দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়ে আসছে। ঘড়ির কাঁটা যত এগোচ্ছে, ততই উৎসবমুখর হয়ে উঠছে নির্বাচনী মাঠ। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হবে সব ধরনের প্রচার–প্রচারণা। ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। সে হিসেবে নির্বাচনের বাকি আছে আর মাত্র ২ দিন। এই ভোটকে উৎসবমুখর এবং নির্বিঘ্ন করতে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। ইতোমধ্যে ব্যালট পেপার ছাড়া সব ধরনের নির্বাচনী সামগ্রী প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। মাঠে নেমেছেন ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় ১০ লাখ সদস্য। তারা ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠে থাকবেন। এখন পর্যন্ত নির্বাচনের প্রস্তুতিপর্ব খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি–জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, এনসিপি, এলডিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। সকাল থেকে দিনব্যাপী প্রার্থী, তাদের পরিবার এবং কর্মী–সমর্থকদের সরব পদচারণায় সারাদেশ এখন উৎসবমুখর।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, সেনাবাহিনী আগে থেকেই মাঠে আছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তারা ভোটের আগে-পরে সাত দিন থাকবে। আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা সবাই বলেছে যে মাঠের অবস্থা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভালো এবং নির্বাচনের জন্য সহায়ক আছে।
নির্বাচন কমিশনার বলেন, সব ব্যালট বাক্স জেলায় জেলায় পাঠানো হয়েছে। রিটার্নিং অফিসাররা সেগুলা গ্রহণ করছে। এখন সবাই ভোটের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শনিবার রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় পদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বৈঠকে তিনি বলেছেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচনের প্রস্তুতিপর্ব খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। উই আর ভেরি হ্যাপি। তিনি বলেন, আমাদের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ। আগামী এক সপ্তাহ খুবই ক্রুশিয়াল।
ইসি মনে করছে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। গত তিনটি নির্বাচনে মানুষ এ ধরনের পরিবেশ পায়নি। এ কারণে মানুষের মধ্যে সহিংসতার পরিবর্তে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বেশি।
নির্বাচন কমিশনার মাছউদ বলেন, আমি দেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে দেখেছি মানুষ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে উন্মুখ হয়ে আছে। রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা মানুষের সেই চাওয়া বুঝবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। তারা সংঘাত-সহিংসতায় না জড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন আয়োজনে সহযোগিতা করবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে। মোট প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে ২৭৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। কমবেশি অর্ধশত আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। তবে দলীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকায় আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। একইভাবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটেরও কয়েকটি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না।
পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের কঠোর প্রস্তুতি রয়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, কোস্ট গার্ড, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, জাল ভোট দেওয়াসহ ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গুজব আছে। আলোচনা আছে, এক ব্যক্তি একাধিক ভোট দিতে পারে এবং বাইরে থেকে ব্যালট নিয়ে তা ব্যালট বাক্সে ফেলতে পারে। কেউ যাতে বাইরে থেকে ব্যালট পেপার নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কারও কাছে ব্যালট পেপার পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে জেল-জরিমানা করা হবে।
সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ এখন চ্যালেঞ্জ-প্রধান উপদেষ্টা : প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ এখন চ্যালেঞ্জ। এজন্য আগামী সপ্তাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ (ক্রুশিয়াল)। তবে এখন পর্যন্ত নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্ব খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আমরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট। শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় নির্বাচন প্রস্তুতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার উদ্ধৃতি দিয়ে যমুনার সামনে প্রেস সচিব শফিকুল আলম এসব তথ্য জানান। এ সময়ে জানানো হয়, এবার ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ। সারা দেশে উৎসাহ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচনের প্রচারণা চলছে। কেউ কারোর বিরুদ্ধে কটু কথা বলছেন না। কোনো অভদ্র আচরণ ও অভদ্র কথা হচ্ছে না। এটি আমাদের রাজনীতির ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য খুবই ইতিবাচক পরিবর্তন।
শফিকুল আলম বলেন, এবারের নির্বাচনে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র। সব কেন্দ্র ইতোমধ্যে গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে। ২৫ হাজার ৭০০ বডি ওর্ন ক্যামেরা ইতোমধ্যে সেট করা হয়েছে। তাদের কাছে বডি ওর্ন ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে, বৈঠকে বসে প্রধান উপদেষ্টা তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। এর মধ্যে তাৎক্ষণিক তেঁতুলিয়া এবং খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গাতে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। এছাড়াও কেন্দ্রভিত্তিক সিসিটিভি ক্যামেরার ৮৫ শতাংশ ইতোমধ্যে সেট করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ১০ লাখ সদস্য থাকবেন। এর মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর (সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী) ১ লাখ ৮ হাজার ৮২৫ জন মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়াও ১ হাজার ২১০টি প্লাটুনে বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন মোতায়েন করা হয়েছে। উপকূলীয় ১০টি জেলার ১৭টি আসনের ২০টি উপজেলায় ৩ হাজার ৫৮৫ জন কোস্টগার্ড সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এবার পুলিশ মোতায়েন করা হবে ১ লাখ ৫৭ হাজার। এটি এখনো মোতায়েন করা হয়নি। সবশেষে অর্থাৎ ১১ তারিখে পুলিশ মোতায়েন করা হবে। আনসার বাহিনীর সদস্য থাকবেন ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৬৬ জন। এছাড়াও নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপস চালু হয়েছে। কোনো কেন্দ্রে গন্ডগোল হলে এই অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।