• ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

১৩৩ অধ্যাদেশ নিষ্পত্তি করতে হবে ১০ এপ্রিলের মধ্যে, সংসদে পাশ না হলে স্বয়ংক্রিয় বাতিল , এমপির দুই শপথ স্পষ্ট উল্লেখ ছিল

Usbnews.
প্রকাশিত মার্চ ২৫, ২০২৬
১৩৩ অধ্যাদেশ নিষ্পত্তি করতে হবে ১০ এপ্রিলের মধ্যে, সংসদে পাশ না হলে স্বয়ংক্রিয় বাতিল , এমপির দুই শপথ স্পষ্ট উল্লেখ ছিল
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারিকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যেই। গত ১২ মার্চ শুরু হওয়া ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়েছে। আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে কোনো অধ্যাদেশ আইন আকারে সংসদে পাশ না হলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তামিল বা বাতিল হয়ে যাবে।

সংবিধানের ৯৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতির জারিকৃত অধ্যাদেশসমূহ সংসদের অধিবেশন বসার পর প্রথম বৈঠকেই উত্থাপনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদ বসার পর ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না পেলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। তবে, সংসদ চাইলে আইন হিসেবে পাশ করতে পারে বা বাতিল করতে পারে।’

 

জুলাই সনদ (বা জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫) বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক সনদ, যাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐকমত্যভিত্তিক গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রস্তাবসমূহ রয়েছে।এটি এমন একটি রাজনৈতিক রূপরেখা, যাতে সংবিধান সংস্কার, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, বিচার বিভাগ স্বাধীনতাকরণসহ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। এটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপের ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছে।

বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে ৪০টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তির অধ্যাদেশ পাশে সবাই একমত
জুলাই-গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ হুবহু থাকছে
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর করার বিষয়ে আলোচনা
সংবিধানে প্রাধান্য সরকারি দলের, বিরোধী দল ‘জনআকাঙ্ক্ষা’য়

অধ্যাদেশ নিষ্পত্তির বিষয়ে সংবিধানে বেঁধে দেওয়া এই সময়সীমা অনুযায়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারিকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে সংসদকে আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

১২ মার্চ সংসদের প্রথম বৈঠকে ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-বিভাগ সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো এখনো গঠিত না হওয়ায় এ সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পাদনের লক্ষ্যে প্রথম বৈঠকে জাতীয় সংসদের একটি বিশেষ কমিটি করা হয়েছে। এরপর ১৫ মার্চ সংসদের দ্বিতীয় বৈঠকে আইনমন্ত্রী অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনার জন্য এই বিশেষ কমিটিতে পাঠানোর এবং কমিটিকে ২ এপ্রিলের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রস্তাব করলে তা গৃহীত হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তির অধ্যাদেশ পাশে একমত, অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ হুবহু থাকছে

অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনা শুরু করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি। সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে গতকাল মঙ্গলবার এই বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক হয়েছে। প্রথম বৈঠকে কমিটি উত্থাপিত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৪০টি নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করেছে। এতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে জারি করা ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ-২০২৬’-এর বিষয়ে কমিটি পুরোপুরি একমত হয়েছে। এটি সংসদে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করবে বিশেষ কমিটি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ-২০২৫ হুবহু রাখার বিষয়েও কমিটি একমত। এছাড়া, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর করার বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে, কমিটির বেশির ভাগ সদস্য এতে একমত পোষণ করেছেন বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে। অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনায় আজ বুধবার বেলা ২টায় আবারও বৈঠকে বসবে কমিটি।

কিছু বিষয়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজন : কমিটি সভাপতি

গতকালের বৈঠক শেষে বিশেষ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে অর্ধেকের কম হবে পরীক্ষানিরীক্ষা করেছি। এর মধ্যে কিছু বিষয়ের ওপর দুই-এক জন সদস্যের কিছু কিছু মতামত আছে। আমরা বলেছি—সেগুলো পরবর্তী সভায় আলোচনা করার জন্য। পরবর্তী সভায় সমাপ্ত না হলে লিখিতভাবে দেওয়ার জন্য বলেছি। কিছু বিষয়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজন। তাই এগুলো স্থগিত রাখা হয়েছে। তিনি জানান, কমিটি আশা করছে—২ এপ্রিলের মধ্যেই সংসদে প্রতিবেদন দিতে পারবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে আমরা ধারণ করব : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বৈঠকের মাঝামাঝি সময়ে বের হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিশেষ কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে এক বৈঠকে ফয়সালা করা সম্ভব হবে না। আরো কয়েক দফা বৈঠকে বসতে হবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক বিষয়ে একমত হওয়া গেছে। ‘জুলাই ইনডেমনিটি’র বিষয়ে সবাই পুরোপুরি একমত হয়েছে। যদি সংশোধনী আনতে হয়, সেটা পরে।

