এমজেড এম আলম , সিলেট বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান : সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে ১৪টি আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। ১৪ আসনে বিএনপির প্রার্থীগণ হলেন- সিলেট-১ (মহানগরের একাংশ ও সদর) আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর সহধর্মিনী তাহসীনা রুশদীর লুনা, সিলেট-৩ (মহানগরের একাংশ, দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালিক, সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার) জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী।
সুনামগঞ্জ-১ (ধর্মপাশা, মধ্যনগর, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ) আসনে তাহিরপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুল হক, সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ) আসনে যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কয়সর এম আহমদ ও সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক ও দোয়ারাবাজার) আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সিলেট বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাবেক এমপি কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন।
মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা ও জুড়ি) আসনে নাসির উদ্দিন আহমেদ মিঠু, মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে সওকত হোসেন সকু, মৌলভীবাজার-৩ (সদর ও রাজনগর) আসনে নাসের রহমান ও মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ) আসনে মো: মজিবুর রহমান চৌধুরী।
হবিগঞ্জ-২ (আজমিরীগঞ্জ ও বানিয়াচং) আসনে ডা: সাখাওয়াত হাসান জীবন, হবিগঞ্জ-৩ (সদর, লাখাই ও শায়েস্তাগঞ্জ) আসনে মো: জি কে গউস ও হবিগঞ্জ-৪ (চুনারুঘাট ও মাধবপুর) আসনে এস এম ফয়সাল।
জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। এ নিয়ে রয়েছে ‘অসন্তোষ’। জামায়াত সব আসনে প্রার্থী দিয়ে অনেক আগে থেকেই গণসংযোগ শুরু করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রার্থী ঘোষণা না করলেও সিলেট-১ ও ৩ আসনে দলটির দুই নেতা তৎপর আছেন। এ ছাড়া ইসলামপন্থি বেশ কয়েকটি দলের নেতারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন।
সিলেটের নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপির ‘বহিরাগত’‘লোকাল’তকমা সহ তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ অভ্যন্তরী কোন্দল ও টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে।
গত সোমবার (৩ নভেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৩৭টি আসনে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে বিএনপি। সিলেটের ৬টি আসনের মধ্যে সিলেট-০৪ ও সিলেট-০৫ আসনে প্রার্থী ঘোষণা দেয়নি দলটি। এরপর থেকেই সিলেট-০৪ আসন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
সম্প্রতি আরিফুল হক চৌধুরী নিজেকে এ আসনের প্রার্থী ঘোষণা করার পর তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ অভ্যন্তরী কোন্দল ও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। তবে স্থানীয় বিএনপির নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকায়, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। তবে কেন্দ্র থেকে প্রার্থিতা ঘোষণা চূড়ান্ত হলে মাঠের বাস্তবতা সমর্থন জোগাবে, সেটি নির্ভর করবে দলের সাংগঠনিক শক্তি ও প্রার্থীর গণভিত্তির ওপর।
সিলেট-০১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পান বিএনপি চেয়ারপার্সনের অন্যতম উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। আরিফুল হক চৌধুরীও এ আসনের মনোনয়ন পেতে লবিং করেছিলেন। মনোনয়ন না পেয়ে তিনি পরদিনই চলে যান ঢাকায়। এরপর ৫ নভেম্বর রাতে গণমাধ্যমকে তিনি জানান, দলের পক্ষ থেকে তাকে প্রার্থী মনোনীত করা হয়েছে।তিনি দাবি করেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাকে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছেন। দু’দিন ঢাকায় অবস্থান করে সিলেটে ফিরে শুক্রবার থেকে নির্বাচনী প্রচারণাও শুরু করেছেন। ঐদিন এ আসনের সাবেক সাংসদ প্রয়াত দিলদার হোসেন সেলিমের কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে শুরু করেন নির্বাচনী প্রচারণা।
আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট-১ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সরাসরি নির্দেশে তিনি সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। যদিও বিএনপি থেকে আনুষ্ঠানিকবভাবে এ আসনের ব্যাপারে কোন ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
গত ৬ নভেম্বর রাতে ঢাকা থেকে মনোনয়ন নিয়ে সিলেট ফেরার পর ৭ নভেম্বর শুক্রবার বাদ জুমা গোয়াইনঘাটের রাধানগর বাজার জামে মসজিদে নামাজ আদায় করে প্রয়াত এমপি দিলদার হোসেন সেলিমের কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে আরিফ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করেন।
আরিফুল হক বলেন, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাকে আসনে মনোনয়ন দিয়েছেন। খুব শীঘ্রই দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। “এই আসনের প্রতিটি অলিগলি আমার পরিচিত। আমি জনগণের সমস্যা সম্পর্কে অবগত। দলের মনোনয়নে যদি নির্বাচিত হই, তাহলে প্রথম এক বছরের মধ্যেই স্থানীয় সমস্যাগুলোর সমাধান করব। যারা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন, তারা সবাই আমাদের ত্যাগী ও সম্মানিত নেতা। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করব।
