তাইওয়ান নিয়ে আবারও যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনা। দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানে সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। তাতে চীনবিরোধী উইলিয়াম লাই নির্বাচিত হয়েছেন। তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়েছে চীন। বলেছে, তাইওয়ানে নির্বাচিত নতুন প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভয়াবহ ভুল করেছে। এতে বলা হয়, ওয়াশিংটন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা তাইওয়ানের সঙ্গে শুধু অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখবে। এর প্রেক্ষিতে বেইজিং বলছে ওয়াশিংটন সেই প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
উল্লেখ্য, তাইওয়ানে নির্বাচিত নতুন প্রেসিডেন্ট চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন থেকে সুরক্ষিত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু বেইজিংয়ের অবস্থান ভিন্ন।
তারা তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে সেই দাবিতে অটল আছে। বলেছে, যেকোনো সরকার যদি এ দাবির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করে তাহলে কঠোর জবাব দেবে বেইজিং।
ওদিকে উইলিয়াম লাই নির্বাচিত হওয়ার পর অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের নেতারা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এর মধ্যে অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন তাইপে এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে অংশীদারিত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। বলেছেন, এই সম্পর্ক হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে।
ব্লিঙ্কেন বলেন, আমাদের অভিন্ন স্বার্থ ও মূল্যবোধকে সামনে এগিয়ে নিতে উইলিয়াম লাই এবং তাইওয়ানের সব দলের নেতাদের সঙ্গে কাজ করতে চাই। তাইওয়ানের সবচেয়ে শক্তিশালী যেসব মিত্র আছে, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। এ প্রসঙ্গ তুলে ধরে ব্লিঙ্কেন বলেন, তাইওয়ান প্রণালীতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, এমন সহযোগিতা আমাদের অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করতে এগিয়ে নেয়া উচিত এবং তা হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ান চায়না’ পলিসির অধীনে। এই পলিসির অধীনে তাইওয়ান বাদে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আছে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ও স্বীকৃতি। চীন আশা করে একদিন তাইওয়ানকে তাদের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে জোড়া দেবে।
অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের মন্তব্যে বেইজিং থেকে কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। তাইওয়ানের কোনো প্রার্থী বা কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দিয়ে কোন বিবৃতিকে চীন দেখে বৈধতা হিসেবে। কারণ, তাইওয়ানের যেসব রাজনৈতিক দল আছে তার বেশির ভাগই তাইওয়ানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে। এর প্রেক্ষিতে একটি বিবৃতি দিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়েছে, তাইওয়ানে নির্বাচিত ব্যক্তিকে অভিনন্দন জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাইওয়ানের সঙ্গে শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে। কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্কে জড়াবে না। তাতে বলা হয়, এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রথম চূড়ান্ত সীমারেখা বা রেড লাইন হলো তাইওয়ান। এ কারণে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক অভিযোগ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। তাতে বলা হয়েছে, তাইওয়ানের সঙ্গে যেকোনো আনুষ্ঠানিকতাকে চীন কঠোরভাবে বিরোধিতা করে। একই সঙ্গে তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো প্রেক্ষিতে হস্তক্ষেপকেও বিরোধিতা হিসেবে দেখে।
স্বশাসিত তাইওয়ানে উইলিয়াম লাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মাত্র কয়েক ঘন্টা পরে সেখানে একটি রাজনৈতিক প্রতিনিধি দলকে পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা। এর পর ওয়াশিংটনের প্রতি চীনের ওই বার্তাকে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই প্রতিনিধি দলকে পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি আগেই নির্বাচনের ফলকে স্বাগত জানিয়েছেন। প্রতিনিধি দলে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সাবেক একজন উপদেষ্টা এবং সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাইওয়ানের নতুন প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানিয়েছে বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানি সহ পশ্চিমা অনেক দেশ।
তাইওয়ানের নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে চীনের বক্তব্য
চীনের জাতীয় পরিষদের তাইওয়ান বিষয়ক অফিসের মুখপাত্র ছেন পিন হুয়া ১৩ তারিখ সন্ধ্যায় তাইওয়ানের নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে বক্তব্য দেন। তিনি বলেছেন, তাইওয়ানের এবারের দুটি নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে যে, ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি দ্বীপে মূলধারার জনমতের প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে না। তাইওয়ান চীনের তাইওয়ান। এই নির্বাচন আন্তঃপ্রণালী সম্পর্কের মৌলিক প্যাটার্ন এবং বিকাশের দিক পরিবর্তন করতে পারে না। এটি তাইওয়ান প্রণালীর উভয় দিকের দেশবাসীর কাছাকাছি এবং কাছাকাছি যাওয়ার সাধারণ আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তন করতে পারে না এবং এটি মাতৃভূমির সাধারণ প্রবণতা- পুনরায় একত্রিত হবে এবং তা অনিবার্য। এ কাজ প্রতিহত করা যাবে না।
তাইওয়ান সমস্যার সমাধান এবং জাতীয় পুনর্মিলন অর্জনের বিষয়ে আমাদের অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তা আমাদের দৃঢ় ইচ্ছা। আমরা এক-চীন নীতির আলোকে “১৯৯২ সম্মতি” মেনে চলব, “তাইওয়ানের স্বাধীনতা” বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ এবং বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করব। আমরা প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী এবং তাইওয়ানের সব স্তরের মানুষের সঙ্গে বিনিময় ও সহযোগিতা, দুই তীরের সমন্বিত উন্নয়ন গভীর করবো, যৌথভাবে চীনের সংস্কৃতিকে উন্নত করবো, দুই তীরের সম্পর্কের শান্তিপূর্ণ বিকাশ জোরদার করব এবং মাতৃভূমির পুনর্মিলন বাস্তবায়ন করবো।
নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, ‘এক-চীননীতি’-তে কোনো পরিবর্তন ঘটবে না।
তাইওয়ান চীনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাইওয়ানের নির্বাচন চীনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার; নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, ‘এক-চীননীতি’-তে কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই গতকাল (রোববার) মিসরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন।
ওয়াং ই বলেন, আন্তর্জাতিক সমাজে ‘এক-চীননীতি’ একটি স্বীকৃত বিষয়। তাইওয়ান চীনের একটি অংশ ছিল, আছে, এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তাইওয়ানকে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে-কোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। আর, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কেউ যদি ‘এক-চীননীতি’ লঙ্ঘন করে, তবে তা হবে চীনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সরাসরি হস্তক্ষেপ ও চীনের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। চীনা জনগণ তা কখনও মেনে নেবে না।
তিনি আরও বলেন, তথাকথিত ‘স্বাধীন তাইওয়ান’ ধারণা তাইওয়ানের বাসিন্দা, চীনের মৌলিক স্বার্থ, ও তাইওয়ান প্রণালীর শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। চীন বিশ্বাস করে, আন্তর্জাতিক সমাজ ‘এক-চীননীতি’ অনুসরণ করে যাবে এবং তাইওয়ানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরোধিতা করে, চীনের পুনরেকত্রীকরণের কাজকে সমর্থন দিয়ে যাবে।