সিলেট বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান : চার সপ্তাহের জন্য সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এর জের ধরে উত্তাল হয়ে উঠেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে শাকসু নির্বাচন স্থগিত চেয়ে স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থীর করা একটি রিটের প্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন হাইকোর্টে।
এর প্রতিবাদে প্রশাসনিক ভবন-১ এ তালা ঝুলিয়ে মঙ্গলবার শাকসু নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ চালিয়ে যান শিক্ষার্থীরা।
পরে দুপুর সোয়া ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে প্রায় ৩ ঘণ্টা সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের অবরোধ প্রত্যাহার করে প্রশাসনের ভবন ঘেরাও করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
এদিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় , দুপুর থেকে রাত রাত ৮টা পর্যন্ত প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী, উপউপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল করিম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. ইসমাইল হোসেন ও রেজিস্ট্রার সৈয়দ ছলিম মোহাম্মদ আব্দুল কাদিরসহ ভবনে কর্মরত কর্মকর্তারা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় , সন্ধ্যা ৭টার দিকে রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের সামনে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। পরে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠকে বসছেন। নির্বাচনের একদিন আগে বিএনপিপন্থি ৮ জন শিক্ষক নির্বাচন কমিশন থেকে পদত্যাগ করেছেন।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বের হতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক আশরাফ উদ্দিন। এ সময় ‘দালাল, দালাল, ভুয়া-ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে শিক্ষকের পেছন-পেছন গিয়ে একটি দোকানে নিয়ে অবরুদ্ধ করেন শিক্ষার্থীরা।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন স্থগিতের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা ।
এদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন স্থগিতের জন্য হাইকোর্টে রিট করা শিক্ষার্থী ভিপি প্রার্থী মমিনুর রশিদ শুভকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন শিক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য প্যানেল’, ছাত্রদল সমর্থিত ‘সম্মিলিত সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের একাংশ, ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেল, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
এদিকে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সোমবার বিকেলে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে এ আবেদন করা হয়। আবেদনে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চাওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. সাদ্দাম হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘যথাসময়ে এই আবেদনের ওপর শুনানি হবে।’
অবরোধ প্রত্যাহার করে স্বতন্ত্র জিএস প্রার্থী ফয়সাল হোসেন বলেন, ‘আমরা সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করেছি। প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে বসব। পরে আমাদের সিদ্ধান্ত জানান।
এদিকে, সোমবার দুপুরে শাবিপ্রবির সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের শিক্ষক মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনের একদিন আগে বিএনপিপন্থি ৮ জন শিক্ষক নির্বাচন কমিশন থেকে পদত্যাগ করেছেন।
জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ড. আশরাফ উদ্দিন সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। এ সময় অন্য শিক্ষকদেরও দায়িত্ব পালন না করার আহ্বান করেন তিনি।
অধ্যাপক ড. আশরাফ উদ্দীন বলেন, আমরা এখানে জাতীয়তাবাদী শিক্ষকরা এখানে আছি। শাবিপ্রবির নির্বাচন যেন সুষ্ঠু ও সবার অংশগ্রহণে হয়, সে জন্য চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছি। ৫ আগস্টের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা হল দখল করা হলো। হলে ওঠার জন্য একটা নীতিমালা তৈরি করে আবার তারাই সেই নীতিমালা বাতিল করে দিয়েছে। ইউটিএলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হলো, নির্বাচন বন্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এখন নির্বাচন বন্ধে তাহলে শিক্ষকদের একটা অংশই ষড়যন্ত্র করছে। আমাদের এই ট্যাগিং দেওয়া হয়েছে। আমরা যদি নির্বাচন পরিচালনা করি, তাহলে জাতীয়তাবাদী শিক্ষকদের দোষ দেওয়া হবে।
সবশেষে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি বলেন, ইলেকশন কমিশন গঠন হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন হয়েছে। উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী এককভাবে তারিখ ঘোষণা দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন গঠন হয়েছে। তিনি ১৫ জনের নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন।
বিএনপিপন্থি শিক্ষকেরা নির্বাচনের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বক্তব্য বা বিবৃতি দেন নাই। গত ৫ তারিখ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটা চিঠি আসে। নির্বাচন স্থগিত করতে অনুরোধ করা হয়। এই চিঠির বিষয়ে আমরা শিক্ষকরা জানি না। আমরা আশা করছিলাম উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
শিবির সমর্থিত ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী দেলোয়োর হাসান শিশির বলেন, শাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রশাসন কি রকম ভূমিকা রাখে তা আমরা দেখছিলাম কিন্তু তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা দেখাতে পারেনি। নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনকে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। তারা যদি কোন ধরনের আশ্বাস না দিতে পারে তাহলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যাবো। আমাদের আন্দোলন চলমান থাকবে।
এদিকে জানা গেছে , শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ শাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের বিদ্রোহী জিএস প্রার্থী মো. জুনায়েদ ইসলামকে আজীবন বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) রাতে কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়। মো. জুনায়েদ ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জুনায়েদ হাসানকে সাংগঠনিক পদ থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হলো।
এতে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির আজ এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তাদের সঙ্গে কোনোরূপ সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন।
এ বিষয়ে মো. জুনায়েদ ইসলাম বলেন, শাকসুতে প্রার্থী হওয়ার সময় আমাকে বলা হয়েছিল যদি স্বতন্ত্র নির্বাচন করি তাহলে বহিষ্কার করা হবে। আমি যেহেতু শাকসুতে প্রার্থী হয়েছি সেই জায়গা থেকে পেছনে যাওয়ার সুযোগ নেই। দল আমাকে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়নি।