
ঢাকা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক : ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. পিয়াস করিম হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সোমবার ভোর সাড়ে ৫টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে মারা যান তিনি।
পিয়াস করিমের ভাই জহির করিম সাংবাদিকদের জানান, শুক্রবার সকাল দশটার দিকে তার ভাইয়ের লাশ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘর থেকে বের করে ধানমন্ডির ৭ নম্বরের বাসায় নেয়া হবে। এরপর সেখানে মরহুমের কফিন দুই ঘণ্টা রাখা হবে। কেউ চাইলে পিয়াস করিমের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন।
এরপর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে নেয়া হবে পিয়াস করিমের কফিন। জুমার নামাজ শেষে সেখানে জানাযার নামাজ হবে। সবশেষে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। তবে পরিবারের অনিচ্ছার কারণে কফিন শহীদ মিনারে নেয়া হবে না বলে জানান জহির করিম।
শোক প্রকাশ করেছেন অনেকে
পিয়াস করিমের মৃত্যুতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এক শোক প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক মো. নুর খান, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক এ কে এম আজিজুল হক ও এ জেড এম জাহিদ, বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট ও জিয়া পরিষদ পৃথক বিবৃতিতে পিয়াস করিমের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন।
এদিকে পিয়াস করিমের মরদেহ বুধবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখার কথা বলেছেন তাঁর কয়েকজন সুহৃদ। অন্যদিকে গণজাগরণ মঞ্চের একাংশ (কামাল পাশার নেতৃত্বাধীন) পিয়াস করিমের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তারা বুধবার সকাল ১০ থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত শহীদ মিনারে অবস্থান নেবে।

সোমবার রাতে পিয়াস করিমের ধানমণ্ডির বাড়িতে যান খালেদা। তিনি প্রয়াতের স্ত্রী অধ্যাপক আমেনা মহসিন ও ছেলের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সান্ত্বনা দেন।
প্রয়াত অধ্যাপকের ভাই জহির করিমসহ তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
খালেদার সঙ্গে ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সেলিমা রহমান, শমসের মবিন চৌধুরী, আবদুল মান্নান, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, রুহুল কবির রিজভী, খায়রুল কবীর খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, শিরিন সুলতানা।
২০১৪ অক্টোবর ১৩
সোমবার ভোরে পিয়াস করিমের মৃত্যুর খবর পেয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির দফতরের দায়িত্বে থাকা যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, অধ্যাপক ড. পিয়াস করিম বাকস্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।

রিজভী বলেন, দেশ এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, এই মুহূর্তে তিনি আমাদের মাঝ থেকে চলে গেলেন। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে গণতন্ত্রের পক্ষে যে ক’জন সোচ্চার ছিলেন তার মধ্যে পিয়াস করিম অন্যতম ছিলেন।
এমন গুণীজনকে হারিয়ে দেশের ও সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন রিজভী।
নিজের ও দলের পক্ষ থেকে এসময় পিয়াস করিমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব। একইসঙ্গে পিয়াস করিমের আত্মার শান্তি কামনা করেন।
ড. পিয়াস করিম বুদ্ধিজীবী হিসেবে জনগণের প্রত্যাশিত বলিষ্ঠ ভূমিকাই পালন করেছেন। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, তা শাণিত যুক্তি ও প্রজ্ঞার সঙ্গে তুলে ধরতেন। এ কারণেই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি জনমানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলার প্রিয়মুখ হয়ে ওঠেন। চিন্তা ও চেতনার জগতে পিয়াস করিম ছিলেন আধুনিক প্রগতিশীল বন্ধুবৎসল সাদা মনের একজন মানুষ। অথচ দর্শনগত অবস্থানের কারণে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার বাবাসহ তাকে রাজাকার বলে প্রচারণা চালানো হয়।
পিয়াস করিমের মৃত্যু সংবাদের পরপরই চিহ্নিত কয়েকটি টিভি চ্যানেলে মৃত পিয়াস করিমের লাশ সামনে রেখেই আপত্তিকর মিথ্যা প্রচারনা শুরু করে।

