কয়েক মাসের নিখুঁত নজরদারি, গোপন প্রস্তুতি আর আকাশ–স্থল–নৌপথে একযোগে চালানো অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্র। ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’ নামের এই অভিযানের নেপথ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর কয়েক মাস ধরে কড়া নজর রাখছিল যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ৬৩ বছর বয়সী মাদুরো কী খাচ্ছেন, কী পরছেন কিংবা কোথায় ঘুমাচ্ছেন– সবকিছুই নজরদারিতে ছিল। এমনকি তাঁর পোষা প্রাণীগুলোর ওপরও নজর রাখা হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন শীর্ষ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানায়, ভেনেজুয়েলা সরকারের ভেতরের একটি সূত্রসহ ছোট একটি দল এই নজরদারির কাজে যুক্ত ছিল।
মাদুরোকে আটক করা হয়েছে দুই দেশের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে। এর আগে ওয়াশিংটন ক্যারিবিয়ান সাগরে মাদক পরিবহনের অভিযোগে কয়েকটি নৌযানে হামলা চালিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে মাদক চোরাচালানে জড়িত এবং তিনি অবৈধভাবে ক্ষমতায় আছেন। অন্যদিকে মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের দেওয়া তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি ছোট দল গত আগস্ট মাস থেকেই সেখানে অবস্থান করছিল। তারা মাদুরোর জীবনযাত্রার ধরন সম্পর্কে এমন গভীর ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছিল, যা তাঁকে ধরার কাজটি সহজ করে দেয়।
দুটি সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, সিআইএর একজন ‘অ্যাসেট’ বা তথ্যদাতা ছিলেন, যিনি মাদুরোর খুবই ঘনিষ্ঠ। ওই ব্যক্তি মাদুরোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতেন। অভিযান চলাকালে তাঁর একবারে সঠিক অবস্থানের তথ্য দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।
গেল ডিসেম্বরের শুরুতে এই অভিযানের চূড়ান্ত পরিকল্পনা সম্পন্ন হয়। অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও নিখুঁত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মাদুরো কারাকাসে যে সেফ হাউসে থাকতেন, যুক্তরাষ্ট্রে তার আদলে একটি বাড়ি তৈরি করে মহড়া চালান মার্কিন এলিট ফোর্সের সদস্যরা।
লাতিন আমেরিকায় স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের এমন সরাসরি সামরিক অভিযান খুব কমই দেখা গেছে। পুরো বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গোপন। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসকেও আগাম কিছু জানানো হয়নি। সব প্রস্তুতি শেষে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা কেবল উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন।
চার দিন আগেও একবার অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনুমোদন দিয়েছিলেন। তবে খারাপ আবহাওয়ার কারণে পরিকল্পনাটি স্থগিত করা হয়। গতকাল শনিবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, বড়দিন ও নতুন বছরের ছুটির সময়েও সেনারা প্রস্তুত ছিলেন, সঠিক পরিস্থিতি ও প্রেসিডেন্টের নির্দেশের অপেক্ষায়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২ জানুয়ারি স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে চূড়ান্ত নির্দেশ দেন। নির্দেশ দেওয়ার সময় তিনি বলেন, ‘গুড লাক অ্যান্ড গডস্পিড।’ কারাকাসে তখন মধ্যরাত ঘনিয়ে আসছিল। রাতের আঁধারেই অভিযান চালানো হয়। পরবর্তী দুই ঘণ্টা ২০ মিনিটে আকাশ, স্থল ও নৌপথে একযোগে চালানো হয় নজিরবিহীন অভিযান।
হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে নয়, ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে বসে বড় পর্দায় সরাসরি সম্প্রচার দেখে অভিযানের তদারকি করেন ট্রাম্প। তাঁর পাশে ছিলেন সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
অভিযানের শুরু হয় আকাশপথে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানে রাতভর ১৫০টির বেশি বিমান অংশ নেয়। রাত দুইটার দিকে কারাকাসে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আকাশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শহরের আকাশে নিচু দিয়ে উড়ছে অসংখ্য হেলিকপ্টার।
বিবিসি ভেরিফাই কারাকাসের অন্তত পাঁচটি স্থানে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে লা কার্লোটা বিমানঘাঁটি ও লা গুয়াইরা বন্দর রয়েছে। অভিযানের আগে কারাকাসের বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
বিমান হামলার মধ্যেই স্থলপথে ঢুকে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের এলিট ‘ডেল্টা ফোর্স’। রাত ২টা ১ মিনিটে তারা মাদুরোর সেফ হাউসে পৌঁছায়। সেখানে পৌঁছানোর পরই শুরু হয় গোলাগুলি। ইস্পাতের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন সেনারা। অভিযানে মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও আটক করা হয়। পরে হেলিকপ্টারে করে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে ভেনেজুয়েলা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের হেফাজতে আছেন। নিউইয়র্কে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার প্রস্তুতি চলছে।
এই অভিযানের ব্যাপকতা ও নিখুঁত পরিকল্পনা বিশ্বজুড়ে বিস্ময় সৃষ্টি করে। তবে এ ঘটনায় আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।