গাজা উপত্যকায় আটক জিম্মিদের জন্য ওষুধ সরবরাহের বিষয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি করেছে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। বিনিময়ে গাজায় আরও বেশি ত্রাণ সরবরাহের অনুমতি দেবে ইসরায়েল।খবর রয়টার্সের।মঙ্গলবার কাতার এবং ফ্রান্সের মধ্যস্থতায় এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে দু’পক্ষের প্রতিনিধি।কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরর মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি জানিয়েছেন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, নিজেদের হাতে আটক জঙ্গিদের শারীরিক ও স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে হামাস; বিনিময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় আরও বেশি ত্রাণ সামগ্রী প্রবেশ করতে দেবে ইসরায়েল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছে, ‘ওষুধগুলো গাজায় কাতারের প্রতিনিধিরা পাঠিয়ে দেবেন।’
এদিকে ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৪৫ জন জিম্মির জন্য ওষুধগুলো পাঠানো হচ্ছে। নভেম্বরে ৮৩ জনের প্রাথমিকভাবে ওষুধের প্রয়োজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখ্যপাত্র ফিলিপ ল্যালিয়ট জানিয়েছেন, দক্ষিণ গাজার সীমান্ত শহর রাফাহ’র একটি হাসপাতালে ওষুধ পৌঁছানোর পর বুধবার আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি ওষুধ গ্রহণ করবে এবং তারা অবিলম্বে জিম্মিদের কাছে পৌঁছে দেবে। এই ওষুধে জিম্মিদের তিন মাস চলবে।
প্রসঙ্গত, গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। এদিন ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় ইরেজ সীমান্ত দিয়ে ইসরায়েলে প্রবেশ করে অতর্কিত হামলা চালায় হামাস যোদ্ধারা। হামাসের হামলায় ইসরায়েলে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ২০০ জন। পাশাপাশি ইসরায়েল থেকে প্রায় ২৪০ জনকে জিম্মি হিসেবে গাজায় নিয়ে যায় হামাস।
তারপর ওই দিন থেকেই গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। পরে ২৮ অক্টোবর থেকে অভিযানে যোগ দেয় স্থল বাহিনীও। প্রায় তিন মাস ধরে ইসরায়েলি বর্বরোচিত হামলায় গাজার হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থী শিবির, মসজিদ, গির্জাসহ হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে, যা গত ৭৫ বছরে ফিলিস্তিনিদের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক সংঘর্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
মাঝে এক সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধবিরতিতে ২৪ বিদেশিসহ মোট ১০৫ জনকে মুক্তি দিয়েছে হামাস। বিনিময়ে ইসরায়েলি কারাগার থেকে ২৪০ ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ৭১ জন মহিলা এবং ১৬৯টি শিশু রয়েছে। হামাসের কাছে এখনো ১৩০ জন জিম্মি রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকা অনুরোধ জানিয়েছে, গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে কিনা তা বিবেচনা করে দেখতে। ফিলিস্তিনিদের বাস্তবতা এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিগুলি কীভাবে তাদের অবস্থা বর্ণনা করছে তার মধ্যে ব্যবধান দূর করা। এখন কয়েক সপ্তাহ ধরে, গাজার ঘটনায় ক্ষোভ পুরো ইউরোপের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে। তবুও এই ক্ষোভকে রাজনৈতিক নেতারা দৃঢ়ভাবে উপেক্ষা করেছেন, নিষিদ্ধ করেছেন বা অপমান করেছেন। যুদ্ধবিরতির জন্য জনসমর্থন এখন যুক্তরাজ্যে ৭০% এর বেশি, কিন্তু সরকারের বা বিরোধীদের কারোর মধ্যেই প্রতিফলিত হয় না। বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘ এমনকি পোপ সহিংসতার নিন্দা করলেও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে এখনো কোনো অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র বাধা দিয়েছে। এমনকি প্রতিবাদের ভাষাকে দমাতে তা নিয়ে কাটাছেঁড়া করা হচ্ছে, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ”একাডেমিক তত্ত্ব” খাড়া করা হচ্ছে। বৃটেনের পররাষ্ট্র সচিব ডেভিড ক্যামেরন মনে করেন, ”গণহত্যার অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা উচিত নয়।
ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ইসমাঈল হানিয়া ফিলিস্তিনীদের কাছে প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর জন্য একটি মানবিক জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি প্রতিরোধ বাহিনীর সহায়তা দান এবং ইসরাইলের অপরাধ ও দুষ্কৃতির বিষয় তুলে ধরতে একটি বৈশ্বিক জোট গড়ে তোলারও আহ্বান জানিয়েছেন।