বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু নাম আছে, যাদের উপস্থিতি দৃশ্যমান না হলেও প্রভাব অদৃশ্য শক্তির মতো বিস্তৃত। তারেক রহমান সেই নামগুলোর একটি। লন্ডনের দূরপ্রবাসে থেকেও তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বিরোধী রাজনীতির ভাষা এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাকে যেভাবে প্রভাবিত করেছেন—তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বহুল আলোচিত। তাকে নিয়ে যে নিন্দুকরা অসত্য বিতর্কের সৃষ্টি করেনি তা কিন্তু নয়, তবে সব বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারেক রহমানকে উপেক্ষা করে আজকের গণতন্ত্রের পথরেখা আঁকা যায় না।
আজ তারেক রহমান বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্র, আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক রূপান্তর এবং বিপরীত রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। স্বৈরশাসনের ছায়া থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের ইতিহাস ও তারেক রহমান অঙ্গাঙ্গি হিসেবে জড়িত।
এরই মধ্যে বিএনপির রাজনীতিতে তারেক রহমান আবির্ভূত হন। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে তিনি যেভাবে সংগঠনের ভেতরে আধুনিকায়ন, তরুণ নেতৃত্ব, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর দলীয় ব্যবস্থাপনা এবং জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিমূলক কাঠামো নিয়ে ভাবতে শুরু করেন—তা বাংলাদেশের প্রচলিত ঐতিহ্যগত রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।
বিএনপির তৃণমূল-মিতালি তৈরির জন্য তার উদ্যোগ ‘রাজনীতি মানুষের দোরগোড়ায়’—এ ধারণাটির ভিত্তি আরও শক্ত করে। সে সময়েই তিনি দলীয় কার্যালয়ে নিয়মিতভাবে তৃণমূলের সঙ্গে বৈঠক করতেন, স্থানীয় নেতৃত্বদের ভূমিকা শক্তিশালী করতে সংগঠন পুনর্গঠনে মন দেন, যা রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করে।
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের বিজয় দেশের রাজনীতিকে নতুন পথে নিয়ে যায়। এ সময় দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তরুণ নেতৃত্বের সংযুক্তি, কেন্দ্র-তৃণমূল সম্পর্ক জোরদারকরণে তারেক রহমান সমান্তরাল রাজনৈতিক প্রভাবশালী ভূমিকায় ছিলেন। কেউ কেউ এ সময়টিকে তার ‘উদীয়মান ক্ষমতার সময়’ বলে অবহিত করেন।
সরকারের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্র, আমলাতন্ত্র, নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক সহিংসতা—সবকিছুই এক জটিল দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে চলছিল।
এ সময়ে যে বিষয়টি বেশি স্পষ্ট হয়েছে তা হলো—তারেক রহমান নতুন ধারার রাজনৈতিক সংগঠন চালু করতে চেয়েছিলেন। করপোরেট স্টাইলের দায়িত্ব বণ্টন, তরুণ নেতৃত্বের আগমন, আধুনিক রাজনৈতিক ব্রিফিং—এসব তার কৌশলগত সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে সমাদৃত হয়।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পতনোন্মুখ রাজনৈতিক সংকটের সময় দেশজুড়ে ‘১/১১-এর ঘটনা’ বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে নতুন মোড় দেয়। তারেক রহমান তখন গ্রেপ্তার হন, নির্যাতনের শিকার হন। পরে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি পান এবং লন্ডনে রাজনৈতিক নির্বাসনের জীবন শুরু হয়। এ সময় রাজনৈতিকভাবে তারেক রহমানের অবস্থান পাল্টায়। তিনি তখন থেকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক প্রতীকী কিন্তু প্রভাব বিস্তারকারী চরিত্রে রূপ নিতে থাকেন। নির্বাসনে থেকেও ভিডিও কনফারেন্সে দলের ভেতরে-বাইরে বার্তা প্রদান, নেতাকর্মীদের মানসিক শক্তি জোগানো, সাংগঠনিক পুনর্গঠন পরিচালনা—এসব তাকে ‘দূরনিয়ন্ত্রিত নেতৃত্ব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১/১১-এর পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পথযাত্রা যে কঠিন পথে প্রবেশ করে—বলা যায় তারেক রহমান সেই পথচলার এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষক ও অংশগ্রহণকারী।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক তিনটি জাতীয় নির্বাচন ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪—দেশের গণতন্ত্র নিয়ে দেশের ভেতর ও বাইরের অগণিত বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিএনপি এ তিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া বর্জন বা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায়।