বৈঠক শুরুর আগে সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে আমরা ধারণ করব। কিছু অধ্যাদেশ আছে যেখানে জুলাই যোদ্ধাদেরকে যেই নামে অভিহিত করা হয়েছে এবং গণঅভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে ও অংশগ্রহণ করেছে তাদের ইনডেমনিটি দেওয়ার বিষয় আছে, সেগুলোকে আমরা গ্রহণ করব। আরো কিছু বিষয়ে আছে। যেমন বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছিল তাদের নেতাদের নামে এবং বিভিন্ন নামে, সেগুলো বিলুপ্ত করা হয়েছে এগুলোকে আমরা গ্রহণ করব।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আরো অনেক অধ্যাদেশ রয়েছে। সেগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে কোনটা কীভাবে গ্রহণ করা যায়; কোনটা সংশোধনীসহ গ্রহণ করা যায় আবার কোনটাতে পরে আরো সংশোধনী আনতে হবে সেটা সেভাবেই ফয়সালা করতে হবে। তিনি বলেন, সময় সংক্ষিপ্ত। এসব ৩০ দিনের মধ্যে ফয়সালা করার বাধ্যবাধকতা আছে। আমাদের প্রথম অধিবেশন গত ১২ মার্চ বসেছিল। পরবর্তী অধিবেশন আগামী ২৯ মার্চ। এর মধ্যে প্রায় ১৫ দিনের মতো সময় অতিবাহিত হয়ে যাবে। বাকি ১৫ দিনের মধ্যে যা করা যায় ব্যবস্থা করব।

সংবিধান অবশ্যই সবার থেকে এগিয়ে থাকে :আইনমন্ত্রী

বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, তারা আলোচনার মধ্যে আছেন, এগোচ্ছেন। কতটি বিষয়ে কমিটি একমত হয়েছে, তা এখন বলা যাবে না। যখন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে, তখন বলা যাবে। সংবিধান ও গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা—এ দুটির মধ্যে বৈপরীত্য এলে কোনটিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, তারা সংবিধান ও জনআকাঙ্ক্ষা দুটোকে সমন্বয় করে এগিয়ে যেতে চান। সংবিধান অবশ্যই সবার থেকে এগিয়ে থাকে।

আমরা জুলাই আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দেব :জামায়াতের এমপি রফিকুল ইসলাম

বৈঠক শেষে বিশেষ কমিটির সদস্য ও বিরোধী দল জামায়াতের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার বিষয়ে অধ্যাদেশে যেসব বিষয় এসেছে, তাতে তারা একমত। বৈঠকে আলোচনা হওয়া বেশির ভাগ অধ্যাদেশ সুপারিশ আকারে সংসদে উত্থাপনের বিষয়ে কমিটি একমত হয়েছে। সংবিধান ও জুলাই আকাঙ্ক্ষার মধ্যে কোনটি প্রাধান্য পাবে—এমন প্রশ্নে জামায়াতের এই এমপি বলেন, তারা জুলাই আকাঙ্ক্ষাকে অবশ্যই প্রাধান্য দেবেন। সংবিধান মানুষের জন্য, সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। জুলাই চেতনাকে সমুন্নত রেখে সংবিধানের পরিবর্তনের দরকার হলে পরিবর্তন হবে। দেশের প্রয়োজনে, জনগণের প্রয়োজনে পরিবর্তন হতেই পারে।

কোন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কতটি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা

জানা গেছে, বিশেষ কমিটির গতকালের প্রথম বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসংশ্লিষ্ট একটি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সংশ্লিষ্ট পাঁচটি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট চারটি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাতটি, ভূমি মন্ত্রণালয়ের একটি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একটি; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তিনটি, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দুইটি, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুইটি, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দুইটি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের চারটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দুইটি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট পাঁচটি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়। তবে, এগুলোর সবকটির বিষয়ে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়নি।

কমিটির একজন সদস্য জানান, বৈঠকে বিভিন্ন মত এসেছে। কেউ কেউ কিছু অধ্যাদেশ হুবহু রাখার পক্ষে, কেউ কেউ কিছু ক্ষেত্রে কিছু সংশোধন-পরিবর্তন আনার পক্ষে মত দিয়েছেন। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৩-৩৫ করা যায় কি না, বিরোধী দল থেকে এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে, কমিটির বেশির ভাগ সদস্য ৩২ বছর করার বিষয়ে মত দিয়েছেন।

 

জুলাই সনদ (বা জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫) এর মধ্যে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যাতে সকল রাজনৌতিক দলের নেতারা স্বাক্ষর করেছিলেন। এই স্বাক্ষর ছিল জাতির কাছে তাদের অংঙ্গিকার।

 উচ্চকক্ষ গঠন যেভাবে

সংবিধান সংস্কার শেষ হওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। তবে ওই উচ্চকক্ষের মেয়াদ নিম্নকক্ষের (জাতীয় সংসদের) মেয়াদের শেষ দিবস পর্যন্ত হবে।

সংস্কারের জন্য আর ভোট লাগবে না

সার্বভৌম জনগণের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে বলে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে আর কোনো অনুমোদন বা ভোটের প্রয়োজন হবে না। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুসারে সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত হবে।

এমপিদের দুই শপথ

পরবর্তী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিরা সংস্কারের ২৭০ দিনের সময়সীমার আগপর্যন্ত সংবিধান সংস্কার পরিষদ পরিষদের সদস্য হিসেবে অভিহিত হবেন। এ জন্য তাঁরা নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। এরপর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আরেকটি শপথ নেবেন।

প্রস্তাব পাস কীভাবে

পরিষদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে সভাপ্রধান ও উপ-সভাপ্রধান (স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের মতো) নির্বাচন করবেন। কোরামের জন্য ন্যূনতম ৬০ (ষাট) জন পরিষদ সদস্যের উপস্থিতিই যথেষ্ট হবে। সংবিধান সংস্কার–সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রয়োজন হবে পরিষদের মোট সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট।