• ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১লা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

ম্যানচেস্টারে উগ্র ডানপন্থী–ইসলামবিরোধী মিছিল, পাল্টা মিছিলে উত্তাল শহর

Usbnews.
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬
ম্যানচেস্টারে উগ্র ডানপন্থী–ইসলামবিরোধী মিছিল, পাল্টা মিছিলে উত্তাল শহর
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারের ভেজা এক আন্ডারপাসে ‘ওদের ফেরত পাঠাও’ স্লোগান প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। শত শত কট্টর ডানপন্থী ইসলামবিরোধী বিক্ষোভকারী রাস্তায় মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হাওয়ায় উড়ছিল ইউনিয়ন যুক্তরাজ্যের ইউনিয়ন জ্যাক পতাকা। কিছু বিক্ষোভকারীকে স্পষ্টই মদের প্রভাবে খানিকটা মাতাল দেখা যাচ্ছিল। তারা একের পর এক অভিবাসনবিরোধী স্লোগান দিচ্ছিল। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকেও কটাক্ষ করছিল।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, গণহারে অভিবাসী ও মুসলিমদের যুক্তরাজ্য থেকে বহিষ্কারের দাবি জানানো কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ব্রিটেন ফার্স্ট এই বিক্ষোভের আয়োজন করে। জবাবে গতকাল শনিবার দুপুরে একটি পাল্টা বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়।

ম্যানচেস্টারে উগ্র ডানপন্থী–ইসলামবিরোধী মিছিল, পাল্টা মিছিলে উত্তাল শহর
পাল্টা বিক্ষোভে অংশ নেয় আরও বড় জনসমাগম। তারা ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী বিক্ষোভকারী। কয়েকটি রাস্তা দূরে জড়ো হয়ে তারা বর্ণবাদবিরোধী ব্যানার বহন করছিল। বিভিন্ন পতাকা ওড়াচ্ছিল, যার মধ্যে ফিলিস্তিনের পতাকাও ছিল। দক্ষিণ লন্ডনের ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী রুবি পাল্টা বিক্ষোভে অংশ নিতে পাঁচ ঘণ্টার কোচযাত্রা করেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, এখানে আসা তাঁর জন্য ‘কোনো চিন্তার বিষয়ই ছিল না।’ আইন ঝামেলা ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় তিনি তার পদবি প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।

রুবি জানান, তাঁর দাদা-দাদি মূলত ব্রিটিশ এলাকা ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের মন্টসেরাটের বাসিন্দা। তারা ছিলেন উইন্ডরাশ প্রজন্মের অংশ। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে ক্যারিবীয় দেশগুলো থেকে যেসব অভিবাসীকে যুক্তরাজ্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তারা সেই দলে ছিলেন। নিজেদের নতুন দেশকে এত কিছু দেওয়ার পরও এখন তারা ক্রমেই অনাকাঙ্ক্ষিত বোধ করছেন। রুবি বলেন, তাঁর দাদা-দাদি তাকে জানিয়েছেন, ১৯৫০-এর দশকে যখন তারা এ দেশে এসেছিলেন, যে মাত্রার বর্ণবাদের মুখে পড়েছিলেন, এখন তারা আবার সেই সময়ের মতো পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছেন।

ওয়েলসের ১৬ বছর বয়সী পাল্টা বিক্ষোভকারী ল্লোয়েলিনও একই কথা বলেন। তিনি জানান, তাঁর বাবা ব্রিটিশ-গায়ানিজ। গত কয়েক বছরে জাতিগত পরিচয়ের কারণে তার বাবা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি মৌখিক হয়রানির শিকার হয়েছেন।

