গাজা উপত্যকার ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে ইউরোপকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ’র পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা জোসেপ বোরেল। তিনি বলেছেন, গাজায় বহু সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং অন্য সাংবাদিকদের পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ইইউ’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি আরো বলেছেন, “গাজা উপত্যকার বেসামরিক নাগরিকরা যে মর্মান্তিক পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন তার ব্যাপ্তি দুঃখজনকভাবে ইউরোপের মানুষ জানতে পারছে না। কারণ, পশ্চিমা সাংবাদিকদের পক্ষে গাজায় যাওয়া সম্ভব হয়নি এবং বহু ফিলিস্তিনি সাংবাদিক তাদের প্রাণ হারিয়েছেন।”
কেন গাজায় মর্মান্তিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে কিংবা ফিলিস্তিনি সাংবাদিকরা কীভাবে প্রাণ হারিয়েছেন তা উল্লেখ করেননি বোরেল। তিনি সম্মিলিতভাবে গাজা সংঘাতের একটি সমাধানসূত্র খুঁজে বের করার জন্য ইইউভুক্ত দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
জোসেপ বোরেল বলেন, গাজা যুদ্ধের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেয়া হবে সে সম্পর্কে ইইউ’র সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতৈক্য না থাকার কারণে এ ব্যাপারে ইউরোপ কঠোর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। একই কারণে গাজা পরিস্থিতিতে ইউরোপ দুর্বল অবস্থান নিয়েছে বলে তার ধারনা।
ইইউ’র প্রধান কর্মকর্তা বলেন, “গাজাবাসীর এখন প্রচণ্ডভাবে খাদ্য, পানি, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন। বোমা ও গুলির বাইরেও দুর্ভিক্ষ ও মহামারী সেখানকার লাখ লাখ মানুষের জীবনকে তাড়া করে ফিরছে।” বোরেল বারবার গাজাবাসীর এই দুর্দশার পেছনের শক্তি ইসরাইলের নাম উচ্চারণ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, গাজা উপত্যকার ২৩ লাখ মানুষের মধ্যে ১৯ লাখ মানুষই তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে। তিনি গাজাবাসীকে এই উপত্যকার বাইরে পাঠানোর যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেন।
সমালোচকরা বলছেন, বোরেলের ভাষায় গাজায় পশ্চিমা সাংবাদিকের উপস্থিতি না থাকলেও ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণের সেখানে ইসরাইলি বর্বরতার খবর, ছবি ও ভিডিও প্রতি মুহূর্তে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ইউরোপের কেউ গাজা পরিস্থিতি সম্পর্কে অজ্ঞ নয়। কিন্তু সেখানে ইসরাইলের ভয়াবহ গণহত্যার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে যেতেই জোসেপ বোরেল এই দায়সারা বিবৃতি দিয়েছেন।
ইসরাইল উত্তেজনার আগুনে কেবলই ঘি ঢেলে তা তীব্রতর করছে এবং এর ফলে গোটা পাশ্চাত্যের পাশাপাশি ইসরাইলকেও চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে।–এইসব মন্তব্য করেছে ব্রিটিশ সংবাদপত্র গার্ডিয়ান।
সংবাদপত্রটি এক বিশ্লেষণে আরও লিখেছে, গাজার যুদ্ধ এখন আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার হুমকির যে পর্যায় তা এরি মধ্যে অতিক্রম করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর ওয়াশিংটন পশ্চিম এশিয়ায় তার উপস্থিতি কমিয়ে আনার নীতি গ্রহণ করে এবং এ অঞ্চলের দেশগুলোকে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক যত বেশি সম্ভব স্বাভাবিক করতে উৎসাহ দিচ্ছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তা’র ব্যবধানে বেশিরভাগ আরব সরকার গাজার যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন সরকার ও ইসরাইলের মিত্ররা এ অঞ্চলে সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে সক্ষম হয়নি। আর এ-সব কিছুর জন্যই দায়ি হল গুরুত্বপূর্ণ শরিক হিসেবে ইসরাইলকে অন্ধভাবে সমর্থন দেয়ার মার্কিন নীতি। এই অন্ধত্ব এতটা প্রকট হয়েছে যে তা পুনর্বিবেচনারও সুযোগ রাখেনি মার্কিন সরকার। ফলে এ নীতির মাশুল তথা ক্ষয়ক্ষতি ক্রমেই বাড়ছে।
