বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জনগণের ধর্মীয় মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় পরিচিতির সর্বনাশ যদি কেউ করে থাকেন তাহলে তিন ব্যক্তি এটি করেছেন। এরা হলেন- শেখ মুজিবুর রহমান, তদ্বীয় কন্যা শেখ হাসিনা এবং সুপ্রিমকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। ইতোমধ্যেই একাধিক পলিটিশিয়ান এবং মিডিয়া তাকে জাতির এবং বিচার বিভাগের কুলাঙ্গার বলে আখ্যায়িত করেছেন। সেই কুখ্যাত বিচারক খায়রুল হক সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছেন। খায়রুল হকের অপকীর্তির কথা বলতে গেলে প্রথমেই তার ত্রয়োদশ সংশোধনী (সংবিধানের ১৩ নম্বর সংশোধনী) বিলুপ্তির কথা এসে যায়। ত্রয়োদশ সংশোধনী বিলোপ করে দেশে শেখ হাসিনার চ-ালিনী ব্যক্তি স্বৈরতন্ত্রের পথ খায়রুল হক উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।
বাংলাদেশের মানুষের বাক-স্বাধীনতা এবং মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণকারী এ কুখ্যাত ত্রয়োদশ সংশোধনী বিলোপের পূর্বে এই একই খায়রুল হক আরেকটি সংশোধনী বিলোপ করে বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জাতীয় পরিচিতি বিধ্বংসী আরেকটি সংশোধনী বাতিল করেন। সেটি হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সমুন্নতকারী এবং দেশের ৯২ শতাংশ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধের পতাকাবাহী শহীদ জিয়াউর রহমানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল। আমি পরবর্তীতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল সম্পর্কে আলোচনা করবো। আজ পঞ্চম সংশোধনী সম্পর্কে আলোচন করবো।
১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান একটি সংবিধান প্রণয়ন করেন যেটি একই সালের ৪ঠা নভেম্বর জাতীয় সংসদে অনুমোদিত হয় এবং ১৬ই ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। এই সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়, “জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।” ঐ সংবিধানের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয় , “বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে; বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালী বলিয়া পরিচিত হইবেন।” ঐ সংবিধানের ৮, ৯, ১০ এবং ১২ অনুচ্ছেদে মূল প্রস্তাবনার পুনরুল্লেখ করা হয়। ঐ একই সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে ‘ধর্ম ভিত্তিক’ রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। বলা হয়, “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী কোনো ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক অন্য কোনো সমিতি বা সঙ্ঘ গঠন করিবার বা তাহার সদস্য হইবার বা অন্য কোনো প্রকারে তাহার তৎপরতা অংশগ্রহণ করিবার অধিকার কোনো ব্যক্তির থাকিবে না।”
৭২ সালের সংবিধানের এসব ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’র মতো ঐ সংবিধানে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ৪র্থ সংশোধনী নামক এক দানবীয় সংশোধনী চাপিয়ে দেয়া হয়। ঐ সংশোধনী মোতাবেক বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত হয়। চাপিয়ে দেয়া হয় একদলীয় প্রেসিডেনশিয়াল সরকার। অর্থাৎ সমস্ত রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত হয় এবং একটি মাত্র দল থাকে। সেই দলটির নাম বাকশাল।
৪র্থ সংশোধনীর অর্থাৎ বাকশাল প্রতিষ্ঠা আইনের ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়, “এই আইন প্রবর্তন হইতে ৫ বছর অতিবাহিত হইলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবে।” এর অর্থ হলো, ১৯৮৩ সালের নির্বাচনে জাতীয় সংসদ ৫ বছরের জন্য গঠিত হয়। অর্থাৎ ১৯৭৮ সালে ঐ সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। সেখানে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই সংসদের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
৪র্থ সংবিধানে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা করা হয় এবং আজীবন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত করা হয়। এসম্পর্কে ৪র্থ সংশোধনীর ৩৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হইবেন এবং রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহন করিবেন এবং উক্ত প্রবর্তন হইতে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থাকিবেন যেন তিনি এই আইনের দ্বারা সংশোধিত সংবিধানের অধীন রাষ্ট্রপতি-পদে নির্বাচিত হইয়াছেন।
ওপরে যেসব তথ্য দেওয়া হলো সেসব তথ্য থেকে দেখা যায় যে, ৭২ সালের সংবিধানে মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধকে, বিশেষ করে ৯২ শতাংশ মুসলমানের ধর্মীয় মূল্যবোধকে কেড়ে নেয়া হয়েছিলো। উপরন্তু ৪র্থ সংশোধনীতে মানুষের স্বাধীন রাজনীতি এবং মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিলো। এছাড়া কোনো রকম নির্বাচন ছাড়া ৫ বছর মেয়াদী সংসদের মেয়াদ ৭ বছর করা হয়েছিল। তাছাড়াও সংসদে কোনো রকম আলোচনা ছাড়া শেখ মুজিবকে জাতির পিতা ঘোষণা করা হয় এবং আজীবন প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত করা হয়।
৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার অপসারণের সমস্ত পথ রুদ্ধ হয়। বিশিষ্ট গবেষক মহিউদ্দিন আহম্মেদ ইংরেজি ডেইলি স্টারে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, গণতান্ত্রিক এবং নিয়মতান্ত্রিক পথে সরকার অপসারণের সমস্ত পথ রুদ্ধ হওয়ার ফলে ১৯৯৫ সালের ১৫ই আগস্ট সংবিধান বহির্ভূত পথে আওয়ামী লীগ সরকারের অপসারণ ঘটে।
মুজিব সরকার অপসারিত হলে তার মন্ত্রিসভার সদস্য খন্দকার মোশতাক আহম্মেদ প্রেসিডেন্ট হন। তিনি জাতীয় সংসদ এবং সংবিধান বহাল রাখেন। তবে তিনি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানসহ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের বক্তৃতা এবং অনুষ্ঠান শুরুর পূর্বে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ বলা চালু করেন এবং শেষ করেন ‘জয়বাংলার’ পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ দিয়ে। খন্দকার মোশতাকের আমলে বাংলাদেশ বেতারের নাম পরিবর্তন করে ‘রেডিও বাংলাদেশ’ করা হয়।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার (পরে মেজর জেনারেল) খালেদ মোশাররফ এক পাল্টা অভ্যুত্থানে খন্দকার মোশতাতকে অপসারণ করেন, প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম প্রেসিডেন্ট হন। এই সরকার মাত্র ৪ দিন টিকে ছিলো। ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার বিপ্লব সংঘঠিত হয়। সেই বিপ্লবে খালেদ মোশারফ নিহত হন এবং সাধারণ সিপাহীরা খালেদ মোশারফ কর্তৃক বন্দী মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন। জেনারেল জিয়া প্রথমে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি প্রেসিডেন্ট হন। অতঃপর ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যত জন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এসেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও যোগ্য সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন শহীদ জিয়াউর রহমান। তার আমলে এদেশের সর্বশ্রেণীর নাগরিক তাদের ধর্মীয় ও নাগরিক স্বাধীনতা ফিরে পায়। জিয়ার আমলে যেসব যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো-(১) শেখ মুজিব কর্তৃক জারিকৃত ৪র্থ সংশোধনী বাতিল। (২) সংবিধানের ১৪২ (১ক), (১খ) এবং (১গ) অনুচ্ছেদের সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান প্রবর্তন। (৩) সংবিধানের শুরুতে অর্থাৎ প্রস্তাবনার উপরে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” শব্দটি সন্নিবেশ করা। (৪) সংবিধানের মূল অনুচ্ছেদ ৬ সংশোধন করে যেখানে বাংলাদেশের নাগরিকদের “বাঙালি” হিসেবে পরিচিত করার বিধান ছিল, প্রতিস্থাপিত অনুচ্ছেদ ৬ দ্বারা বাংলাদেশের নাগরিকদের “বাংলাদেশী” হিসেবে পরিচিত করার বিধান করা। (৫) সংবিধানের মূল অনুচ্ছেদ ৮(১) তে “ধর্মনিরপেক্ষতা” শব্দটির পরিবর্তে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” শব্দটি ব্যবহার করা এবং “সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস সকল কর্মের ভিত্তি হবে” এই শব্দগুলি সম্বলিত একটি নতুন উপ-অনুচ্ছেদ সংযোজন। (৬) মূল অনুচ্ছেদ ৮(১) এ উল্লেখিত সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার অন্তর্ভুক্ত করা। (৭) “ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে” মুসলিম দেশগুলোর সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক সুসংহত, সংরক্ষণ এবং শক্তিশালী করার রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ করে অনুচ্ছেদ ২৫-এ একটি নতুন ধারা সন্নিবেশ করা।
এই ৭টিসহ আরো কয়েকটি সাংবিধানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন শহীদ জিয়া যেগুলি নির্বাচিত জাতীয় সংসদে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল অনুমোদিত হয়। এসব সাংবিধানিক সংশোধনী বহুল প্রশংসিত পঞ্চম সংশোধনী নামে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে।
কিন্তু বিচারপতি খায়রুল হক হাইকোর্টের বিচারপতি থাকাকালেই তিনি এবং বিচারপতি ফজলে কবির ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করেন। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে অর্থাৎ আপিল বিভাগে আপিল করা হয়। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত রাখে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এই মামলাটির আবার শুনানি হয়। ২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিমকোর্ট হাইকোর্টের এই রায় (খায়রুল হকের রায়) বহাল রাখে, অর্থাৎ পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হয়ে যায়। এ রায়ের ফলে রাষ্ট্রীয় নীতির মৌলিক নীতি হিসেবে মুজিববাদকে পুনরুদ্ধার করার জন্য “ধর্মনিরপেক্ষতা” পুনঃসংযোজিত করা হয় এবং “সর্বক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” এবং এটি “সকল কর্মের ভিত্তি” হিসেবে বিবেচিত হওয়াকে বাদ দেয়া হয়। “ইসলামী সংহতির” ওপর ভিত্তি করে মুসলিম দেশগুলোর সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের রাষ্ট্রীয় নীতি সম্পর্কিত ধারাও ২৫(২) বাদ দেয়া হয়।
এভাবে খায়রুল হক বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক আদর্শ পুনপ্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে তিনি গণতন্ত্রকে হত্যা করার পথও সুগম করেন, যা পরবর্তী ভাষ্যে লেখা হবে।
– মোবায়েদুর রহমান