খালেদা খানম। ডাকনাম পুতুল। জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট। খালেদা খানম ১৯৬০ সালে তৎকালীন তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ের পর হলেন খালেদা জিয়া। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনিশ্চয়তায় ঘেরা পরিবেশে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান জিয়াউর রহমান পর্যায়ক্রমে হলেন রাষ্ট্রপতি। তখন থেকে রাষ্ট্রীয় সফর, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকেন খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ড তাঁর জীবনের মোড় একেবারেই ঘুরিয়ে দেয়। জিয়ার হাতে গড়া বিএনপি তখন আকস্মিকভাবে নেতৃত্বের সংকটে পড়ে দিশাহীন। এই অবস্থায় ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি দলের নেতা-কর্মীদের ঐকান্তিক আহ্বানে বিএনপিতে যোগ দেন খালেদা জিয়া। সময়ের প্রয়োজনে এভাবে তিনি প্রায় হঠাৎ করে চলে আসেন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্টে ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশের জলপাইগুড়িতে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন।তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। পরবর্তীতে তারা চলে আসেন দিনাজপুরের মুদিপাড়ায়। আদি পৈতৃকনিবাস বাংলাদেশের ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে।
খালেদা জিয়ার স্বামী বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান বীরউত্তম। ১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে জিয়াউর রহমানের সাথে তার বিয়ে হয়। জিয়া তখন ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। ডি এফ আই এর কর্মকর্তা রূপে তখন দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন।

১৯৭৭ সালে তার স্বামী রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি হিসেবে জাতীয়ভাবে পরিচিত হন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান হত্যার শিকার হলে খালেদা রাজনীতিতে যোগ দেন এবং বিএনপির নেতৃত্বে আসেন। ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর, তিনি গণতন্ত্রের জন্য চলমান আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে সাহায্য করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৯৬-এর স্বল্পস্থায়ী বিতর্কিত সরকারেও তিনি দায়িত্বপালন করেন, যেখানে অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনটি বর্জন করেছিল। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক দলগুলোর যুগপৎ আন্দোলনে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। ২০০১ সালে তার দল পুনরায় ক্ষমতায় আসে এবং তিনি ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা কর্মীদের আহ্বানে তিনি ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। বেগম জিয়া এর বিরোধিতা করেন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপার্সন নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।


১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন।১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। যা পরবর্তীতে ৯৬ এর একদলীয় নির্বাচন হিসেবে গণ্য হয়। এই সংসদ মাত্র ১৫ দিন স্থায়ী হয়। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস হয় এবং খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন।
প্রধানমন্ত্রিত্বের ৩য় মেয়াদকাল ছিল অষ্টম জাতীয় সংসদ। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় ঐক্যজোট বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। খালেদা জিয়া এই সংসদেও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যু হয় ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ (বয়স ৮০) এভারকেয়ার হাসপাতাল ঢাকা, বাংলাদেশ।

১৯৮৩ সালের বেগম জিয়ার নেতৃত্বে সাত দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। বেগম জিয়া প্রথমে বিএনপিকে নিয়ে ১৯৮৩ এর সেপ্টেম্বর থেকে ৭ দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সূচনা করেন। একই সময় তার নেতৃত্বে সাত দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন পনেরো দলের সাথে যৌথভাবে আন্দোলনের কর্মসূচির সূত্রপাত করে। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফা আন্দোলন চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বাধার সৃষ্টি হয়। ১৫ দল ভেঙে ৮ দল ও ৫ দল হয়। ৮ দল নির্বাচনে যায়। এরপর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল, পাঁচ দলীয় ঐক্যজোট আন্দোলন চালায় এবং নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে।















১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া “এরশাদ হটাও” শীর্ষক এক দফার আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। এর ফলে এরশাদ সংসদ ভেঙে দেন। তারপর পুনরায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের উপক্রম হয়। অবশেষে দীর্ঘ আট বছর অবিরাম, নিরলস ও আপোসহীন সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়া মোট পাঁচটি আসনে অংশ নিয়ে পাঁচটিতেই জয়লাভ করেন।
উইকিপিডিয়া তথ্য অনুযায়ী , মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভকালে খালেদা জিয়া কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকার পর ১৬ মে নৌপথে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে আসেন। তিনি সন্ধ্যার দিকে লঞ্চে করে নারায়ণগঞ্জ এসে পৌঁছান। তার সঙ্গে সেই সময় তার দুই সন্তান—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো এবং কর্নেল মাহফুজের স্ত্রী ছিল। সেখান থেকে তার বড় বোন খুরশীদ জাহান এবং বোনের স্বামী মোজাম্মেল হক তাদের একটি জিপে করে ঢাকার খিলগাঁওয়ে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যান। খালেদা জিয়ার আসার এই খবরটি গোয়েন্দা মাধ্যমে ১০ দিনের মাথায় ছড়িয়ে পড়ে। ২৬ মে তাঁর ভগ্নিপতি মোজাম্মেল হক জানতে পারেন যে পাকিস্তানি সেনারা খালেদা জিয়ার অবস্থান সম্পর্কে জেনে গেছে। এর পর থেকেই খালেদা জিয়ার আত্মগোপন শুরু হয়। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে ঘুরতে হয় তাকে। অনেকেই নিপীড়নের ভয়ে তাকে আশ্রয় দিতে নারাজি হয়। ২৮ মে মোজাম্মেল হক খালেদা জিয়া ও তাঁর দুই ছেলে পিনু ও কোকোকে অন্য একটি জায়গায় সরিয়ে নেন, পরবর্তীতে ৩ জুন আবার অন্য জায়গায় সরিয়ে নেন। এরপর এক অজানা ঠিকানায় খালেদা জিয়া ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এস কে আবদুল্লাহর সিদ্ধেশ্বরীর বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। সেখানেই তিনি ২ জুলাই পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত থাকেন।
১৯৭১ সালের ২১ আগস্ট জিয়াউর রহমান তার স্ত্রী খালেদা জিয়াকে একটি চিঠি লিখেন। সে সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল জামশেদ পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের জিএইচকিউ ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া তার অধীনেই আটক ছিলেন। জিয়াউর রহমান যখন পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাব রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন, তখন জামশেদ ছিলেন তার কমান্ডার। জিয়ার লেখা চিঠিটি ‘অধিকৃত’ এলাকা থেকে শাফায়াত জামিল পোস্ট করেন এবং সেটি মেজর জেনারেল জামশেদের কাছে পৌঁছেছিল।
গ্রেপ্তারের পর খালেদা জিয়া ও তার দুই সন্তানকে পুরোনো সংসদ ভবনের একটি কক্ষে রাখা হয়। এরপর সেখান থেকে তাদের ঢাকা সেনানিবাসের একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত তিনি সেখানে আটক ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর সকালে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।