“আমার ছেলেটার কথা মনে পড়লে বুকটা ফেটে যায়। ও আমারে বলতো, আমার বাপ নাই, আমিই তোমারে পালমু মা। ঘর-বাড়ি বানামু। তোমার কোন কষ্ট থাকবোনা..”
‘আমার আশিক ছিলো সবার ছোট ছেলে। ঢাকায় থাকতো বোনের সাথে। আগে মাদ্রাসায় পড়তো। পরে আর পড়েনা দেখে আমি ঢাকায় একটা কাজ নিয়ে দেই একটা কোম্পানিতে। যেদিন শহিদ হয় তার আগের দিন কথা হয় ওর সাথে। ও বলতেছিলো ‘আম্মু আপু তো কালকে বাড়ি যাবে, আমি আসবোনা আমার ডিউটি আছে।
৪ আগস্ট ওর ডিউটি শেষ হয় চারটায় দিকে। ৫টার দিকে আন্দোলনে যায়। ৬ টার দিকে কাঁচপুর সিনা গার্মেন্টসের সামনে রানে গুলি খায়। তখন তো আশেপাশে কেউ ছিলোনা। সমবয়সী যাদের সাথে গেছে ওরা ওকে রাস্তার একপাশে এনে রাখে। ওরা বুঝতেছিলোনা কি করবে। এদিকে আশিকের প্রচুর রক্ত যায়।
আমরা তো সবাই বাড়িতে, কেউ আসতে পারতেছিনা। পোলাপান মিলে বারাকা হসপিটালে নেয়। রক্ত বন্ধ করতে পারেনা ওরা। ঢাকা মেডিকেল পাঠায়। সেখানে নেওয়ার পর গেটের পাশে পড়ে থাকে আমার ছেলে। ভর্তি করানোর জন্য গার্জিয়ান তো নাই কেউ।
পুরাটা সময় আমার ছেলের রক্ত যায়। ভ্যানে করে যে নিছে পুরা ভ্যান থেকে চুয়ে চুয়ে পড়তেছিলো রক্ত। রাত প্রায় ৩টার দিকে ভর্তি নেয়। এর মাঝে ১২ টার সময় আশিক ওর বোনরে ফোন দিসে। কয় ‘আপা বাঁচাও আমারে, আমার শরীর কেমন কেমন লাগে!’
রক্ত যাইতেছিলো তখনো। ভর্তি করানোর পর হাসপাতালে থেকে রক্ত দিসে, কিনে নিসি। কিন্তু রক্ত থাকেনা শরীরে। সব বের হয়ে যায়। পরদিন সকাল ৮.১০ দশ মিনিটে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করে।
আমার ছেলেটা গুলি খাওয়ার পর শুধু একটা কথাই বলছে যে মা’রে বলিস আমার সাথে দেখা করার জন্য যেন কাঁচপুর আসে। ১৬ বছর শেষে ১৭ তে পড়ছিলো আমার ছেলে। অনেক আশা ছিলো ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে। বাপ-চাচা কেউ ছিলোনা। একা একা বড় হইছে।
আমার ছেলেটার কথা মনে পড়লে বুকটা ফেটে যায়। ও নামাজ পড়তো। কাউরে গালি দিতোনা। নিজের মতো থাকতো। আমারে বলতো ‘আমার বাপ নাই। আমি তোমারে পালমু মা। ঘর-বাড়ি বানামু। তোমার কোন কষ্ট থাকবোনা।’
আমি মানা করতাম যে বাবা আন্দোলনে যাইসনা। সে বলতো যাবেনা। পরে তো গেলো পোলাপানের সাথে। আমার আশিক ছাড়া কে আছে এখন আর! আমি কত অসহায় এখন! কে দেখবে আমারে আর!’
– কুলসুম বেগম (শহিদ মোঃ আশিকের মা)
বাঞ্চারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া