রাশিয়া এবং চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন একত্রিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন বলে অভিযোগ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
পুতিন এবং শি জিনপিংকে নিয়ে যখন বেইজিংয়ে চীনের সামরিক প্যারেড শুরু হয়েছে, তখন জিনপিংকে উদ্দেশ্য করে ট্রাম্প বলেন, আপনারা যখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছেন, সেই আবহে ভ্লাদিমির পুতিন এবং কিম জং উনকে আমার উষ্ণ অভ্যর্থনা দেবেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে কুচকাওয়াজে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ছিলেন তখন ট্রাম্প শি জিনপিংকে সম্বোধন করে ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে লিখেছেন, ভ্লাদিমির পুতিন এবং কিম জং উনকে আমার উষ্ণ শুভেচ্ছা জানাই, কারণ আপনারা আমেরিকার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন।
বেইজিংয়ে যে সামরিক প্যারেডের আয়োজন করা হয়েছে, সেটার মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক, সামরিক এবং কূটনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চাইছে চীন। স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে, যে কোনো দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করার ক্ষমতা আছে বেজিংয়ের। ওই সামরিক প্যারেডে অবশ্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যোগ দেননি। বিষয়টি থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন তিনি।
বেইজিংয়ে সি-পুতিন বৈঠক

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আজ মঙ্গলবার সকালে বেইজিংয়ের মহাগণভবনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে আলোচনায় মিলিত হন। ২০২৫ সালে শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ-সম্মেলন এবং জাপানের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চীনের জনগণের প্রতিরোধ-যুদ্ধ ও বিশ্ব ফ্যাসিবাদ-বিরোধী যুদ্ধে বিজয়ের ৮০তম বার্ষিকী অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পুতিন চীন সফরে এসেছেন।
বৈঠকে প্রেসিডেন্ট সি উল্লেখ করেন যে, চীন-রাশিয়া সম্পর্ক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পরীক্ষা অতিক্রম করেছে, এবং চিরস্থায়ী সুপ্রতিবেশী, সার্বিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব, উপকারিতামূলক সহযোগিতা ও জয়-জয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছে, যা সারা বিশ্বের জন্য একটি দৃষ্টান্ত। উভয়পক্ষ তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছে এবং স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে, সকল ক্ষেত্রে সহযোগিতা ইতিবাচক ফলাফল অর্জন করেছে। চীন রাশিয়ার সাথে উচ্চ-স্তরের আদানপ্রদান ঘনিষ্ঠ করতে, পরস্পরের উন্নয়ন ও পুনরুজ্জীবন সমর্থন করতে, দু’দেশের মূল স্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়ে অবস্থান সমন্বয় করতে ইচ্ছুক, যাতে চীন-রাশিয়া সম্পর্ক আরো বড় অগ্রগতি অর্জন করতে পারে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, চীন ও রাশিয়া উভয়েরই নিজস্ব উন্নয়ন ও পুনরুজ্জীবনের জন্য শক্তিশালী গতিশীলতা রয়েছে, এবং উভয়পক্ষকে বড় প্রকল্পের মাধ্যমে সহযোগিতার উন্নয়ন করতে, ফ্ল্যাগশিপ সহযোগিতা প্রকল্প গড়ে তুলতে, এবং গভীর স্তরের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সমন্বিত উন্নয়ন করতে হবে। সহযোগিতার স্থিতিস্থাপতা জোরদার করতে, সহযোগিতার সমন্বয় গভীর করতে, এবং সহযোগিতার সামগ্রিক অবস্থা ভালোভাবে রক্ষা করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, চীন ও রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানরা পরস্পরের দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ফ্যাসিবাদ-বিরোধী বিজয়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান বিজয়ী দেশ এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে দায়িত্ববোধ প্রদর্শন করে, এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুফল রক্ষা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঠিক ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোন রক্ষা করার দৃঢ় সংকল্প দেখায়। আমি বৈশ্বিক শাসন উদ্যোগ উপস্থাপন করেছি, যাতে সকল অভিন্ন চিন্তাধারা বহনকারী দেশগুলোর সাথে, জাতিসংঘ সনদের নীতি ও চেতনা দৃঢ়ভাবে রক্ষা করতে, এবং আরও ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থা গঠন গতিশীল করে তোলা যায়। চীন ও রাশিয়া উভয়ই সার্বভৌমত্ব সমতা, আন্তর্জাতিক আইনের শাসন এবং বহুপাক্ষিকতার উপর জোর দেয়, এবং উভয়কে জাতিসংঘ, শাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, ব্রিকস, জি২০ এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে সহযোগিতা জোরদার করতে হবে, এবং হাতে হাত মিলিয়ে মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যতের কমিউনিটি গঠন করতে হবে।