দুটি মিছিল শুরুর আগে উত্তেজনা স্পষ্ট ছিল। কট্টর ডানপন্থী উসকানিদাতারা পাল্টা বিক্ষোভের জন্য নির্ধারিত এলাকায় ঢুকে তাদের অনুসারীদের উদ্দেশে লাইভ সম্প্রচার করছিল। ওয়েলসের জন নামের এক শক্তপোক্ত ও দৃঢ়চেতা পাল্টা বিক্ষোভকারী হাত প্রসারিত করে তাদের সামনে দাঁড়ান। পুলিশ সদস্যরা তখন দেখছিলেন।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘ওরা এখানে ঝামেলা করতে আসে। অনলাইনে তা থেকে টাকা রোজগার করে। কিন্তু আমি এসেছি বামপন্থীদের রক্ষা করতে। এই লোকগুলো সংখ্যালঘুদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। কারণ তারা মনে করে, তারাই একটি শ্রেষ্ঠ জাতি।’

পুলিশের বেষ্টনী ঘেরা অবস্থায় ব্রিটেন ফার্স্ট মিছিল শুরু হয়। নেতৃত্বে ছিলেন পল গোল্ডিং। তিনি স্থূলকায় ও আক্রমণাত্মক কট্টর ডানপন্থী কর্মী। ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক হয়রানির অভিযোগে তিনি আগে কারাদণ্ড ভোগ করেছেন। মিছিলটি শুরুতে উদ্যাপনমুখর থাকলেও শহরের কেন্দ্রে পাল্টা বিক্ষোভকারীদের মুখোমুখি হওয়ার পর দ্রুত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। মিছিলে ‘বামপন্থীরা নোংরা’ বলে চিৎকার করেন দলটির এক সমর্থক। তারা বসে পড়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা তিন তরুণকে হয়রানি করে। দাঙ্গা পুলিশ তাদের ঘিরে ফেলে এবং নিরাপদে সরিয়ে নেয়।

শেষ পর্যন্ত দুই মিছিল মুখোমুখি হয়। অশ্রাব্য গালাগালিতে পরিস্থিতি চরমে ওঠে। পুলিশ সারি ধরে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিল। ব্রিটেন ফার্স্টের বিক্ষোভকারীরা পতাকার দণ্ড দিয়ে পাল্টা বিক্ষোভকারীদের খোঁচা দেয়। কেউ কেউ পুলিশের দুর্বল বেষ্টনী ভেদ করে ঢুকে পড়ে। তারা অভিবাসনবিরোধী ও ফিলিস্তিনবিরোধী স্লোগান দেয়।

অনেক পাল্টা বিক্ষোভকারী ও পথচারী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, পুলিশ এই মিছিলটি করার অনুমতি দিয়েছে। জিউইশ অ্যাকশন ফর প্যালেস্টাইনের পিয়া ফেইগ বলেন, ‘আমরা ইহুদি ও আন্তর্জাতিকতাবাদী হিসেবে রাস্তায় সংগঠিত হওয়া ফ্যাসিস্ট ব্রিটেন ফার্স্টের মুখোমুখি হতে বাধ্য হচ্ছি। তাদের আমাদের রাস্তায় বিভাজনমূলক, বর্ণবাদী ও একনায়কতান্ত্রিক অবস্থান প্রচারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’

অড্রে নামের এক শিক্ষক ও পাল্টা বিক্ষোভকারী জানান, এক ব্রিটেন ফার্স্ট সমর্থক তাঁকে ধাক্কা দিলে পুলিশ তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ সব সময় কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে ‘সুরক্ষা’ দেয়। তবে এক পুলিশ কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানান, এই দিনের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা করতে হয়েছে। এটি ছিল অত্যন্ত কঠিন অভিযান। কারণ দুই পক্ষই বারবার তাদের নির্ধারিত রুট পরিবর্তন করছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, এই দুই বিরোধী বিক্ষোভ সামলানো, ইউক্রেন সমর্থনে একটি সমাবেশ, এবং একই সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিত বড় ফুটবল ম্যাচগুলোতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে স্থানীয় পুলিশ বাহিনী চাপে পড়ে যায়।