এ তিনটি নির্বাচনের সময় তারেক রহমানের ভূমিকা ছিল—দল পরিচালনায় কৌশলগত নেতৃত্ব প্রদান, আন্দোলন-সংগ্রামের দিকনির্দেশনা প্রদান, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করা, দলের ভেতরে সাংগঠনিক ঐক্য রক্ষা, সৃষ্টি এবং নতুন রাজনৈতিক বর্ণনার জন্ম দেওয়া।
লন্ডনে অবস্থান করেও তারেক রহমান দল পরিচালনায় যে ডিজিটাল রাজনৈতিক মডেল প্রয়োগ করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। অনলাইন বৈঠক, ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপদ এনক্রিপ্টেড নেটওয়ার্কে দলীয় সিদ্ধান্ত আদান-প্রদান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে রাজনৈতিক অ্যাকটিভিজম—এসব তার নেতৃত্বের একটি নতুন মাত্রা।
বলা চলে দূরপ্রবাসে থেকেও তিনি বিএনপির সাংগঠনিক বিষয়ে যেমন কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন, তেমনি দেশীয় রাজনীতিকে আন্তর্জাতিক সংযোগের মাধ্যমে নতুনভাবে শক্তিশালী করেছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু একুশ শতকের বাস্তবতায় জাতীয়তাবাদ শুধু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসনির্ভর নয়; এটি অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় বৈচিত্র্য, নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
তারেক রহমানের জাতীয়তাবাদী বয়ান তিনটি প্রধান স্তম্ভে দাঁড়িয়েছে—
১. সার্বভৌমত্ব রক্ষার রাজনীতি
২. অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা
৩. গণতান্ত্রিক অধিকারের সুরক্ষা
একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, বিরোধী রাজনীতির সংকোচন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একপাক্ষিকতা—বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ এক সংকটপূর্ণ সময়ে অবস্থান করছে। এ প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্ব বহুমাত্রিক গুরুত্ব বহন করে—গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে, একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারক হিসেবে, চারপাশের ভূরাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় কৌশলবিদ হিসেবে, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পুনর্নির্মাতা হিসেবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র যদি কখনো এক নতুন সমতা কিংবা সংলাপের পথে এগোয়, সেখানে তারেক রহমান নিঃসন্দেহে একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠবেন। গণতন্ত্রের পথ দীর্ঘ—নেতৃত্বের পথও তেমনি। গণতন্ত্র কোনো দিনের সম্পদ নয়; এটি প্রতিদিনের চর্চা, সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে তারেক রহমানের ভূমিকা তাই শুধুই একজন রাজনৈতিক নেতার নয়—বরং এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব, যারা গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন ও টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে বিশ্বাস করে। পরিশেষে বলতে চাই, ‘ইতিহাস কারও জন্য অপেক্ষা করে না; কিন্তু ইতিহাসের মোড় ঘোরে কিছু মানুষের কারণে। তারেক রহমান সেই মোড়ের একজন সম্ভাব্য নির্মাতা।’
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পথচলা তাই যতদিন অব্যাহত থাকবে, ততদিন তারেক রহমান আলোচনায় ও বিশ্লেষণে—এক অনিবার্য চরিত্র হিসেবেই থাকবেন।
লেখক: ড. মোহাম্মদ হাছানাত আলী , উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়