ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির (ইবিএল) চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরীকে কেন্দ্র করে মানিলন্ডারিং অনুসন্ধান নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাঁর ও তাঁর পরিবারের দেশি-বিদেশি পরিচয়পত্র, সম্পদ, ব্যবসা কার্যক্রম এবং বিদেশে বিনিয়োগসংক্রান্ত বিস্তৃত নথি তলব করেছে। তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁর বিদেশি নাগরিকত্ব ও আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই অনুসন্ধানের মধ্যেই সামনে এসেছে মো. শওকত আলী চৌধুরীর নামে ইস্যু হওয়া সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের একটি পাসপোর্টের তথ্য। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই বিদেশি নাগরিকত্বের আড়ালে তিনি বিদেশে বিপুল অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর করেছেন। বিষয়টি যাচাই করতেই সিআইডি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালার আওতায় গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর একটি নোটিশ জারি করে।
নোটিশে শওকত আলী চৌধুরীকে তাঁর নিজের, স্ত্রী-সন্তান ও নির্ভরশীল ব্যক্তিদের দেশি ও বিদেশি পাসপোর্ট এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি, গত ১০ বছরের বিদেশ ভ্রমণের বিবরণ, দেশে ও বিদেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য, আয়কর সংক্রান্ত নথি, বিভিন্ন কোম্পানি ও ব্যবসায় মালিকানা ও শেয়ারহোল্ডিংয়ের বিবরণ, বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারের অনুমোদন এবং বিদেশে সম্পত্তি কেনাবেচার সব কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়।বাংলাদেশ ভ্রমণ
একই সঙ্গে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, নোটিশ পাওয়ার পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে এসব নথি সংগ্রহ করে সিআইডির মালিবাগ কার্যালয়ে পাঠাতে। এই অনুসন্ধান এমন সময়ে শুরু হয়েছে, যখন শওকত আলী চৌধুরীকে ঘিরে ব্যাংকিং অনিয়ম, ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ আগেও উঠেছে।
ব্যাংক রেকর্ড, কাস্টমস নথি ও বিদেশি সরকারি দলিল বিশ্লেষণে তদন্তকারীরা মনে করছেন, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে চলা একটি অনিয়মের ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরে।
নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইবিএল তাদের গ্রাহক ও শীর্ষ ঋণখেলাপি নাজমুল আবেদীনের মালিকানাধীন এ অ্যান্ড বি আউটওয়্যার লিমিটেডের নামে একটি শিল্পঋণ অনুমোদন করে। ওই ঋণের অর্থ ব্যবহার করে ২৮ আগস্ট ২০১৬ তারিখে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড)-এর বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্তভাবে একটি মার্সিডিজ-বেঞ্জ এএমজি জি-৬৩ গাড়ি আমদানি করা হয়।
আমদানির বিল অব এন্ট্রিতে এ অ্যান্ড বি আউটওয়্যার লিমিটেডকে আমদানিকারক হিসেবে দেখানো হলেও নথি ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। গাড়িটি কখনোই কোনো শিল্প বা উৎপাদনমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়নি। সিইপিজেডের বন্ড তদারকির সঙ্গে যুক্ত দুই সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার জানিয়েছেন, আমদানির শুরু থেকেই গাড়িটি ইবিএল চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের ছেলে জারান আলী চৌধুরী নিয়মিত গাড়িটি ব্যবহার করতেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা গাড়িটি ২০২০ সাল পর্যন্ত ভুয়া নম্বর প্লেট ব্যবহার করে চলাচল করেছে। এতে নিবন্ধন ও শুল্ক পরিশোধ এড়ানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাড়িটির ছবি প্রকাশের পর দ্রুত সেটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধন করা হয়। তবে বন্ড বিধি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা বলছেন, শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা গাড়ি শিল্পকারখানার কাজে ব্যবহারের শর্ত থাকায় এ ধরনের নিবন্ধন আইনসঙ্গত নয়।