পুতিন বলেন, আমার এবং প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের নেতৃত্বে, রাশিয়া-চীন সম্পর্ক উচ্চমাত্রার কৌশলগত চরিত্র প্রদর্শন করেছে এবং ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং মে মাসে রাশিয়ায় রাষ্ট্রীয় সফর করেন এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মহান দেশ-রক্ষা যুদ্ধের বিজয়ের ৮০তম বার্ষিকী অনুষ্ঠানে অংশ নেন, এবং আমি আগামীকাল চীনের জনগণের জাপানের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-যুদ্ধের বিজয়র ৮০তম বার্ষিকী অনুষ্ঠানে অংশ নেব, এটি দুটি দেশ বিশ্বের কাছে দেখাচ্ছে যে, রাশিয়া ও চীন বিশ্ব ফ্যাসিবাদ-বিরোধী যুদ্ধে পরস্পরের পাশে দাঁড়িয়ে একসাথে লড়াই করেছিল, এবং ইউরোপীয় ও পূর্ব মূল যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয়ের জন্য প্রধান অবদান রেখেছে, এবং একসাথে ঐতিহাসিক সত্যতা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুফল রক্ষার দৃঢ় মতাধিষ্ঠানের প্রমান করে। বিশ্ব ফ্যাসিবাদ-বিরোধী যুদ্ধে রাশিয়া ও চীনের একতা ও সহযোগিতা নতুন যুগে রাশিয়া-চীন সম্পর্ক উন্নয়নের মজবুত ভিত্তি হয়ে উঠেছে। চীন সফলভাবে শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার থিয়েনচিন শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করার জন্য অভিনন্দন জানাই, যা বহু ঐকমত্য অর্জন করেছে এবং শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার উন্নয়ন ত্বরান্বিত করেছে। প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের বৈশ্বিক শাসন উদ্যোগ খুব সময়োপযোগী এবং খুব প্রয়োজন, তা বৈশ্বিক শাসন ঘাটতি সমাধান করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। রাশিয়া চীনের সাথে কৌশলগত সমন্বয় বজায় রাখতে, উচ্চ-স্তরের আদানপ্রদান ঘনিষ্ঠ করতে, সকল ক্ষেত্রে বাস্তব সহযোগিতা জোরদার করতে, এবং দু’দেশের সম্পর্ক আরো উচ্চ পর্যায়ে উন্নয়ন করতে ইচ্ছুক।
দু’দেশের নেতারা অভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয় নিয়েও মতবিনিময় করেন।
একই দিন দুপুরে, সি চিনপিং পুতিনের সাথে একটি ছোট আকারের চা-চক্র করেন এবং একসাথে মধ্যাহ্নভোজ করেন।
দু’পক্ষ জ্বালানি, মহাকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃষি, পরিদর্শন ও কোয়ারেন্টাইন, স্বাস্থ্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, শিক্ষা, মিডিয়া এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ২০টিরও বেশি দ্বিপাক্ষিক সহযোগিহা নথি স্বাক্ষর করে।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং মঙ্গলবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

সি বলেন, বৈশ্বিক পরিবর্তন এখন দ্রুত ঘটছে। এ সময়ে চীন-পাকিস্তান দৃঢ় সম্পর্ক আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়ন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নতুন যুগে দুই দেশকে আরও ঘনিষ্ঠ কমিউনিটি গড়ে তুলতে হবে, যা দুই দেশের জনগণের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।
তিনি আরও জানান, চীন পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর এবং চীন-পাকিস্তান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির উন্নত সংস্করণ তৈরি করতে আগ্রহী। এ জন্য পাকিস্তানকে চীনা নাগরিক, প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
শাহবাজ শরিফ বলেন, প্রেসিডেন্ট সি প্রস্তাবিত গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ বিশ্ব শান্তি, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান এ উদ্যোগকে পূর্ণ সমর্থন দেবে এবং সক্রিয়ভাবে বাস্তবায়নে কাজ করবে।
চীনা নাগরিক, প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে পাকিস্তান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলেও জানান তিনি।