• ৯ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৪শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ২০শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

স্যার-ম্যাডাম সম্বোধনের ক্ষেত্রে রকমারী আলেখ্য

Usbnews.
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৮, ২০২৬
স্যার-ম্যাডাম সম্বোধনের ক্ষেত্রে রকমারী আলেখ্য
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

অফিস আদালতে কর্মকর্তা বা সিনিয়র কর্মীদের স্যার বা ম্যাডাম বলে সম্বোধন না করলে, চলমান রীতিগত দিক দিয়ে তেমন ভালো চোখে দেখা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অধস্তনের চাকুরী নিয়ে টানাটানি শুরু হয়; এমনকি অপরাধ হিসেবে গন্য করে নেতিবাচক স্থানে বদলি পর্যন্ত করা হয়ে থাকে, যার ভূড়ি ভূড়ি উদহারণ আছে। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, ১৭শ শতকে ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করলে স্যার বা ম্যাডাম শব্দের প্রচলন শুরু হয়। মূলত ব্রিটিশ প্রশাসনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তাদের প্রতি স্থানীয় জনগণের আনুগত্য প্রকাশের সারথী ধরে স্যার বা ম্যাডাম সম্বোধন চালু হয়। আর এই সূত্র ধরে সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের স্যার, ব্রিটিশ নারীদের ম্যাডাম বলে ডাকতো। আর এই সম্বোধন ছিল কর্তৃত্ব ও আনুগত্যের প্রকাশ বৈ কিছু নয়। এদিকে ইংরেজরা উচ্চবর্ণের বাঙালিদের (বিশেষ করে সনাতনী ধর্মালম্বী) ‘বাবু’ বলে সম্বোধন করতো। তথ্য মতে জানা যায় যে, আঠার শতকের মাঝামাঝি সুদূরপ্রসারী বুদ্ধির আড়ালে ব্রিটিশরা এই মর্মে চিন্তা করে যে, এই উপনিবেশে এমন একটি শ্রেণি গড়ে তুলতে হবে, যারা ‘বর্ণে ভারতীয়; কিন্তু রুচিতে-বুদ্ধিতে এবং ভাবনায় হবে ব্রিটিশ’। আর এই নীতির সরণি ধরে ব্রিটিশ ভারতে গড়ে ওঠে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা এবং একই সঙ্গে সম্বোধনের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সামাজিক রীতি, যার একটি ছিল কর্তৃপক্ষকে ‘স্যার’ বলে ডাকা। সত্যিকারার্থে স্যার-ম্যাডাম সম্বোধনের উৎপত্তি নিয়ে যদি গভীরে যাই; তাহলে প্রতীয়মান হয় যে, অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ অভিধানের তথ্য অনুযায়ী ১২৯৭ সাল থেকে ইংরেজি ভাষায় ‘স্যার’ শব্দটি ব্যবহার শুরু হয়। আর সেই সময়ে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রে বিশেষ ভূমিকা পালনের জন্য ‘নাইট’ উপাধি খেতাবী ব্যক্তিদের নামের আগে ‘স্যার’ শব্দটি যোগ করার প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। অবশ্য এই শব্দটি ফরাসি শব্দ ঝরৎব থেকে এসেছে; যার অর্থ হলো প্রভু বা কর্তৃপক্ষ। মজার ব্যাপার হলো, তখন ইংল্যান্ডে ঝরৎ শব্দ দিয়ে এই মর্মে বোঝানো হতো যে আমি চাকরই থেকে গেলাম।

এদিকে বাংলার মধ্যযুগ বা মুঘল আমলের সংস্কৃতিতে রাজা বাদশাহদের জাঁহাপনা, হুজুর, ইত্যাদি এমন নামে সম্বোধন করা হতো। আর কর্মকর্তাদের ‘সাহেব’ বলে সম্বোধন করার প্রচলন ছিল। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, ইরানিরা ভারতবর্ষে আসার পর ‘সাহিব’ শব্দটির প্রচলন ঘটে। পরে তা অপভ্রংশ হয়ে ‘সাহেব’ এ রূপ নেয়। অবশ্য ‘সাহেব’ শব্দটি আরবি ‘সাহাবী’ শব্দ থেকে এসেছে; যার অর্থ হলো সঙ্গী, সাথী, সহচর কিংবা বন্ধু। আর তাই তখন পদবির সাথে সাহেব যোগ করে ডাকা হতো। এক্ষেত্রে উদহারণ হিসেবে খান সাহেব, সচিব সাহেব, শেখ, সাহেব ইত্যাদি। আর এটি মুসলমানদের ক্ষেত্রে অধিক প্রযোজ্য ছিল। এদিকে ব্রিটিশ ও শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয় নারীদের ‘মেমসাহেব’ বলে সম্বোধন করা হতো। তাছাড়া মুসলিম বাঙালি বিবাহিত নারীদের ‘বেগম সাহেব’ বলা হতো। আর অফিস আদালতে হেড ক্লার্ককে বড় বাবু বলে ডাকা হতো, যা এখনো অনেক স্থানে পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।

