদিনই তাঁরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন। এর পরপরই আন্দোলনে সম্পৃক্ত ১৬ জন কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অন্যদিকে এনবিআরের তিনজন সদস্য ও একজন কমিশনারকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। সাময়িক বরখাস্ত করা হয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনারকে। যদিও কর্তৃপক্ষ আন্দোলনের সঙ্গে দুদকের অনুসন্ধানের সম্পর্ক না থাকার দাবি করেছে।

আন্দোলনকারী কর্মকর্তাদের বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ‘চেয়ারম্যান হিসেবে আমার বিরুদ্ধে যাঁরা আন্দোলন করেছেন, আমি তাঁদের ক্ষমা করে দিয়েছি। কিন্তু, যাঁরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন, রাষ্ট্র তাঁদের ক্ষমা করবে কি না, তা আমি জানি না।’

সবাইকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ‘দেশের উন্নয়নের অক্সিজেন’ রাজস্ব আদায়ে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন এনবিআর চেয়ারম্যান।