এই ঘটনার সময়কাল মিলে যায় ইবিএলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঋণ শ্রেণিকরণ সিদ্ধান্তের সঙ্গে। নথিতে দেখা যায়, নাজমুল আবেদীনের মালিকানাধীন মাল্টি সাফ ব্যাগস লিমিটেডের কাছে ইবিএলের পাওনা প্রায় ৯৯ কোটি টাকা ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও রেকর্ডে কৃত্রিমভাবে এটিকে নিয়মিত দেখানো হয়েছে।
নাজমুল আবেদীন বর্তমানে সিআইডি ও কাস্টমসের দায়ের করা মামলার আসামি। সরকারি নথিতে তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ২২২ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। এরপরও তাঁর ব্যাংকিং সুবিধা বহাল থাকায় ইস্টার্ন ব্যাংকের ভেতরে স্বার্থের সংঘাত ও সুশাসনের ঘাটতির প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্ত আরও এগোলে দেখা যায়, সম্পর্কটি শুধু ঋণ অনুমোদন বা শ্রেণিকরণেই সীমাবদ্ধ ছিল না। করপোরেট রেকর্ডে মাল্টি সাফ লিমিটেডের শেয়ারহোল্ডার তালিকায় শওকত আলী চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজনদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তাঁর বাল্যবন্ধু হেলাল উদ্দিন আহমেদ এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগী তাজওয়ার ফিরোজ হক বিভিন্ন সময়ে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারধারী ছিলেন। তাজওয়ার ফিরোজ হকের স্ত্রী ফারাহনাজ হক ছিলেন মাল্টি সাফের একজন প্রতিষ্ঠাকালীন শেয়ারহোল্ডার।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তাসহ অনুসন্ধানী সূত্রগুলোর মতে, ফারাহনাজ হকের শেয়ারহোল্ডিং একটি আবরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। শেয়ার হস্তান্তরের ধরন ও সময়কাল বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আড়ালে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ অন্যত্র ছিল।
বিদেশি নথি বিশ্লেষণে আরও প্রশ্ন উঠে এসেছে। নাজমুল আবেদীন নিজেকে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন করলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শওকত আলী চৌধুরী ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর করেছেন। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এসব লেনদেনে নাজমুল আবেদীন ফ্রন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন কি না।
এই সন্দেহ আরও জোরালো হয় সিঙ্গাপুর ল্যান্ড অথরিটির নথিতে। সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, শওকত আলী চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী তাসমিয়া আম্বারিন সিঙ্গাপুরে যে ঠিকানা ব্যবহার করে সম্পত্তি নিবন্ধন করেছেন, একই ঠিকানা ব্যবহার করেছেন মুজিবুর রহমান মিলন। তিনি মানিলন্ডারিং মামলায় দণ্ডিত, অগ্রণী ব্যাংকের প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এবং ইবিএলের একজন ঋণখেলাপি।
ওই ঠিকানাটি হলো—১২০ লোয়ার ডেল্টা রোড, ১১-০৯, সেনডেক্স সেন্টার, সিঙ্গাপুর।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শওকত আলী চৌধুরী ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত একাধিক অফশোর প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছেন। নথিতে এসব প্রতিষ্ঠানের শেল কোম্পানি কাঠামোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই নথিতে দেখা যায়, সিঙ্গাপুরভিত্তিক শিপ ব্রোকার মুজিবুর রহমান মিলন এসব অফশোর কোম্পানি গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। মিলন ও শওকতের সঙ্গে পরিচিত একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে সিআইডির নোটিশে বিদেশি পাসপোর্ট, বিদেশে বিনিয়োগ, সম্পত্তি এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমসংক্রান্ত পূর্ণ নথি চাওয়াকে তদন্তকারীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। বিদেশি নাগরিকত্বের সময়কাল ও অফশোর কাঠামোর মিল খুঁজে বের করার মাধ্যমে এখন এই অনুসন্ধানের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে।