মালেক মন্ত্রিসভা পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তানে গঠিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে একটি অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা। সামরিক শাসনের বেসামরিক রূপ বিশিষ্ট এই মন্ত্রিসভা ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আব্দুল মোত্তালেব মালেকের নেতৃত্বে গঠিত হয়ে একই বছরের ১৬ ডিসেম্বরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের দুই দিন আগ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।
সেই সরকারের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ মুক্তিযুদ্ধকালীন ড. মালেক সরকারে অংশগ্রহণ। আব্বাস আলী খান এবং এ কে এম ইউসুফ (পিডিপি এবং পড়ে জামায়াতে যোগ দেন; চরমপত্র অনুযায়ী) এই সরকারে ছিলেন।
এই সরকারে আওয়ামী লীগের ১ জন জাতীয় পরিষদ সদস্য (ওবায়দুল্লাহ মজুমদার) ও ২ জন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (শামসুল হক ও আউং শু-প্রু চৌধুরী) ছিলেন।
মালেক মন্ত্রীসভার আউং শু-প্রু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার কেবিনেটেও মন্ত্রী ছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া উনাকে খাদ্যমন্ত্রী বানান। উনার ছেলে সাচিং প্রু জেরি এইবার বান্দরবান থেকে বিএনপির প্রার্থী। তিনি বর্তমানে, বান্দরবান জেলা বিএনপির আহবায়ক ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য।
এছাড়াও এই মন্ত্রীসভার আরেকজন এ এস এম সোলায়মান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মনোনয়নে বিএনপির সংসদ সদস্য হয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে ঢাকা-৩০ আসনের সংসদ সদস্য হন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। পরবর্তীতে ৩১ আগস্টে আব্দুল মোত্তালেব মালেককে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করা হয়। জানানো হয়েছিল যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন গভর্নর তার নেতৃত্বাধীন একটি নতুন প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার প্রস্তাবিত সদস্যদের তালিকা রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের নিকট পেশ করবেন। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের পদ থেকে অব্যাহতির দেওয়ার পর ৩ সেপ্টেম্বরে শপথগ্রহণের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত আব্দুল মোত্তালেব মালেকের দায়িত্বকাল শুরু হয়। এবং ক্ষমতা গভর্নর ও সামরিক প্রশাসক আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর মাঝে ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।
নিয়োগ পাওয়ার পর মালেক প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠন করার ঘোষণা দেন যেখানে গভর্নর সহ মোট সদস্য ১১ জন ছিল ১৭ সেপ্টেম্বরে একজন সদস্যের অনুপস্থিতিতে ৯ জন মন্ত্রীকে শপথগ্রহণ করানো হয়। এদের মধ্যে ৫ জন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের প্রাক্তন সদস্য ছিলেন। এদের মধ্যে একজন বাদে সবাই রাজনীতিবিদ ছিলেন যাদের মধ্যে –
২ জন পাকিস্তান আওয়ামী লীগ,
২ জন কাউন্সিল মুসলিম লীগ,
১ জন জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান,
১ জন কনভেনশন মুসলিম লীগ,
১ জন কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং
১ জন নেজামে ইসলাম পার্টির সদস্য ছিলেন।
পরবর্তীতে ৭ অক্টোবরে আরও ৩ জন মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছিলেন যাদের মধ্যে ৩ জন পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি ও ১ জন কাইয়ুম মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন। ১১ অক্টোবরে মন্ত্রীদের দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করা হয়।
আওয়ামী লীগ, দাপ্তরিক নাম নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এবং ১৯৫৫ সালের আগে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারিতে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী প্রতিষ্ঠিত একটি পাকিস্তানি রাজনৈতিক দল ছিলো।নৌকা দলীয় নির্বাচনী প্রতীক। পরবর্তীতে নিখিল পাকিস্তান বাদ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে দলটির নামকরণ হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ। এর পর সর্বশেষে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু আওয়ামী লীগ নামকরণ হয় ।
উল্লেখ্য পরবর্তীতে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে বাংলাদেশ স্বাধীনের পর একজন সদস্য জামায়াতে যোগদান করেন। কিন্তু মালেক মন্ত্রিসভা পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ জামায়াতের মাত্র একজন ছিলেন।দল বদলের ফলে জামায়াতের যদি ২ জনসংখ্যা বিবেচনা করা হয় , তাহলে পরবর্তীতে দলবদল করে বহু জন বহু দল যোগ দিয়েছিলেন। সেই হিসেবে সকল রাজনৌতিক দলে সখ্যতা বাড়বে।
১৯৭১ সালের পর যদি দল বদলের ফলে যদি নির্ধারণ করা হয় তাহলে দেখা যায় –
২ জন আওয়ামী লীগ,
২ জন জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি
২ জন জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান,
হোসেন, এম আই (২০১৪) [২০১৩]। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ: বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ। ইস্টার্ন পাবলিকেশন্স। পৃ. ৯১–৯২
হোসেন, এম আই (২০১৪) [২০১৩]। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ: বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ। ইস্টার্ন পাবলিকেশন্স। পৃ. ৯১–৯২।
হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট (বাংলাদেশ অংশ)। হুমায়ুন হাসান কর্তৃক অনূদিত। বাঁধন পাবলিকেশন্স। ২০১১। পৃ. ২০, ৫৩, ৬৯, ৭০।
“ডাঃ মালিক পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত শুক্রবার শপথ গ্রহণঃ শীঘ্রই মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের নামের তালিকা পেশ”। দৈনিক ইত্তেফাক। ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। পৃ. ১।
মোমেন, এম এ (৬ মার্চ ২০২১)। “পাকিস্তানের বিখণ্ডীকরণ ঠেকাতে…”। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। সংগ্রহের তারিখ ৫ মার্চ ২০২৫।
হাসান হাফিজুর রহমান, সম্পাদক (২০০৯) [১৯৮২]। “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র”। খণ্ড ষষ্ঠ খণ্ড। হাক্কানী পাবলিশার্স। পৃ. ১৮৯।
ইশতিয়াক, আহমাদ (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১)। “১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭১: ১০ সদস্যের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা ঘোষণা”। দ্য ডেইলি স্টার।
হাসান হাফিজুর রহমান, সম্পাদক (২০০৯) [১৯৮২]। “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র”। খণ্ড সপ্তম খণ্ড। হাক্কানী পাবলিশার্স। পৃ. ৫৪০।
“Three more ministers sworn in”। দ্য পাকিস্তান অবজার্ভার (ইংরেজি ভাষায়)। ৮ অক্টোবর ১৯৭১। পৃ. ১।
“মন্ত্রীদের দফতরের চূড়ান্ত তালিকা”। দৈনিক ইত্তেফাক। ১২ অক্টোবর ১৯৭১। পৃ. ৬।
“অক্টোবর ১৯৭১: স্বাধীন রাষ্ট্র স্বীকৃতির দাবি, চাপে পাকিস্তান”। ডয়চে ভেলে। ২৭ অক্টোবর ২০২৩।
হক, মুহাম্মদ লুৎফুল (১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১)। “১৪ ডিসেম্বরের আরেক অধ্যায়”