• ১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৭শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

অ্যাঞ্জেল চাকমা এবং বাংলাদেশ

Usbnews.
প্রকাশিত জানুয়ারি ৯, ২০২৬
অ্যাঞ্জেল চাকমা এবং বাংলাদেশ
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমান (অব.)

ভারতের ত্রিপুরার বাসিন্দা অ্যাঞ্জেল চাকমা উত্তরাখণ্ড রাজ্যের দেরাদুনে এমবিএ পড়াশোনা করছিলেন। গত ০৯ ডিসেম্বর রাতে অ্যাঞ্জেল চাকমা ও তার ভাই বাজারে গেলে একদল বর্ণবাদী সংখ্যাগুরু গোষ্ঠীর যুবক তাদের উত্ত্যক্ত করতে থাকে। ‘চিনিক’ মোমো, ‘চাইনিজ’ ইত্যাদি সম্বোধনে অ্যাঞ্জেল প্রতিবাদ করে (ভারতে সংখ্যাগুরু বর্ণবাদীরা উত্তর-পূর্বের জনগোষ্ঠী এসব নামে উত্ত্যক্ত করে থাকে) এবং তাদের বারবার বলার চেষ্টা করে, সে চাইনিজ না, ভারতীয়। আর এই সামান্য প্রতিবাদের জন্য তাকে ছুরিকাঘাতসহ বেধড়ক মারপিট করা হয়। তার ভাই আহত হয় কিন্তু অ্যাঞ্জেল চাকমা চিকিৎসারত অবস্থায় ২৫ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। অ্যাঞ্জেল চাকমার শেষ বাক্য ছিল ‘আমি চাইনিজ না, ভারতীয়’। মৃত্যুর সময়ও সে তার দেশের প্রতি আনুগত্য ও ভারতীয় হিসেবে সে যে গর্বিত, তা প্রকাশ করেছে।

অ্যাঞ্জেল চাকমা সেই ত্রিপুরার বাসিন্দা, ‘যার যুবরাজ বিক্রম মানিক দেব বর্মন পার্বত্য চট্টগ্রাম দখল করে গ্রেটার টিপারল্যান্ড গঠন করার মতবাদ তৈরি করেছেন। যুবরাজ বিক্রম মনে করছেন, আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও তার জনগোষ্ঠী ত্রিপুরার সঙ্গে more inclusive, অথচ নর্থ-ইস্ট ভারতের সঙ্গে স্বাধীনতার সাত দশক পরও inclusive হতে পারছে না।’ অ্যাঞ্জেল চাকমাদের বর্ণবাদের স্বীকার হতে হচ্ছে। এই ঘটনা নিয়ে ভারতে সুশীল সমাজ ও সামাজিক সংগঠনগুলি সোচ্চার হয়েছে। উত্তর-পূর্বে রাজ্যগুলি প্রতিবাদ জানিয়েছে। এই ঘটনা থেকে কয়েকটা বিষয় আমার নজর কেড়েছে-এক. ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলিতে বিশেষ করে ত্রিপুরা রাজ্য বা চাকমা সম্প্রদায়ের মধ্যে দেশের প্রতি আনুগত্য খেলাপি কথাবার্তা উঠে আসেনি, বরং তারা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, সুস্পষ্ট বিচার চেয়েছেন। দুই. বাংলাদেশ দীপু দাশ হত্যাকাণ্ডে ভারতে যত প্রতিবাদ হয়েছে ও যে স্তরে হয়েছে, অ্যাঞ্জেল চাকমার হত্যার ঘটনায় তেমনটা হয়নি। তিন, পক্ষান্তরে, বাংলাদেশে অ্যাঞ্জেল চাকমা হত্যাকাণ্ড নিয়ে তেমন উদ্বেগের সৃষ্টি হয়নি, এমনকি আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের সুশীল সমাজ বা আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলি উদ্বেগ জানায়নি এবং দেশে দীপু দাশের মর্মান্তিক মৃত্যু নিয়ে সামাজিকভাবে/রাষ্ট্রীয়ভাবে তেমন প্রতিবাদ/আন্দোলনের সৃষ্টি হয়নি।

এর দ্বারা স্পষ্ট হয়েছে যে, বাংলাদেশের গণমাধ্যম বা সমাজ ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে মাতামাতি বা রাজনৈতিকরণ করা থেকে দূরে থেকেছে, যা দেশের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পক্ষান্তরে, ভারতীয় গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনের বড় একটা অংশ বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে অতিমাত্রায় মাতামাতি বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলনের পর ভারতীয় রাজনীতি বা গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ!

