আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তপশিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দীন। বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি গণমাধ্যমে তপশিলের ঘোষণা প্রচারিত হয়।
বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৬টায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এই তপশিল ঘোষণা করেন তিনি।
সিইসি তার ভাষণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের চূড়ান্ত ভোট গ্রহণের তারিখ ঘোষণা করেছেন। তার ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওইদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলবে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়পত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ২৯ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের ১১ জানুয়ারি এবং আপিল নিষ্পত্তি হবে ১২-১৮ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি। প্রতীক বরাদ্দ করা হবে ২১ জানুয়ারি।
তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির প্রতিক্রিয়া
জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে তপশিল ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। সন্তুষ্ট জানিয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তপশিল ঘোষণায় বিএনপি সন্তুষ্ট। নির্বাচন সুষ্ঠু করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।
ইসির উদ্দেশে তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা বিএনপিকে আশ্বস্ত করেছে। নির্বাচন কমিশন, সরকার ও রাজনৈতিক দল প্রমাণ করেছে তারা সত্যিকার অর্থে নির্বাচন চায়। নির্বাচন কমিশন গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে সক্ষম হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
জোটের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যারা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, তাদের নিয়েই নির্বাচন করব। তিনি বলেন, জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে চায় দল। নির্বাচন হবে না- এমন কোনো আশঙ্কা নেই আমার। নির্বাচন হবে কি হবে না, সেটাতেও ভুগছি না। নির্বাচন হতেই হবে এবং সেটা ঘোষণা হয়েছে। আশা করি নির্বাচন হবে।
তপশিল ঘোষণায় জাতির প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে : জামায়াত
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার এবং মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ঘোষিত তপশিলকে স্বাগত জানিয়েছেন।
ঘোষিত তপশিলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একইদিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তাকে নির্বাচন-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, সংশয় ও সন্দেহের অবসান বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তপশিল ঘোষণার মাধ্যমে জাতির প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তফসিল ঘোষণার পর জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলের পক্ষে এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেন তিনি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন যাতে সর্বজনগ্রাহ্য হয়, সেজন্য সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করতে হবে এবং কোনো ধরনের দুর্বলতা প্রদর্শন করা যাবে না। একটি প্রত্যাশিত নির্বাচনের জন্য সবার আগে প্রয়োজন সমতল মাঠ নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন জরুরি- যেখানে নির্বাচন কমিশনকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অতীতের ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের মতো হতাশাজনক নির্বাচন জাতি আর দেখতে চায় না। তাই নির্বাচন কমিশনকে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী যথার্থ ভূমিকা রাখতে হবে। আগামী নির্বাচন যেন উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে পারে, সে লক্ষ্যে জামায়াত নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে ইনশাআল্লাহ। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে জাতির ৫ আগস্টের বিপ্লবের প্রত্যাশা পূরণ হওয়া প্রয়োজন-এ জন্য সবাইকে চেষ্টা চালাতে হবে।
জামায়াতের এ নেতা বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন কি ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে তা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করছে। জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি প্রদানের লক্ষ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়ে ‘হ্যাঁ’-কে বিজয়ী করার আহ্বান জানান তিনি।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জামায়াতসহ আন্দোলনরত ৮ দল জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা করবে।
ঘোষিত তপশিলকে প্রাথমিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিলকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় স্বাগত জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান।
বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজনের যে তপশিল ঘোষিত হয়েছে তাকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে স্বাগত জানায়। নির্বাচন কমিশন একটি সুষ্ঠু, অবাধ, ক্রেডিবল ও উৎসবমুখর নির্বাচন জাতিকে উপহার দেবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অংশীদার আটটি দলের দাবিকে উপেক্ষা করে একইদিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের যে চ্যালেঞ্জ তারা নিয়েছেন সেই চ্যালেঞ্জে তারা সফল হন; সে প্রত্যাশা আমরা করি। সেজন্য আমরা সহায়তাও করব ইনশাআল্লাহ।
গাজী আতাউর রহমান বলেন, আমরা শেষ পর্যন্ত আশা করেছিলাম যে, সরকার ও নির্বাচন কমিশন আন্দোলনরত আট দলের দাবি মেনে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন আয়োজন করবে এবং জাতীয় ভোটের আগে গণভোট আয়োজন করবে। আমাদের সেই দাবি উপেক্ষিত হলো। তবুও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমরা একে স্বাগত জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, মাঠ প্রশাসন এখন নির্বাচন কমিশনের অধীনে। মাঠ প্রশাসনের বিন্যাসে এবং কার্যক্রমে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। কোনো দলের প্রতি কোনো ধরনের আনুকূল্য দেখানোর সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আট দলের সঙ্গে আন্দোলনরত আছে। আমরা আমাদের দলীয় পরিসরে এবং আট দলের ভেতরে আলোচনা করে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানাব। তবে প্রাথমিকভাবে আমরা এই তপশিলকে স্বাগত জানাচ্ছি।
তপশিলকে স্বাগত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ঘোষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিলকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।
বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) এক বিবৃতিতে সংগঠনের আমীর মাওলানা মামুনুল হক ও মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, আমরা আশা করি, তপশিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অর্থবহ নির্বাচনের পথ সুগম হবে।
তারা বলেন, নির্বাচন যেন প্রকৃত অর্থে জনগণের ভোটাধিকার ও মতামত প্রতিফলিত করতে পারে— তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সে লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাই। লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত না হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয় না। তাই সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ, অবাধ প্রচারণার স্বাধীনতা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার অনুরোধ জানাই।
নেতারা আরও বলেন, নির্বাচনে কালো টাকার প্রভাব, পেশিশক্তির প্রদর্শন, প্রশাসনিক প্রভাব ও জবরদস্তিমূলক তৎপরতা বন্ধ করতে হবে। ভোটার, নির্বাচনী এজেন্ট এবং প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। জনগণ যেন ভয়-ভীতি ছাড়াই স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন— এটিই আমাদের প্রত্যাশা।
প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)
জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে তপশিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তপশিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রধান সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
এনসিপির এই নেতা বলেন, ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের উদ্দ্যেশ্য ছিল ভোটাধিকার প্রয়োগ করা। সরকারের ৩টি দায়িত্ব ছিল। বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। সেটা বাস্তবায়ন হওয়ার পথে। তপশিল ঘোষণাকে আমরা সাধুবাদ জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, নির্বাচন আয়োজনে ইসির সদিচ্ছা আছে। তবে নিরপেক্ষতার অভাব আছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পেশিশক্তি ও টাকার প্রভাব আশংকা করছি। জনগণকে আহ্বান জানাই, তারা যেনো ভোটকেন্দ্র পাহারা দেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদিচ্ছার অভাব আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় নাসির উদ্দিন আরও বলেন, সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী নির্বাচনী আসনে টাকা খরচের সীমা আমরা মেনে চলব।