দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের চরম উত্তেজনা এবং যুদ্ধের আশঙ্কার পর অবশেষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বরফ গলার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের একটি ‘সম্পূর্ণ ও স্থায়ী সমাধানের’ লক্ষ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা শুরু হয়েছে। এই আলোচনার প্রতি সদিচ্ছা প্রকাশ করতে তিনি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে পূর্বনির্ধারিত সমস্ত সামরিক হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ সব বড় হাতের অক্ষরে দেওয়া একটি পোস্টে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য শেয়ার করেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, গত দুই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে আমাদের শত্রুতার অবসান ঘটানোর বিষয়ে অত্যন্ত গভীর ও গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনার সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে আমি প্রতিরক্ষা বিভাগকে আগামী ৫ দিন কোনো সামরিক হামলা না চালানোর নির্দেশ দিয়েছি।’
ইরান সংকটের পূর্ণাঙ্গ সমাধানের পথ খুলেছে, জানালেন ট্রাম্পইরান সংকটের পূর্ণাঙ্গ সমাধানের পথ খুলেছে, জানালেন ট্রাম্প
এই আকস্মিক নমনীয়তার কারণ কী?
গত সপ্তাহান্তে যেখানে দুই পক্ষই একে অপরকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিল, সেখানে ট্রাম্পের এই সুর পরিবর্তন বিশ্ববাসীকে অবাক করেছে। কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, কী এমন প্রস্তাব ইরান দিয়েছে যার ফলে ট্রাম্প তাঁর অবস্থান থেকে সরে এলেন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে:
১. হরমুজ প্রণালি: ইরান হয়তো বিশ্ববাজারের কথা চিন্তা করে এই কৌশলগত পথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রাথমিক ইঙ্গিত দিয়েছে।
২. নিউক্লিয়ার সমঝোতা: পর্দার আড়ালে নতুন কোনো পারমাণবিক চুক্তির প্রস্তাব থাকতে পারে।
৩. অভ্যন্তরীণ চাপ: যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বড় ধরনের যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা ট্রাম্পকে ভাবিয়ে তুলতে পারে।
ট্রাম্পের হামলা বন্ধের ঘোষণার পরই কমছে তেলের দাম, চাঙা শেয়ারবাজার।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি, ট্রাম্পই পিছু হটেছেন: ইরান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ‘পূর্ণাঙ্গ সমাধান’–এর খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। ট্রাম্প বলেছেন, গত দুই দিনে দুই দেশ মধ্যপ্রাচ্যে পারস্পরিক বৈরিতা সম্পূর্ণভাবে নিরসনের বিষয়ে ‘খুব ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনা’ করেছে। তবে ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমেও কোনো আলাপ হয়নি।
ইরানি বার্তা সংস্থা ফার্স নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ইরানি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো সরাসরি যোগাযোগ হয়নি, ‘মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমেও নয়।’ সূত্রের দাবি, ইরান বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলার সতর্কতা দেওয়ার পর ট্রাম্প ‘পিছু হটেছেন।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে উল্লেখ করেছিলেন, যদিও ওই সূত্র এমন কোনো যোগাযোগের কথা অস্বীকার করেছে। এই দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ফার্স নিউজ এজেন্সি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ট্রাম্পের সঙ্গে ‘সরাসরি বা পরোক্ষ কোনো যোগাযোগ হয়নি।’ তাঁর দাবি, ‘আমাদের লক্ষ্যবস্তু পশ্চিম এশিয়ার সব বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে—এ কথা শোনার পর তিনি পিছু হটেছেন।’
এদিকে, আফগানিস্তানের কাবুলে অবস্থিত ইরানি দূতাবাসও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা বিলম্বিত করার বিষয়ে ট্রাম্পের বার্তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দূতাবাসটি বলেছে, ‘ইরানের কঠোর সতর্কবার্তার’ পর ট্রাম্প হামলা থেকে বিরত থাকেন। এদিকে তাসনিম নিউজ এজেন্সিও মন্তব্য করেছে, ‘ট্রাম্প পিছু হটেছেন!’
হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা বার্ন্ড ডেবসম্যান জুনিয়র বিবিসিকে বলেন, ‘ট্রাম্পের এই বার্তাটি “অপারেশন এপিক ফিউরি” শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে নমনীয় হলেও অনেক প্রশ্ন এখনো উত্তরহীন। বিশেষ করে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চয়তা না আসায় এই পাঁচ দিনের বিরতি আসলে কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।’
ইরান যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত ট্রাম্পের, নীরব নেতানিয়াহুইরান যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত ট্রাম্পের, নীরব নেতানিয়াহু।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ‘পূর্ণাঙ্গ সমাধানের’ খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। ট্রাম্প বলেছেন, গত দুই দিনে দুই দেশ মধ্যপ্রাচ্যে পারস্পরিক বৈরিতা সম্পূর্ণভাবে নিরসনের বিষয়ে ‘খুব ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনা’ করেছে। তবে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, ট্রাম্প সংঘাত শেষ করার ইঙ্গিত দিলেও এখনো নীরব ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোতে পূর্বঘোষিত সামরিক হামলা আপাতত স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আজ সোমবার তিনি জানান, গত দুই দিনে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘খুব ভালো ও ফলপ্রসূ’ আলোচনা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি সামরিক বাহিনীকে এই নির্দেশ দিয়েছেন।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তারা এটি সহজে হাতছাড়া করবে না। অন্যদিকে, ট্রাম্পের এই পাঁচ দিনের আলটিমেটাম শেষে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট ফলাফল না আসে, তবে যুদ্ধের তীব্রতা আরও বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আপাতত পুরো বিশ্বের নজর এখন মেম্ফিসে ট্রাম্পের আসন্ন ভাষণের দিকে, যেখানে তিনি এই গোপন আলোচনার বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা: ট্রাম্পের একতরফা দাবি নিয়ে বিভ্রান্তি, পরস্পরবিরোধী তথ্য
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা হয়েছে কি না—এ নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে আসছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করার পর ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যম ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছে।
ইরানি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি একটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনা হয়নি।
একই সুরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাসনিম নিউজ এজেন্সি। সংস্থাটি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না এবং হরমুজ প্রণালি যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরবে না।
তাসনিমের প্রতিবেদনে এক ইরানি কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, ‘বৈশ্বিক চাপে, বিশেষত তেলের দামের কারণে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার পরিকল্পনা থেকে ট্রাম্প সরে এসেছেন।’ তিনি আরও, ‘যতক্ষণ না ইরান একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আত্মরক্ষা চালিয়ে যাবে।’