ইউজিসি দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ। এ ধরনের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ফেরদৌস জামান যোগদান করার পর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত হন। এমনকি একাধিকবার উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী যথাযথ শাস্তিমূলকব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)-এর বরখাস্ত সচিব ফেরদৌস জামান তুহিনকে এবার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত রোববার ইউজিসির পূর্ণ কমিশনের এক সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সভায় অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে, সভায় একাধিক কর্মকর্তা এই মর্মে মত দিয়েছেন যে, বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠালে বরিশালের বাকেরগঞ্জের কুলাঙ্গার ফেরদৌস জামানকে গুরুপাপে লঘু দণ্ড দেওয়া হবে। যেহেতু তার নিয়োগ প্রক্রিয়াটাই ভুয়া। জাল অভিজ্ঞতার সনদে তিনি ইউজিসিতে চাকরি পেয়েছেন। নিজের সরকারি কলেজের স্ত্রীকে দিয়ে ফেরদৌস তার ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ সত্যায়িত করে ইউজিসিতে চাকরির আবেদন করে চাকরি বাগিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতাদের তদবিরে।
এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে গত প্রায় ১৫ বছর ধরে তার বিরুদ্ধে লুটপাট ও নৈতিক স্খলনের নানা অভিযোগ প্রমাণিত হয় তদন্তে। ফেরদৌস পদোন্নতি বাগিয়েছেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদে। ইউজিসিতে চাকরির সুবাদে যোগ্যতা না থাকলেও নিজের স্ত্রীকে সরকারি কলেজ থেকে পদত্যাগ করিয়ে অধ্যাপক পদে চাকরি দিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। আরো অনেক অযোগ্য আত্মীয়কে চাকরি দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। গুরুতর অনেকগুলো অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিলো ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং’ কমিটি। কিন্তু গত কয়েকমাস ধরে তিনি তদবির করে গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হন।
প্রায় ১১ মাস আগে করা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউজিসি দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ। এ ধরনের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ফেরদৌস জামান যোগদান করার পর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত হন। এমনকি একাধিকবার উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী যথাযথ শাস্তিমূলকব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বারবার তাকে পদোন্নতি দিয়ে, চাকরি স্থায়ীকরণ করে, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে, প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়; যা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক এবং একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক বিচ্যুতি, যা চাকুরি শৃঙ্খলার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাই এই বিষয়ে পূর্ণ কমিশনের সভায় উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা ও ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করা আবশ্যক।
অভিযোগে বলা হয়, ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ দিয়ে ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে কমিশনের সহকারী সচিব পদে যোগদান করা ফেরদৌস জামান সচিবসহ ইউজিসির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। সর্বশেষ সচিব পদে ছিলেন কয়েকবছর। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর জনরোষের মুখে তাকে অন্যপদে বদলি করা হয়। অন্তবর্তীকালীন সরকারের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির তদন্তে তার বিরুদ্ধে প্রায় সব অভিযোগ প্রমাণিত। চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌসকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্তকালে তিনি কমিশনের রিসার্চ গ্রান্টস অ্যান্ড এওয়ার্ড বিভাগের পরিচালক পদে ছিলেন।
ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলায় ফেরদৌস জামান আইনের চোখে পলাতক হলেও তিনি প্রকাশ্যে অবস্থান করছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারির বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হলে; অভিযুক্তকে সাময়িক বরখাস্তসহ প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিধান রয়েছে। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে ইউজিসি এখনো কারো বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তাছাড়া মামলাটির ঘটনার সাথে কোনো কোনো অভিযুক্ত কর্মকর্তার সত্যিকার অর্থেই সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এ বিষয়ে প্রশাসনিকভাবেও কোনো তদন্ত করা হয়নি।
প্রসঙ্গত, ফেরদৌস জামান-এর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসি একটি ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং’ কমিটি গঠন করে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৭ অক্টোবর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ আহবায়ক, জেলা ও দায়রা জজ (উপ-সচিব, লিগ্যাল) নূরনাহার বেগম শিউলী সদস্য-সচিব এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদ উদ্দিন কমিটির সদস্য ছিলেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ইউজিসি কর্মকতাদের আনীত অভিযোগ এবং এ যাবতকালে সাধিত বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের কাজ করে এই ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং’ কমিটি। কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালনে সহায়তা করেন কমিশনের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা।
ফেরদৌস জামানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে কাগজপত্র, নথি ও প্রমাণ সংগ্রহ করে, বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালা আলোকে তা পর্যালোচনা করে; অভিযোগগুলোর বাপারে সুপারিশ ও পর্যবেক্ষণসহ প্রতিবেদন প্রণয়ন করে এই কমিটি। গত ২০ জানুয়ারি দাখিল করা কমিটির ২৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের কপি দৈনিক আমাদের বার্তার রয়েছে।
প্রথম অভিযোগ হলো, গত জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালে নিয়মবহির্ভূতভাবে দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা এবং শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশনা দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন ইউজিসির তৎকালীন সচিব ফেরদৌস জামান ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আলমগীর।