ওই সংবাদপত্র আরও লিখেছে, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার হুমকি এখন বাস্তবেই ঘটতে যাচ্ছে বা নিকট ভবিষ্যতেই ঘটবে তা নয়- এই হুমকি এখনই কার্যকর হওয়া শুরু হয়ে গেছে। ইসরাইল ও হামাসের যুদ্ধ এখন লেবানন, ইয়েমেন, ইরান ও লোহিত সাগর এবং অন্যান্য অঞ্চলের দিকেও ছড়িয়ে পড়ছে। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে ইসরাইল ও লেবাননের হিজবুল্লাহ পরস্পরের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে।
গার্ডিয়ান লিখেছে, লোহিত সাগরকে নিরাপদ করা সম্ভব না হলে গোটা বিশ্বে বাণিজ্যের নানা ব্যয় ও বিমার খরচ বেড়ে যাবে ও পণ্যের বিশ্ব বাজারে দেখা দেবে যোগানের সংকট যা ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আগেই কিছুটা নাজুক অবস্থায় উপনীত হয়েছে।
গার্ডিয়ানের ওই বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, বেসরকারি নানা গোষ্ঠী বা দলের পক্ষ থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এইসব দেশে সৃষ্টি করতে পারে বড় ধরনের বিপর্যয়। বিভিন্ন প্রক্সি গ্রুপের উপস্থিতি ও (রাষ্ট্রীয়) শক্তির শূন্যতার ফলাফল আমরা দেখতে পাচ্ছি গাজা ও পশ্চিম তীরে। অথচ এর আগ পর্যন্ত মার্কিন সরকার ও ইসরাইল এই আশায় বুক বেঁধেছিল যে আরব বিশ্বের সঙ্গে ইসরাইলের ঐক্য-প্রক্রিয়া ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া ইরানকে দমিয়ে ফেলবে এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র ও অধিকারের স্বপ্ন-সাধ নীরবে মৃত্যুর পথ বেছে নিবে!
হামাস তার আকস্মিক হামলার মাধ্যমে প্রবল শক্তিমত্তার জানান দিল বলে ওই বিশ্লেষণে মন্তব্য করা হয়েছে।
গার্ডিয়ান আরও লিখেছে, এর পর থেকে ইসরাইলের কার্যক্রম আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পরিবর্তে কেবল উত্তেজনা জোরদারকারির ভূমিকা রাখছে। মার্কিন সরকার ও পাশ্চাত্যকে এখন এই বাস্তবতাটি বুঝতে হবে যে গাজার যুদ্ধ এখন আত্মরক্ষার পর্যায় অতিক্রম করেছে এবং এর ফলে ইসরাইলসহ সবাইকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে! কারণ এ যুদ্ধ খুব শিগগিরই এক বৈশ্বিক হুমকিতে পরিণত হতে পারে।
গোটা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ওপর ইহুদিবাদী ইসরাইলের দখলদারিত্বের অবসান না হলে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফিরবে না বলে সতর্ক করে দিয়েছে ফিলিস্তিনের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। সংগঠনটির পলিটব্যুরো সদস্য ওসামা হামদান গতরাতে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন।
তিনি উপনিবেশবাদী মানসিকতা পরিহার করে অন্য দেশের সার্বেভৌমত্ব ও মুসলিম স্বার্থের প্রতি সম্মান জানানোর জন্য আমেরিকা ও ব্রিটেনের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ও লন্ডনের আগ্রাসী নীতির কারণে বিশ্বের সব দেশ ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে পড়েছে। এ কারণে গাজায় ইসরাইলি গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
হামাসের এই সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, বাপক গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সত্ত্বেও ইহুদিবাদী ইসরাইল গাজা উপত্যকায় তার কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। গাজা থেকে ইসরাইলি বন্দিদের উদ্ধার করতে হলে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে বলেও তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন।
ওসামা হামদান বলেন, নাৎসীবাদী ইসরাইল ফিলিস্তিনি জনগণের দৃঢ় মনোবল ও ঐক্যে ফাটল ধরাতে পারেনি। তিনি বলেন, গত ৭ অক্টোবর থেকে ইহুদিবাদী ইসরাইল একটি কৌশলগত পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে। গাজার ওপর যত বেশি আগ্রাসন চলবে ততবেশি এটির পরাজয় ঘটতে থাকবে। ফিলিস্তিনি জনগণ এখন পর্যন্ত ইসরাইলের সকল ষড়যন্ত্র নস্যাত করেছে- জানিয়ে হামাসের এই নেতা বলেন, আমরা তাদের সব চক্রান্ত নস্যাৎ করব এবং আল-আকসা তুফান অভিযান সফল হবে