ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের ব্যয়ভার কে বহন করবে এই প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হোয়াইট হাউস ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধের বিপুল খরচ আরব দেশগুলোর কাছ থেকে আদায়ের বিষয়টি বিবেচনা করছেন। এতে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের ওপর বাড়তে পারে চাপ, পাশাপাশি বদলে যেতে পারে আঞ্চলিক কূটনীতির চিত্র।
সোমবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্পের মুখপাত্র ক্যারোলিন লিভিট বলেন, যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে আরব দেশগুলোর সহায়তা চাওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট আগ্রহী হতে পারেন। তবে এ বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত কিছু বলতে চাননি তিনি। তার ভাষায়, বিষয়টি প্রেসিডেন্টের বিবেচনায় রয়েছে এবং শিগগিরই এ নিয়ে আরও স্পষ্ট বক্তব্য আসতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের দৃষ্টান্ত সামনে রেখেই এই পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সে সময় কুয়েতে ইরাকের আগ্রাসন প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত জোটের জন্য জার্মানি, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তা দিয়েছিল, যা বর্তমান মূল্যে প্রায় ১৩৪ বিলিয়ন ডলারের সমান।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরাসরি তাদের মিত্রদের সম্পৃক্ত না করেই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছে। ফলে যুদ্ধের ব্যয় ভাগাভাগি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এরই মধ্যে যুদ্ধের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ছয় দিনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১.৩ বিলিয়ন ডলার। আর সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) জানিয়েছে, ১২ দিনের মাথায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬.৫ বিলিয়ন ডলারে। বর্তমানে যুদ্ধ ৩১তম দিনে প্রবেশ করায় প্রকৃত ব্যয় আরও অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেট চেয়েছে। এই অর্থ ইরান অভিযানের ব্যয় মেটানো এবং পেন্টাগনের অস্ত্র মজুদ পুনর্গঠনে ব্যবহার করা হবে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মহল থেকেও ভিন্ন মত উঠে এসেছে। ডানপন্থি ভাষ্যকার শন হ্যানিটি প্রস্তাব দিয়েছেন, সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানকেই এই যুদ্ধের খরচ বহনে বাধ্য করা উচিত। তার মতে, তেলের মাধ্যমে এই ব্যয় পরিশোধ করানো যেতে পারে।
তবে ইরান এই অবস্থান পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। বরং দেশটি দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার দায় যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে ইতোমধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও শিশুরাও রয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর বড় প্রভাব পড়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এর সরাসরি প্রভাবও দেখা যাচ্ছে। এক গ্যালন পেট্রোলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৯৯ ডলারে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এক ডলারের বেশি বেশি। তবে হোয়াইট হাউস দাবি করছে, এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের ব্যয়ভার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন ভাবনা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন দুই মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।