বাংলাদেশ একটা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ইস্যুতে দেশে অংশীজনদের মধ্যে একতার অভাব স্পষ্ট, এরকম একটা পরিস্থিতিতে ভারত ‘গ্রে জেন ওয়ারফেয়ার’ (অস্পষ্ট যুদ্ধ) চালিয়ে যাচ্ছে, যার অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক চাপ, সাইবার হামলা, তথ্যযুদ্ধ, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিষাক্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করা, দেশের মধ্যে চলমান বিভাজনে আরো ইন্ধন দেওয়া। এসব চলমান থাকবে, কারণ জুলাই আন্দোলনকে তারা ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবাধ্যতা’ হিসেবে দেখছে; বিশেষ করে বাংলাদেশ তাদের প্রভাব বলয় থেকে সরে যাওয়াকে অপমান হিসেবে পরিগণিত করছে। আঞ্চলিক শক্তির কিছু ‘ইগো’ থাকে; বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন সেই ‘ইগো’কে ধাক্কা দিয়েছে।

সুতরাং ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে যে আচরণ করছে, সেটা ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে, তা আঞ্চলিক শক্তির স্বাভাবিক আচরণ, এটাই বাস্তব। এখন বাংলাদেশকে সেসব ব্যবস্থা নিতে হবে; যাতে করে কোনো দেশ আমাদের চ্যুতি (fault line) গুলিকে সুযোগ হিসেবে নিতে না পারে। বড় ধরনের চ্যুতিগুলি হচ্ছে, জাতীয় স্বার্থে মতানৈক্য। বিভাজনের রাজনীতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সংখ্যালঘু ইত্যাদি। আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সংখ্যালঘু নিয়ে দৃষ্টি আরোপ করতে চাই। বাংলাদেশে আমরা সংখ্যালঘু শব্দটা আমাদের vocabulary থেকে বাদ দিয়ে দেব। এ দেশে ছোট-বড় community আছে কিন্তু কেউ লঘু/কম না। ব্যক্তি পর্যায়ে সবাই সমান। একজন নাগরিক উঠে আসবে তার মেধা, যোগ্যতা এবং কর্মের মাধ্যমে।
জুলাই আন্দোলনের essence সেটাই ছিল, যার জন্য শত শত মানুষ জীবন দিয়েছে। আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী ছোট community-সহ পার্বত্য চট্টগ্রামে আমাদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে ও ধর্মীয়ভাবে ছোট community-গুলোকে inclusive culture-এর আওতায় আনতে হবে। একটা বৃহৎ inclusive society গড়ে তুলতে হবে, সেটা রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনীতির ‘কর্নার স্টোন’ হবে। বাংলাদেশে যেন ‘অ্যাঞ্জেল চাকমা অভিজ্ঞতা’ না হয়, আমাদের যেন আর দীপু দাশের করুণ পরিণতি দেখতে না হয়। জাতি যেন এই ঐকমত্যে পৌঁছায়। জাতীয় ও রাজনৈতিক মতৈক্য যেন এখান থেকেই শুরু হয়। এই মতৈক্য জাতিকে moral high ground দেবে, ethical ascendency দেবে। সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি রচনা করবে। কোন জাতি কতটা সভ্য, অনেক কিছুর মধ্যে সেই জাতি তাদের senior citizen, ছোট community এবং specially abled মানুষদের কীভাবে দেখভাল করছে, তার ওপর নির্ভর করে। আসছে নির্বাচনে আমরা নতুন সরকারের হাত ধরে যেন উল্লিখিত মতৈক্যে পৌঁছাতে পারি, সেই আশায় রইলাম।

লেখক: চেয়ারম্যান, ওসমানী সেন্টার ফর পিস