“বাবা বিদেশে যাওয়ার আগে বলেছিল—‘মা রে, আমি তো লেখাপড়া করতে পারি নাই। তুমি লেখাপড়া করে আমার স্বপ্ন পূরণ করবা।’ এখন বাবাই আর নেই। আমরা কীভাবে বাঁচব? কীভাবে পড়াশোনা করব?”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিল কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর পৌরসভার পশ্চিম ধুলজুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী নুসরাত জাহান সাথী। প্রবাসী বাবা মো. রাসেল মিয়ার আকস্মিক মৃত্যুর খবরে তার কণ্ঠ যেন বারবার আটকে যাচ্ছিল। সৌদি আরবে মঙ্গলবার মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান রাসেল মিয়া।

বাংলাদেশ সময় দুপুর আড়াইটার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে। খবরটি দেশে পৌঁছানোর পর থেকেই তার বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া। পরদিন সকাল থেকে হোসেনপুর পৌরসভার পশ্চিম ধুলজুরি গ্রামে রাসেলের বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা। উঠানে নির্বাক হয়ে বসে আছেন তার স্ত্রী ও সন্তানরা। মাঝে মাঝে ডুকরে কেঁদে উঠছেন তারা। তাদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ।
নিহত রাসেল মিয়া একই এলাকার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা লিয়াকত আলীর ছেলে। তিনি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী ও চার সন্তানের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে জীবন কাটাচ্ছিলেন রাসেল। এলাকায় মাটিকাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করে কোনোমতে সংসার চালাতেন।
স্ত্রী-সন্তানদের ভালো ভবিষ্যতের আশায় ধারদেনা করে গত বছরের নভেম্বরে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে মাজা আল আরাবিয়া কোম্পানির অধীনে কর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন বলেও তারা জানান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি বিদেশে গিয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই বজ্রপাতে নিভে গেল তার জীবন। রাসেলের মৃত্যুর খবর শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তার স্ত্রী। বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি।
দুই ছোট মেয়েকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘স্বামী সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিদেশে গিয়েছিল। এখন বাচ্চাদের নিয়ে কীভাবে বাঁচব? সংসার কীভাবে চালাব? যে টাকা ধার করে তাকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম, তা কীভাবে শোধ করব?’
রাসেলের বাবা লিয়াকত আলীও ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন। স্বজনদের সহযোগিতায় তাকে সামলাতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘কখনও ভাবিনি আমার ছেলের এমন দশা হবে। আগে জানলে তাকে বিদেশে পাঠাতাম না। এখন শুধু চাই, আমার ছেলের লাশটা যেন দেশে আনা হয়।’
এদিকে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রাসেল ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ। এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কেউই মেনে নিতে পারছে না। তার মরদেহ দ্রুত দেশে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও জানান স্থানীয়রা।
হোসেনপুর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার মিছবাহ উদ্দিন মানিক বলেন, ‘রাসেল খুবই পরিশ্রমী মানুষ ছিল। পরিবারের জন্য বিদেশে গিয়েছিল। এলাকার সবার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল আন্তরিক।’
প্রবাসে উপার্জনের স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া এক বাবার অকালমৃত্যুতে এখন দিশেহারা তার পরিবার। ছোট্ট সাথীর মনে বারবার ভেসে উঠছে বাবার সেই কথাগুলো—‘লেখাপড়া করে আমার স্বপ্ন পূরণ করবা।’ কিন্তু বাবাকে হারানোর পর সেই স্বপ্ন পূরণের পথ এখন যেন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।