সিলেট-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে জেলার আমির ও কেন্দ্রীয় মসলিশে শুরা সদস্য মাওলানা হাবিবুর রহমানকে প্রার্থী করা হয়।আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণাও শুরু করেছেন তিনি।
আরিফকে সিলেট-৪ আসনে ‘বহিরাগত’ দাবি করে এই আসনে ‘লোকাল প্রার্থী’র দাবিতে মাঠে নেমেছেন স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ। যারা হাকিম চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।এই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা সামসুজ্জামান জামান, জেলা বিএনপির উপদেষ্টা হেলাল উদ্দীন ও সাবেক সাংসদ দিলদার হোসেন সেলিমের স্ত্রী এডভোকেট জেবুন্নাহার সেলিম।
এ দাবিতে গত বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) রাত থেকে শুরু করে পরদিন শুক্রবার (৮ নভেম্বর) মধ্যরাত পর্যন্ত গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পৃথক পৃথক মিছিল ও মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাত ৯টা থেকে শুরু হয়ে মিছিল চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। সালুটিকর-গোয়াইনঘাট মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে খণ্ড খণ্ড মিছিল এসে জড়ো হয়।
মিছিলে অংশগ্রহণকারী কর্মীরা ‘লোকাল চাই হাকিম ভাই’, ‘আর নয় বিদেশি, এবারে স্বদেশি’, ‘হাকিম ছাড়া মানব না’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
এর আগে, বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) রাত দুইটার পর কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্তত ১৩টি স্থানে দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’-এর মনোনয়নপ্রত্যাশী আব্দুল হাকিম চৌধুরীর সমর্থনে খণ্ড মিছিল বের হয়। একই সময়ে জেলা বিএনপির উপদেষ্টা হেলাল উদ্দিন আহমদের সমর্থকরাও ‘লোকাল চাই, হেলাল ভাই চাই’ স্লোগান দেন।
জামায়াত ইসলামীর পক্ষ থেকে এই আসনে প্রার্থী হয়েছেন দলটির জেলা সেক্রেটারি জয়রাল আবেদীন। জানা যায়, সিলেট-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী জয়নালের শক্ত অবস্থান রয়েছে। তিনি এর আগে জৈন্তাপুরের উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন।
সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন স্থানীয় নেতা-কর্মীদের একটি অংশ। সম্প্রতি ফেসবুকে একাধিক পেজ খুলে স্থানীয় বিএনপির একটা বড় অংশ আসনটিতে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি তুলেছে।
ফেসবুকে পরিচালিত পেজগুলোর একটি ‘জননেতা কাইয়ুম ভাইয়ের সমর্থক’। এ ছাড়া নির্বাচনী এলাকার তিনটি উপজেলার বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতা-কর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবদুল কাইয়ুমের সমর্থনে পোস্ট করে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি করেছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এম এ মালিক ও আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ছাড়া এখানে বিএনপির আরও কয়েকজন মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এম এ সালাম এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আবদুল আহাদ খান জামাল উল্লেখযোগ্য।
এদিকে সিলেট-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লোকমান আহমদ।
গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৬ আসনে এবার বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী। রোববার হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার জিয়ারত করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণাও শুরু করেছেন তিনি।
তবে বিয়ানীবাজার উপজেলা বিয়ানীবাজার পক্ষ থেকে এমরানের বদলে এই আসনে ফয়সল আহমদ চৌধুরীকে প্রার্থী করার দাবি জানানো হয়েছে। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছেন বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির নেতারা।
গত শনিবার বিয়ানীবাজারে ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের অনুষ্ঠানে বিএনপির নেতারা এ দাবি জানান।
এখানে জামায়াতের প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। তিনি অনেক দিন ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করে আসছেন।
সিলেট-৫ (কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ)এই আসনেও কাউকে প্রার্থী দেয়নি বিএনপি। এখানে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে জেলার নায়েবে আমির আনোয়ার হোসেন খান।
সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) এখানে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে অধ্যক্ষ আবদুল হান্নান দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন।‘গুম হওয়া’ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর আসন হিসেবে পরিচিত সিলেট-২। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানীর বনানী থেকে গাড়িচালকসহ ইলিয়াস আলী ‘গুম’ হওয়ার পর থেকে তৎপর হন তাঁর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর (লুনা)। অল্পদিনেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। এবার তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।