সিলেট বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনের ভোটের মাঠ এখন স্পষ্ট এক রাজনৈতিক সমীকরণে দাঁড়িয়ে গেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের আর কয়েক দিন বাকি থাকলেও মাঠপর্যায়ের প্রচারণা, জোট রাজনীতি, বিদ্রোহী প্রার্থী ও ভোটের অঙ্ক-সব মিলিয়ে এই আসনটি পরিণত হয়েছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এখানে ত্রিমুখী লড়াই হলেও শক্ত অবস্থানে রয়েছেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী, দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকের মাওলানা মুফতি আবুল হাসান।
এই আসনে বিএনপি নিজ দলের কোনো প্রার্থী না দিয়ে জোটগত সিদ্ধান্তে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে খেজুর গাছ প্রতীকে সমর্থন দেয়। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন সিলেট জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশীদ। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বিএনপি তাকে বহিষ্কার করে। এই বহিষ্কারকে কেন্দ্র করে বিএনপির ভেতরে অসন্তোষ ও বিভক্তি আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
জমিয়তের প্রার্থী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের বড় অংশ তাঁর সঙ্গেই রয়েছেন এবং সাধারণ ভোটাররাও তাঁকে ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মামুনুর রশীদের পক্ষে থাকা কিছু নেতা বহিষ্কৃত হলেও এর বাইরে বিএনপির মূল সাংগঠনিক শক্তি তাঁর পাশেই রয়েছে। খেজুর গাছ প্রতীকের সমর্থকরাও দাবি করছেন, বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক এখনো তাঁদের সঙ্গে আছে এবং শেষ মুহূর্তে সেই ভোট এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হবে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ বলেন, বিএনপির তৃণমূলের কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের অনুরোধেই তিনি প্রার্থী হয়েছেন। তাঁর দাবি, দলীয় বহিষ্কার জনগণের সমর্থন কমাতে পারেনি। তাঁর সমর্থকদের মতে, দীর্ঘদিনের স্থানীয় রাজনৈতিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে বিএনপির বড় একটি অংশ এখনো তাঁর পক্ষেই রয়েছে, যা ভোটের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে, জামায়াত মনোনীত প্রার্থী শেষ মুহূর্তে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলে খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান ১১ দলীয় জোটের চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামেন। এরপর জামায়াত-শিবির, এনসিপি ও জোটভুক্ত দলগুলোর নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামলে ভোটের দৃশ্যপট দ্রুত পাল্টে যায়। মাঠপর্যায়ে সংগঠিত প্রচারণা, কর্মীসংখ্যা ও জনসংযোগে দেওয়াল ঘড়ি প্রতীক দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে যেতে শুরু করে।
সম্প্রতি মুফতি আবুল হাসান তাঁর ১৩ দফা নির্বাচনী ইশতিহার ঘোষণা করেন। এতে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, বন্যা ও নদীভাঙন রোধ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তিনি সংসদ সদস্যের কার্যালয়কে ২৪ ঘণ্টা খোলা নাগরিক সেবা কেন্দ্রে রূপান্তর এবং ‘হ্যালো এমপি’ হটলাইন চালুর ঘোষণাও দেন। তাঁর সমর্থকদের মতে, স্পষ্ট ইশতিহার, ব্যক্তিগত সততা ও সব ইসলামপন্থী দলের ঐক্য তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট-৫ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৮ হাজার ৭৪৬ জন। এর মধ্যে পোস্টাল ভোটার রয়েছেন ৭ হাজার ৯১১ জন। মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, কানাইঘাট উপজেলায় দেওয়াল ঘড়ি প্রতীক খেজুর গাছের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। সম্ভাব্য ভোটের হিসাবে কানাইঘাটে দেওয়াল ঘড়ির প্রায় ৫৩ হাজার এবং খেজুর গাছের প্রায় ৪৫ হাজার ভোট পাওয়ার ধারণা করা হচ্ছে। জকিগঞ্জ উপজেলার ভোটের হিসাব চূড়ান্ত না হলেও সেখানে ১১ দলীয় জোটের অবস্থান শক্তিশালী বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপি, জামায়াত, খেলাফত মজলিস ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। সর্বশেষ বহুল বিতর্কিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী বিজয়ী হন।