অন্যদিকে পিয়াস করিমকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ আখ্যায়িত করে তাঁর মরদেহ শহীদ মিনারে আনার চেষ্টা প্রতিরোধ করার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগসহ সাতটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। এদিন সকাল নয়টা থেকে শহীদ মিনারে অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দেয় তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি মুহাম্মদ সামছুল ইসলাম ও ওয়ার্কার্স পার্টির ছাত্রসংগঠন ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু। এ সময় আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমও উপস্থিত ছিলেন।
শহীদ মিনারে অনুমতির সুযোগ নেই : ঢাবি কর্তৃপক্ষ
অন্যদিকে পিয়াস করিমের মরদেহ শহীদ মিনারে নেওয়ার অনুমতি চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর আবেদন করেন তাঁর স্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মহসিন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য শহীদ মিনারে তাঁর মৃতদেহ নেয়া হয়নি।
আর্শ্চযজনকভাবে বিতর্কিত সরকারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে , পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে রাখা যাবে না। রাস্তার দুই ধারে হাজার হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করে রাখা হয়েছে যাতে লাশ শহীদ মিনারে না নেয়া যায় । অথচ দেশের সাধারণ মানুষ শহীদ মিনারের বদলে জাতীয় মসজিদকেই বেছে নিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এদিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মরহুম পিয়াস করিমের কফিন রাখার অনুমতি দেয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং দু’টি সংগঠন আগে থেকেই শুক্রবার শহীদ মিনারে কর্মসূচী পালনের অনুমতি নেয়ায় কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ এম আমজাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, শ্লোগান একাত্তর এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড নামের দু’টি সংগঠন আগে থেকেই শহীদ মিনারে কর্মসূচী পালনের জন্য অনুমতি নিয়ে রেখেছে। সে কারণে আর কাউকে সেখানে শুক্রবার কোন কর্মসূচী বা অন্য কোন কর্মকান্ড পালনের অনুমতি দেয়ার সুযোগ নেই। এ ছাড়া পিয়াস করিমের লাশ সেখানে রাখার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদসহ বেশ কিছু সংগঠন। যে কারণে লাশ নিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সেখানে লাশ রাখার অনুমতি দেয়া সম্ভব হবে না বলে তিনি জানান।
কে ছিলেন অধ্যাপক মঞ্জুর করিম পিয়াস

অধ্যাপক মঞ্জুর করিম পিয়াস ( ১৯৫৮ – ১৩ অক্টোবর ২০১৪) যিনি পিয়াস করিম নামে বেশি পরিচিত ছিলেন একজন রাজনৈতিক অর্থনীতি, রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক তত্ত্বের বৈশিষ্টতার গবেষক এবং রাজনৈতিক ভাষ্যকার। স্বাধীনতার পর, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন। শিক্ষক হিসাবে তার দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নেব্রাস্কা-লিঙ্কন বিশ্ববিদ্যালয় , কালভার-স্টকটন কলেজ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। করিম জাতীয়তাবাদ ও সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কিত বিভিন্ন বই এবং জার্নাল রচনা করেছিলেন।
১৯৫৮ সালে বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলার রামপুর গ্রামের জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা এম এ করিম আওয়ামী লীগের কুমিল্লা ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা কমিটির সদস্য ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ জেলা ইউনিটের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।পিয়াস করিম কুমিল্লা আধুনিক স্কুল থেকে প্রাথমিক এবং কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ঢাকা আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে পিয়াস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে লিফলেট বিতরণের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে।
কর্মজীবন
পিয়াস মাস্টার্স এবং পিএইচডি সম্পন্ন করার পর, ১৭ বছর ধরে দুই আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি স্নাতক সদস্য হিসাবে নেব্রাস্কা-লিঙ্কন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। পরে, তিনি কয়েক বছর ধরে মিশরের কালভার-স্টকটন কলেজের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। ২০০৭ সালে তিনি বাংলাদেশে ফিরে এসে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পদে যোগ দেন। বাংলাদেশে, তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা সম্পর্কিত বিভিন্ন নিবন্ধ লিখেছেন