• ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

ইঞ্জিনিয়ার ইবরাহীম : জামরাতে শয়তানকে পাথর মারার প্রস্তাবিত প্রকল্প ও ‘মুহিব্বুল খায়ের’ বা কল্যাণকামী উপাধিতে ভূষিত

Usbnews.
প্রকাশিত মার্চ ২২, ২০২৬
ইঞ্জিনিয়ার ইবরাহীম : জামরাতে শয়তানকে পাথর মারার প্রস্তাবিত প্রকল্প ও ‘মুহিব্বুল খায়ের’ বা কল্যাণকামী উপাধিতে ভূষিত
নিউজটি শেয়ার করুনঃ
একজন কীর্তিমান মানুষকে স্মরণ করি। মানুষটি চাঁপাই নবাবগঞ্জের। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। তাকে মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশ ‘আর্কিটেক্ট অব মডিফিকেশন প্লান অব জামরা’ নামে চিনলেও বাংলাদেশে তাকে নিয়ে আলোচনা খুব কম হয়। অথচ তার ভূমিকা ও অবদানের কারণেই পবিত্র মক্কার মিনায় হজ্জের সময় পাথর মারতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে।
ঘটনার শুরু ১৯৯৪ সালে। সে বছর ইঞ্জিনিয়ার ইবরাহীম ও তার স্ত্রী হজ করতে যান। সেসময় তিনি লক্ষ করেন, জামরাতে শয়তানকে পাথর মারার সময় প্রচুর হট্টগোল হয় এবং হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে বহু মুসল্লি মারা যান। কেবল ১৯৯৪ সালেই অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে শয়তানকে পাথর মারতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ২৭০ জন হাজী মারা যান।
মূলত হজ্জের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে পাথর মারার জন্য প্রত্যেক হাজীকে সৌদি আরবের মিনায় সাধারণত তিনদিন অবস্থান করতে হয়। যে তিনটি স্তম্ভে পাথর মারতে হয়, তাকে বলা হয় জামরা বা পাথরের স্তূপ। এগুলো শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভ। প্রথম জামরার নাম জামরাতুল আকাবা, মধ্যেরটি উস্তা ও শেষেরটি উলা। একটি থেকে অন্যটির দূরত্ব মোটামুটি ৩৩০ মিটার। ইবরাহীম সাহেব দেখলেন- পাথর মারার ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম না থাকায় যে যেদিক থেকে পারত, পাথর মারা শুরু করত এবং একপর্যায়ে বিশৃঙ্খলায় পদদলিত হয়ে প্রাণ হারাতো।
এই বিষয়টি প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীমকে অত্যন্ত ভাবিয়ে তোলে। দেশে ফিরে তিনি এই সমস্যার সমাধানে কাজ শুরু করেন। অবশেষে শয়তানকে পাথর মারার একমুখী বিজ্ঞানসম্মত চারটি ধাপ সম্পন্ন একটি প্রকল্প প্রণয়ন করেন। তার প্রস্তাবিত প্রকল্পটি হচ্ছে-
১. প্রতিটি জামরাকে বেড়া দিয়ে পরস্পর সংযুক্ত করা, যাতে উভয়দিকে দু’টি রাস্তার সৃষ্টি হয়।
২. জামরার দেয়াল ছয় ফুট বাই ছয় ফুট থেকে উভয়দিকে অন্তত ৩০ ফুট করে বাড়িয়ে নেয়া।
৩. একমুখী ট্রাফিক সিগনালের ব্যবস্থা করা।
৪. মিনার দিকে ‘ইন’ ও অপর প্রান্তে ‘আউট’ বসিয়ে হাজিদের চলাচল একমুখি করা। একদিক দিয়ে ঢুকে পাথর মেরে অপরদিক দিয়ে বেরিয়ে যাবেন হাজিরা কিন্তু কেউ পেছনে ফিরবেন না।
এই বিস্তারিত প্রকল্পটি প্রকৌশলী ইব্রাহীম প্রথমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। সেখান থেকে ঢাকার সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে সৌদি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরিকল্পনাটি এত নিখুঁত এবং বাস্তবসম্মত ছিলো যে সৌদি সরকার প্রকল্পটি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করেন। আর এরই মধ্য দিয়ে এই মেধাবী বাংলাদেশীর উদ্যোগে আল্লাহর ইচ্ছায় হজ্জের সময় প্রতিবছর পদদলিত হয়ে মৃত্যুর মিছিল অনেকটাই কমে আসে।
তৎকালীন সৌদি বাদশা ফাহাদ প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীমকে তার এই অসাধারণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ‘মুহিব্বুল খায়ের’ বা কল্যাণকামী উপাধিতে ভূষিত করেন। তার জন্য উপহারসামগ্রীও পাঠান। শুধু তাই নয়, পরে তাকে পবিত্র মক্কায় প্রকল্প-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করারও সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তৎকালীন কাবা শরীফের প্রধান ঈমাম শায়খ আবদুস সুবাইল তাকে পৃথিবীর ১০ জন সেরা প্রকৌশলীর অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।। কেননা এর আগে হাজারো প্রকৌশলী হজ্ব করে গেলেও কেউ কখনো এ বিষয়টি নিয়ে ভাবেননি বা সমস্যা নিরসনের উদ্যোগ নেননি।
মিনায় বর্ধিত প্রকল্পের পাশে রাস্তার ধারে সবুজ গালিচায় সাদা অক্ষরে ‘মোহান্দেস ইব্রাহিম মিনাল বাংলাদেশ’ ও ‘Engineer Ibrahim from Bangladesh’ লিখে টাঙিয়ে দেয়া হয়। প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম ১৯৪১ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বাবুপুরে জন্মগ্রহণ করেন। খ্যাতিমান এই মহান প্রকৌশলী ২০১৭ সালের ৮ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।
আল্লাহ তাআলা মরহুম ইঞ্জিনিয়ার ইবরাহীমকে জান্নাত নসীব করুন। তার যে অসামান্য অবদানের কারণে লাখো কোটি হাজি সাহেবরা সুবিধা পেলেন, এবং আগের মতো প্রাণহানি ও অনাকাংখিত দুর্ঘটনার পরিমাণ কমে আসলো; আল্লাহ যেন তা কবুল করেন। মানুষের চিন্তা যদি ভালো থাকে, আর নিয়তে যদি খুলুসিয়াত থাকে, তাহলে বাংলাদেশের প্রত্যান্ত অঞ্চলে থেকেও বিশ্বের জন্য, উম্মাহ’র জন্য কাজ করা যায়- মরহুম ইঞ্জিনিয়ার ইবরাহীম রহ. তার প্রমাণ।