সত্যি কথা বলতে কি, বাংলাদেশে স্যার বা ম্যাডাম সম্বোধন সংক্রান্ত কোনো সরকারি আইন বা কোন নীতিমালা নেই। এটি মূলত একটি প্রথাগত রীতি বা সামাজিক কালচার; যা শিক্ষা, প্রশাসন এবং করপোরেট সমাজে রিলে রেসের মতো চলে এসেছে। এ ব্যাপারে উল্লেখ্য যে, সাতচল্লিশে ব্রিটিশ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই সংস্কৃতি বহাল থাকে। আর স্বাধীনতার পরেও শিক্ষা ও প্রশাসনে স্যার ও ম্যাডাম সম্বোধন অপরিবর্তিত থেকে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে কিছুটা সংযোজনের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের বিচারক মন্ডলীকে উদ্দেশ্য করে আইনজীবী বা বিচারপ্রার্থীরা ‘স্যার’ বা ‘ইওর অনার’ বলে থাকেন এবং উচ্চ আদালতের বিচারকমন্ডলীকে ‘মাই লর্ড’, ‘মি লর্ড’ বলে সম্বোধন করা হয়। অথচ বাংলাদেশের আইনজীবীদের পেশাগত শৃঙ্খলা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী আইনের কোথাও এমন কোনো বিধান নেই। এদিকে ১৯৯০ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে কর্মকর্তাদের স্যার/ম্যাডাম নামে সম্বোধনের রীতি বাতিল করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এ প্রজ্ঞাপনে সরকারি অফিস বা প্রতিষ্ঠানে সম্বোধনের জন্য ‘স্যার’-এর পরিবর্তে ‘জনাব’ এবং ‘সরকারি অফিসার বা কর্মকর্তাদের নামে প্রেরিত পত্রাদির শুরুতে পুরুষের ক্ষেত্রে ‘মহোদয়’ ও মহিলাদের ক্ষেত্রে ‘মহোদয়া’ লেখার সুপারিশ করা হয়। এতদ্ব্যতীত ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি বা তার পরবর্তী হালনাগাদ সংস্করণে শিক্ষকের প্রতি সম্মান বজায় রাখা নিয়ে এতদসংক্রান্ত কিছু উল্লেখ থাকলেও স্যার বা ম্যাডাম ডাকার এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, অর্ন্তরবর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১০/০৭/২০২৫ইং তারিখে উপদেষ্টা পরিষদের ৩৩তম বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য সিনিয়র নারী কর্মকর্তাদের স্যার বলার নিয়ম বাতিল করা হয়। এদিকে আশ্চর্যর বিষয় হলো যে, আমি যখন নব্বইয়ের দশকে ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করি। তখন কোথায় কেউ স্যার বা ম্যাডাম বলে সম্বোধন করেছেন, এমন কথা শুনিনি বা দেখিনি। আসলে স্যার বা ম্যাডাম সম্বোধনের পেছনে আইনগত কোন বাধ্যবাধকতা নেই। অথচ এটি ঔপনিবেশিক আমলে চাপিয়ে দেয়া রীতিনীতি বৈ কিছু নয়। অবশ্য এটি অফিস আদালতে সামাজিক কালচার হিসেবে আমাদের রক্তের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে, যতই আইন-কানুন করা হোক না কেন, তা সহজে মুছে যাবে না।

লেখক : মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব গবেষক, অথর্নীতিবিদ এবং লেখক হিসেবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সম্মাননা ও পদকপ্রাপ্ত।