• ১৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২রা মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

মানবপাচার দমনে কঠোর হচ্ছে সরকার

Usbnews.
প্রকাশিত নভেম্বর ২০, ২০২৫
মানবপাচার দমনে কঠোর হচ্ছে সরকার
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের সংস্কার জরুরি মনে করে একটি নতুন ও আধুনিক আইনি কাঠামো গড়ার উদ্যোগ  মানবপাচার আধুনিক বিশ্বের অন্যতম জঘন্য অপরাধ, যার শিকার হয় নারী, শিশু ও পুরুষ সবাই। বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থান, সামাজিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসনের প্রবণতার কারণে মানবপাচারের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত।

তবে সামপ্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ মানবপাচার প্রতিরোধ, দমন ও ভুক্তভোগী সুরক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশের মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বহু বছর ধরেই একটি গভীর সামাজিক ও মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গৃহকর্মী, ইটভাটা, চা-বাগান, জেলে বা দিনমজুর থেকে শুরু করে বিদেশগামী শ্রমিক- সকল ক্ষেত্রেই পাচার ও শোষণের ধরন ক্রমে রূপ বদলাচ্ছে। যে অনিয়ম একসময় সীমিত পরিসরে ছিল, এখন তা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল মাধ্যম এবং সংগঠিত অপরাধচক্রের মাধ্যমে আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে।

বিদেশে কাজের স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণা, জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োগ, যৌন শোষণ কিংবা অবৈধ পথে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া- এসব অপরাধ দীর্ঘ সময় ধরে সমাজে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। এসব বাস্তবতায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের সংস্কার জরুরি মনে করে একটি নতুন ও আধুনিক আইনি কাঠামো গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার “মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫”-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে, যেখানে পাচারকারীদের পাশাপাশি অভিবাসী চোরাচালান সংঘঠিত করার প্রচেষ্টা বা ইচ্ছাকৃতভাবে তাতে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিকেও স্বাধীন অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ কেউ কেবল পাচারে অংশগ্রহণই নয়, বরং চোরাচালানের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা কিংবা সহায়তা করলেও তা কঠোর শাস্তিযোগ্য হবে।

খসড়া অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে অভিবাসী চোরাচালানে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ দশ বছর এবং ন্যূনতম তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ন্যূনতম এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডও আরোপ করা হবে। এর উদ্দেশ্য হলো পাচারচক্রের আর্থিক ও নেটওয়ার্কভিত্তিক কাঠামোকে দুর্বল করা এবং অপরাধ সংগঠনের আগেই তা প্রতিরোধ করা।

নতুন অধ্যাদেশে পাচারের বিভিন্ন ধরনকে আধুনিক পরিপ্রেক্ষিতে পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মানুষকে প্রলুব্ধ করা, ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, কম খরচে বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ভুক্তভোগী সংগ্রহ- এসবকেও অপরাধের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কারণ বর্তমান পাচারকারীরা মূলত ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব লাইভ বা বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে তাদের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাই নতুন আইন ডিজিটাল অপরাধকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দিচ্ছে, যার ফলে আইন প্রয়োগের পরিধিও বাড়বে।

মানবপাচার একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ হওয়ায় অপরাধীদের আর্থিক শক্তি ধ্বংস করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন অধ্যাদেশে তদন্ত কর্মকর্তাদেরকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় পাচার বা চোরাচালানকারীদের সন্দেহজনক সম্পদ, ব্যাংক হিসাব এবং আর্থিক লেনদেন তদন্ত ও বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এর ফলে পাচারচক্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হবে এবং অপরাধ ঘটানোর সক্ষমতা কমে যাবে। একই সঙ্গে পাচারের কারণে যদি কারও মৃত্যু, গুরুতর আঘাত বা মানবিক ক্ষতি হয়, তাহলে আরও কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, যা অপরাধ দমনে প্রতিরোধমূলক ভূমিকা রাখবে।

ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও সাক্ষ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যাদেশে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়ার সময়ই ভুক্তভোগী বা সাক্ষীর বিবৃতি ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করার সুযোগ থাকবে। যদি কোনো কারণে সেই ভুক্তভোগী পরবর্তীতে আদালতে উপস্থিত হতে না পারে, মারা যায় অথবা অপহরণ বা হুমকির কারণে সাক্ষ্য দিতে অক্ষম হয় তাহলে সেই পূর্বে রেকর্ডকৃত বিবৃতি আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এর ফলে মানব পাচারের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং ভুক্তভোগীরা নিরাপদ পরিবেশে সাক্ষ্য দিতে পারবেন। এখন পাচার ও অভিবাসী চোরাচালনের কৌশল পাল্টে যাওয়ায় আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পূর্বের আইনে যেসব জায়গা অস্পষ্ট ছিল বা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না- এসব সংশোধন করে অধ্যাদেশটিকে যুগোপযোগী করা হয়েছে। যে অপরাধগুলো আগে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেত, সেগুলোকে এবার কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। সরকার মনে করছে, বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে পাচারকারীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকতে হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও শক্তিশালী ও সক্ষম করা জরুরি।

