• ১৯শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২রা জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

হাসিনার পতন : ঢাকায় সেদিন কী ঘটেছিল

Usbnews.
প্রকাশিত জানুয়ারি ৭, ২০২৬
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

ছাত্র-জনতার রক্ত আর হাজারো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের স্বৈরাচারী-ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয় ২০২৪ এর ৫ আগস্ট। ওইদিন প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার পতন ও ছাত্র-জনতার বিজয়ের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের ৬ মাস পূর্ণ হলো আজ। ঐতিহাসিক এ পট পরিবর্তনের দগদগে স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশের মানুষকে।

শেখ হাসিনার পতনের আনন্দে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে লাখ লাখ মানুষ আনন্দ প্রকাশে রাজপথে নেমে আসে ৫ আগস্ট।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি এবং আওয়ামী লীগের দলীয় সন্ত্রাসীদের হামলা ও গুলিতে শহিদ হয়েছেন আবু সাঈদ মুগ্ধ ওয়াসিমসহ বহু শিক্ষার্থী এবং নানা পেশার ১ হাজারেরও বেশি মানুষ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবে চোখের আলো নিভে গেছে ৪০০ জনের। মারাত্মক জখম ও আহত হয়েছেন ২৩ সহস্রাধিক মানুষ। পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে অনেককে। এখনো শরীরে বুলেটের ক্ষত নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন হাজারো মানুষ।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গত জুলাইয়ের গোড়ায় শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মধ্য জুলাইতে এসে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের হামলায় রূপ নেয় গণবিস্ফোরণে। হাসিনা সরকারের অত্যাচার-নিপীড়নের সঙ্গে যোগ হয় স্বৈরাচারের আজ্ঞাবহ কিছু অতি উৎসাহী পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তার মানবাধিকার বিরোধী নৃশংসতা। এই নির্বিচার গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ নিশ্চিত করে শেখ হাসিনা সরকারের পতন।

আওয়ামী লীগ সরকারের দমনপীড়নের সামনে রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ুয়া শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তরুণ, যুবা, গৃহিণী, অভিভাবক সবাই স্বৈরাচরের রাহুমুক্ত হতে একজোট হয়েছিলেন রাজপথে। দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে উঠে আসে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের এক দফা। এ গণদাবি সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেয়। সরকারের পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসীদের গুলি, হত্যার বীভৎসতায় ছাত্র-জনতার আন্দোলন রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে।

প্রবল জনরোষের মুখে ৫ আগস্ট পদত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে তিনি ওই দিন দুপুরে সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে দেশ ছেড়ে ভারতের নয়াদিল্লিতে গিয়ে আশ্রয় নেন।

এরপর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার।

নতুন সরকার রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে সংস্কারের উদ্যোগসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সফলভাবে এগিয়ে নিচ্ছেন।

বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে যুগোপযোগী করতে চলছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। দেশের সর্বোচ্চ আদালত, নির্বাচন কমিশন নতুন নিয়োগের মধ্য দিয়ে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়েছে। ইতোমধ্যে বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনকে যুগোপযোগী করাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলন নির্মূলে পরিচালিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

কোটা সংস্কার থেকে পরবর্তীতে সরকার পতনে ছাত্র-জনতার একদফা আন্দোলন তা নির্মূলে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হামলায় একের পর এক প্রাণহানির কারণে গণ-বিস্ফোরণে রূপ নেয়। অভিনব সব কর্মসূচি দিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সরকার নামানোর আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার থেকে ঘোষণা করা হয় সরকার পতনের এক দফা দাবি। শুরু হয় ছাত্র-জনতার সর্বাত্মক অসহযোগ।

ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে গিয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যার দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টা, আওয়ামী লীগের অনেক এমপির বিরুদ্ধে নিহতদের পরিবার হত্যা মামলা দায়ের করছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে প্রায় দুই শতাধিক হত্যা মামলা হয়েছে। শেখ হাসিনার পরিবারের অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। এর মধ্যেই স্বৈরাচারী সরকারের মন্ত্রী, এমপিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গ্রেফতার হয়েছেন। রিমান্ডে বেরিয়ে আসছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্ষমতাধর এসব ব্যক্তিদের দমন, পীড়ন, লুটপাট, দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য।

এদিকে বিচারের কাঠগড়া থেকে বাঁচতে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগেই আওয়ামী লীগের অনেক মন্ত্রী, এমপি বিদেশে পালিয়ে গেছেন। দেশে থাকা মন্ত্রী, এমপিরাও রয়েছেন আত্মগোপনে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে গ্রেফতার হচ্ছেন তারা। এরই মধ্যে শেখ হাসিনার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এখন আর শেখ হাসিনার কোনো পাসপোর্ট নেই।