• ৩রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৬ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

এমপিদের মূল কাজ অধিকাংশ সংসদ সদস্য কি জানেন ?

Usbnews.
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৫
এমপিদের মূল কাজ অধিকাংশ সংসদ সদস্য কি জানেন ?
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

অধঃপতনের সর্বশেষ চিত্র হচ্ছে সংসদের মোট কার্যসময়ের মাত্র ১৭ শতাংশ আইন প্রণয়নের কাজে ব্যয় হওয়া। (পার্লামেন্ট ওয়াচ, ১-২২ অধিবেশন: জানুয়ারি ২০১৯ থেকে এপ্রিল ২০২৩, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), ১ অক্টোবর ২০২৩)

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় একটি রাষ্ট্রের জাতীয় সংসদ যদি তার মোট কার্যঘণ্টার ৮৩ শতাংশেরও বেশি সময় আইন প্রণয়নবহির্ভূত অন্যান্য কাজে ব্যয় করে, তাহলে সে সংসদ কি নিছক একটি আলংকারিক প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায় না?

টিআইবির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সংসদ পরিচালনার প্রতি মিনিটে ব্যয়ের পরিমাণ ২ লাখ ৭২ হাজার টাকা। সে হিসাবে সংসদে মোট ব্যয়ের ৮৩ শতাংশ সময় আইনপ্রণয়নবহির্ভূত কাজে ব্যয় হয়ে থাকে। একটি বড় অংশ যে অপচয়মূলক, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তাহলে একবার শুধু ভেবে দেখুন, অপচয়ের মাত্রা কত বড়!

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে র সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে– “‘জাতীয় সংসদ’ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইনপ্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে।” পৃথিবীতে বর্তমানে যেসব রাষ্ট্রে এ ধরনের সংসদ রয়েছে, বস্তুত সেগুলোর কাজ মোটামুটি একই। অর্থাৎ আইন প্রণয়ন। বাজেট প্রণয়ন। রাষ্ট্রের কল্যাণের পক্ষে চুক্তি নিয়ে বিতর্ক।

কিন্তু এসব করার মতো যোগ্যতা কি সকল এমপিদের আছে বা ছিল অথবা আগামীতে যারা আসবে তাদের আছে ?

সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী উল্লিখিত স্থানীয় সরকারের ওপর ভিত্তি করেই মূলত রাষ্ট্রের অধিকাংশ পরিচালন কার্যক্রম (স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি পরিচালনা) এবং উন্নয়ন উদ্যোগ (রাস্তাঘাট, সেতু ইত্যাদি নির্মাণ) বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। কিন্তু এসব যাদের করার কথা না সেই এমপিরা তদবির থেকে শুরু করে লোপাটে জড়ায়ে গিয়ে নাম ও ফিতা কাটার উল্লাসে মত্ত থাকেন।

এমপিদের মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় উন্নয়ন। অথচ স্থানীয় উন্নয়নের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ সরকারের আরও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এমপিরা এসব প্রতিষ্ঠানেও খবরদারি করেন। মূলত স্থানীয় পর্যায়ের সব প্রতিষ্ঠানই, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও এমপিকে ঘিরে মাতব্বরি । ভন্ড পীরদের পায়ের কাছে যেমন কিছু মূর্খ মুরিদ বসে থাকে , ঠিক তেমনি দলীয় চাটুকার ও অবৈধ সুবিধাবাদী নেতা কর্মীরা লাইন ধরে তোষামোদীতে প্রতিযোগিতা করে। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার কমিটিও এমপিদের নির্দেশনার বাইরে হয় না। অর্থাৎ এমপিদের মূল কাজ যে আইন ও নীতি প্রণয়ন, সংশোধন—সেই কাজটিই তারা সবচেয়ে কম করেন।

তাদের কি সেই যোগ্যতা ছিল বা আছে অথবা আগামীতে যারা আসবে তাদের কি সেই মেধা আছে ?
মূলত: এমপিদের প্রধান কাজ সংসদে আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত। তারা সংসদে আইন প্রণয়ন করবেন, বিদ্যমান আইন সংশোধন করবেন, নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রয়োজন হলে খোদ সংবিধান সংশোধন করবেন এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবেন। সংসদের স্থায়ী কমিটিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়গুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবেন। আইন প্রণয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে যথাযথ ভূমিকা রাখবেন ও বিতর্কে অংশ নিবেন।

আইন প্রণয়ন: সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের শাসনব্যবস্থা এবং জনজীবনকে পরিচালনা করেন। তারা নতুন আইন তৈরি করতে পারেন, পুরানো আইন সংশোধন করতে পারেন, বা পুরানো আইন বাতিল করতে পারেন।

বাজেট অনুমোদন: সংসদ সদস্যরা প্রতি বছর সরকারের বাজেট অনুমোদন করেন। এতে সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব থাকে।

সরকারের কার্যাবলী তদারকি: সংসদ সদস্যরা সরকারের কার্যাবলী তদারকি করেন। তারা প্রশ্ন উত্থাপন, অনাস্থা প্রস্তাব, বা সংসদীয় কমিটি গঠনের মাধ্যমে সরকারের কাজকর্মের সমালোচনা করতে পারেন।

অন্যান্য বিষয়: সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ, ইত্যাদি।
এমপিদের মূল কাজ –
সংসদে আইন প্রণয়ন, সংশোধন বা বাতিল করার ক্ষমতা।
সরকারের বাজেট অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা।
সরকারের কার্যাবলী তদারকি করার ক্ষমতা।
সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারার ক্ষমতা।
সংসদীয় কমিটি গঠন করার ক্ষমতা।

সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা কী ? নেই কোন শিক্ষার মানদণ্ড , তাই নাচ গান সহ চলে হরেক রকম বিনোদন।
বাংলাদেশের সংবিধানে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা সম্পর্কে বলা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে-
১. কোন ব্যক্তিকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং তার বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।
২. কোন আদালত কতৃক ওই ব্যক্তিকে অপ্রকৃতিস্থ বা পাগল বলে ঘোষণা করা হয়নি
৩. কোন ব্যক্তি বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে বা বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার বা ঘোষণা করলে তিনি প্রার্থী হতে পারবেন না।
৪. কোনো ব্যক্তি নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধের দায়ে দুই বছরের কারাদণ্ডের পর মুক্তি পাওয়ার পাঁচ বছর পার না হলে তিনি প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন।
৫. কেউ দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী হলে প্রার্থী হতে পারবেন না
৬. সরকারের কোন লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকলে তিনি প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হবেন না।

যদি কেউ প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ করে যে সকল এমপি কি সংবিধানের অনুচ্ছেদ গুলোর মধ্যে ৩০বা ৪০ ভাগের নাম বলতে পারবেন ? নিশ্চিত করে বলা যায় ফেল মারবেন শতকরা বেশিরভাগ।

বাস্তবতা হলো, সংরক্ষিত আসনসহ সংসদে সাড়ে তিনশ’ এমপির মধ্যে খুব সামান্য সংখ্যকই বিলের ব্যাপারে নোটিশ দেন। সরকারি দলের এমপিরা সাধারণত বিলে সংশোধনী আনার বিষয়ে কোনও নোটিশ দেন না বা এ বিষয়ে বক্তৃতা দেন না। যদিও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় বিরোধিতা করলেও কারও সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে না। কিন্তু জনগণের পয়সা নষ্ট করে যাত্রাগান ,পালাগান , ব্যক্তি পূজার আরাধনা , তেলবাজির পূর্ণ প্রতিযোগিতা করেন। আবার এমন ও কিছু এমপি দেখা যায় , যারা হাতে লেখা কয়েকটি লাইন ও ঠিক মতো পড়তে পারেন না।

কেন আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া এমপিদের আগ্রহ কম, তার একটি কারণ হয়তো এই যে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হলে যে পরিমাণ পড়াশোনা এবং গবেষণা দরকার, অধিকাংশ সংসদ সদস্য তা করতে চান না। অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রস্তাবিত বিলটি ভালো মতো পড়েও দেখেন না বা সেই সময় তারা দিতে চান না। অনেকের শিক্ষাগত যোগ্যতায়ও এটি কাভার করে না।

এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি, ঢাকায় প্লট ও নিজ এলাকার উন্নয়নের বরাদ্দ দেয়া মানে তাদের জন্য দুর্নীতির  জন্য অর্থ বরাদ্দ : 

বাংলাদেশে এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি, ঢাকায় প্লট ও নিজ এলাকার উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। শুল্কমুক্ত গাড়ি পাওয়া মানে কয়েক কোটি টাকার মালিক হওয়া। অনেকে শুল্কমুক্ত গাড়ি বিদেশ থেকে আমদানি করে পরে চড়া দামে বিক্রি করে দেন। ঢাকায় প্লট পাওয়া মানে রাতারাতি কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া। উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া মানে দুর্নীতি ও লুটপাটের জগতে ঢোকার ব্যবস্থা করে দেয়া। মোট কথা, এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি, ঢাকায় প্লট ও নিজ এলাকার উন্নয়নের বরাদ্দ দেয়া মানে তাদের জন্য দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার ক্ষেত্র সৃষ্টি করা ও তাদেরকে দুর্নীতির দিকে আনন্দের সাথে আহব্বান করা ।

এমপিরা হবেন রাষ্ট্রের মালিক তথা জনগণের প্রতিনিধি ও সেবক। নির্বাচনের আগে ভোটভিক্ষা করেন। কিন্তু এমপি হয়ে গেলে মাত্র অল্প কয়েকজন ছাড়া সবাই জমিদার চরিত্রে জনগণকে দাম্ভিকতা দেখান।

বিদ্যমান আইন ও সংবিধানের (অনুচ্ছেদ ৬৬) আলোকে যেহেতু ২৫ বছর বয়সী এবং সুস্থ যেকোনও নাগরিকই সংসদ সদস্য হতে পারেন, এবং এক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা কোনও অন্তরায় নয়, ফলে আইন প্রণয়নের মতো একটি অ্যাকাডেমিক কাজ যখন পড়ালেখা না জানা লোকদের ছাড়াই গলাবাজ , তেলবাজ , গুণ্ডাবাজ , কালো টাকার বটগাছ এমপি হয়ে যায়। থানার দারোগা , ওসির সাথে আঁতাত এবং তদবির করা এমপির কাজ হতে পারে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এই কাজটি হরদম চলেছিল , চলবে।

এই জন্য জ্ঞান নাই তাই কি বলবে এমন যখন অবস্থা তখন ২০১৯ সালে টিআইবির একটি রিপোর্টে বলা হয়, জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত আলোচনাতেই সবচেয়ে কম সংখ্যক সংসদ সদস্য অংশ নেন। তাদের রিপোর্ট বলছে, দশম সংসদে শুধু কোরাম সংকটে ক্ষতি হয়েছে ১৬৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।