খসড়া অধ্যাদেশটি বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। অনুমোদন পাওয়া মাত্র সরকার এটি অধ্যাদেশ আকারে জারি করতে পারবে। সংশোধিত এই আইনি কাঠামোর মাধ্যমে মানব পাচার দমন, অভিবাসী চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ, ভুক্তভোগী সুরক্ষা এবং অপরাধচক্র নির্মূলে সরকার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চায়।

সার্বিকভাবে বলা যায়, নতুন এ অধ্যাদেশ মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের কঠোর অবস্থানকে আরও দৃঢ় ও শক্তিশালী করবে। অপরাধের ধরন বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনের আধুনিকায়ন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল, এবং এই উদ্যোগ সেই চাহিদা পূরণ করছে। যদি এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ শুধু পাচার ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি করতে পারবে না- বরং ভুক্তভোগীদের জন্য আরও নিরাপদ এবং মানবিক পরিবেশও নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। শুধু পাচারকারী নয়, লুকিয়ে রাখা, আশ্রয় দেয়া বা সহায়তাকারীদেরও মূল অপরাধের অংশ হিসেবে ধরা হবে এমনই কঠোর ব্যাখ্যা এসেছে নতুন আইনে।

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ঋণের দায়ে নিজের শ্রম দিতে বাধ্য হয়, কিন্তু সেই শ্রমের মূল্য ঋণশোধ হিসেবে গণ্য না হয়, কিংবা সেবার সময়সীমা অনির্দিষ্ট হয়, তাহলে সেটিকে ঋণ-দাসত্ব হিসেবে গণ্য করা হবে। খসড়া আইনে জবরদস্তিমূলক শ্রম বলতে বোঝানো হয়েছে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, সম্পত্তি বা সুনামের ক্ষতির হুমকি দেখিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে শ্রম বা সেবা গ্রহণ করা।

সূত্র বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে গৃহকর্মীদের পাসপোর্ট কেড়ে রাখে নিয়োগকর্তারা, আর দেশে ফেরার ভয় দেখিয়ে অতিরিক্ত কাজ করায়। খসড়া আইনে ‘পতিতাবৃত্তি’কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে- অর্থ, সুবিধা বা যেকোনো প্রলোভনের বিনিময়ে কারও উপর যৌন শোষণ বা নিপীড়ন ঘটানোকে পতিতাবৃত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে। অন্যদিকে ‘পতিতালয়’ বলতে বোঝানো হয়েছে এমন কোনো বাড়ি, স্থাপনা বা কক্ষ, যেখানে বাণিজ্যিক যৌন শোষণ পরিচালিত হয় কিংবা এর জন্য ব্যবহূত হয়।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই সংজ্ঞাগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিন ধরে হোটেল, স্পা, বিউটি পার্লার বা বিনোদনকেন্দ্রের আড়ালে বাণিজ্যিক যৌন শোষণ চালানো হলেও স্পষ্ট সংজ্ঞার অভাবে আইন প্রয়োগে নানা বাধার সৃষ্টি হতো। নতুন খসড়ায় এসব অস্পষ্টতা দূর হয়েছে এখন কোনো ভবনে যৌন নিপীড়ন বা বাণিজ্যিক শোষণের প্রমাণ পাওয়া গেলে সেটি সরাসরি পতিতালয় হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে।

একই সঙ্গে সংশোধনী খসড়ায় ‘দূতাবাস’ শব্দটির সংজ্ঞাও বিস্তৃত করা হয়েছে। বিদেশে বাংলাদেশের যেকোনো মিশন দূতাবাস, হাইকমিশন, কনস্যুলেট, ভিসা অফিসসহ অন্যান্য প্রতিনিধিত্বকারী দপ্তর সবই এই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। এর ফলে বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের সুরক্ষা ও আইনি সহায়তার বিষয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হবে। বর্তমানে দেশের ৭টি ট্রাইব্যুনালে মানবপাচার মামলার জট পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে। বিচারকরা মনে করছেন, নতুন সংজ্ঞার প্রয়োগ হলে অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণ দ্রুত হবে।

 

  • আমার সংবাদ