• ১১ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৮শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ২৩শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

আবু সাঈদ হত্যা: আসামিদের যেসব সাজা দেওয়া হলো , আপিল করবেন দণ্ডিতরা

Usbnews.
প্রকাশিত এপ্রিল ১০, ২০২৬
আবু সাঈদ হত্যা: আসামিদের যেসব সাজা দেওয়া হলো , আপিল করবেন   দণ্ডিতরা
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এএসআই আমির হোসেন, ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়ের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।

যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত তিনজন হলেন— সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতিভূষণ রায় ওরফে মাধব।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করে। প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন— বিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

১০ বছরের সাজাপ্রাপ্তরা হলেন— বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবির গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল ওরফে আসাদ, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতি পোমেল বড়ুয়া।

পাঁচ বছরের সাজাপ্রাপ্তরা হলেন— আরপিএমপির সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, ছাত্রলীগের রংপুর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বেরোবির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, রংপুর স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়াত হোসেন ওরফে চন্দন ও এমএলএসএস এ কে এম আমির হোসেন ওরফে আমু।

তিন বছরের সাজাপ্রাপ্তরা হলেন— সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহসভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, সহসভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরোবির এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল ও সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া।

এ মামলায় মোট ৩০ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন ছয়জন। তারা হলেন—এএসআই আমির হোসেন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজ।

পলাতক ২৪ জনের মধ্যে রয়েছেন— বেরোবির সাবেক উপাচার্য হাসিবুর রশীদ, সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল, চিকিৎসক সরোয়ার হোসেন (চন্দন), আরপিএমপির সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান, সাবেক উপকমিশনার আবু মারুফ হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী, সাবেক সহকারী কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া, সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান।

জুলাই বিপ্লবে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুর নগরীর লালবাগ এলাকা থেকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে বিক্ষোভ মিছিল এগিয়ে এলে অসংখ্য সশস্ত্র পুলিশ শিক্ষার্থীদের বাধা দেন। একপর্যায়ে রংপুর মহানগর পুলিশের (আরপিএমপি) সাবেক সহকারী কমিশনার আরিফুজ্জামানের নেতৃত্বে পুলিশের পাঁচ সদস্য স্টিল ও কাঠের লাঠি দিয়ে আবু সাঈদের মাথায় আঘাত করেন এবং তার মাথা দিয়ে রক্ত বের হয়। সেদিন দুপুরে পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন প্রথমে আবু সাঈদকে গুলি করেন । প্রথম গুলিটি যখন আবু সাঈদের পেটে লাগে, তখন তিনি হতবাক হয়ে যান এবং আবার বুক প্রসারিত করে সেখানে দাঁড়িয়ে যান। সে সময় সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় তাকে পরপর দুটি গুলি করেন। এতে আবু সাঈদ সড়ক বিভাজক পার হয়ে বসে পড়েন। আবু সাঈদকে আনতে গিয়ে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাওহিদুর হকের শরীরে প্রায় ৬০টি ছররা গুলি লাগে। হাসপাতালে নেওয়ার পথে সহযোদ্ধাদের বাহুডোরে আবু সাঈদ শহীদ হন।

চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি এ মামলার যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের দিন নির্ধারণের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের পর প্রসিকিউশনের পক্ষে জবাব দেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। এরপর পাল্টা জবাব দেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

গত ২১ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে শেষ হয় ২৫ জানুয়ারি। তিন কার্যদিবসে যুক্তিতর্কে এ মামলার আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়। এছাড়া বেরোবি ক্যাম্পাসের মূল ফটকের সিসিটিভি ফুটেজ ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করা হয়, যা ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের সময় ধারণ করা হয়েছিল। মামলার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত এসব ভিডিওতে আসামিরা কে কোথায় ছিলেন এবং তাদের কার্যকলাপ শনাক্ত করে প্রসিকিউশন। একইসঙ্গে ৩০ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হয়।

এরপর আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো, আজিজুর রহমান দুলু, আবুল হাসানসহ স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীরা। তারা তাদের মক্কেলদের বেকসুর খালাস আবেদন জানান।

গত বছরের ২৭ আগস্ট প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ৬ আগস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাকে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। পলাতক আসামিদের পক্ষে ২২ জুলাই স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে চারজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় ৩০ জুন। ২৪ জুন চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।

 

আবু সাইদ হত্যা মামলার রায়ের পর আসামিদের হট্টগোল, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান

রায়য়য়য

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনালে হট্টগোল করেছেন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা।

দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায় ঘোষণা পরে ট্রাইব্যুনাল থেকে বের হওয়ার সময় তারা দায়িত্বরত পুলিশের সাথে ধাক্কাধাক্কি করেন।

এ সময় সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বলেন, আমরা এ রায় মানি না। আমাদের ফাঁসানো হয়েছে, আমরা নির্দোষ।

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি ২৮ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।

যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত তিনজন হলেন- সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।

আপিল করবেন আবু সাঈদ হত্যা মামলার দণ্ডিতরা

আবু সাঈদ হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিন আসামির পক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। মামলার গুরুত্বপূর্ণ নানা প্রশ্নের উত্তর অজানা রয়ে গেছে উল্লেখ করে আপিলে নতুনভাবে তুলে ধরা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে রায় ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা জানান।

আসামি আনোয়ার পারভেজ, এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়ের পক্ষে লড়েছেন আইনজীবী দুলু। রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ অনুযায়ী আনোয়ার পারভেজ একটি অভিযোগে হাজতবাসকালীন দণ্ড পেলেও বাকি অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন। আমির হোসেন ও সুজন চন্দ্র পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে চারটি থেকে খালাস পেলেও একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন।

দুলু বলেন, আবু সাঈদের জব্দকৃত গেঞ্জিতে গুলির কোনো ছিদ্র পাওয়া যায়নি বলে আমরা যুক্তিতর্কে তুলে ধরেছিলাম। এছাড়া গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্বাভাবিক কোনো চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়নি। মরদেহে এক্স-রে বা রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা না করায় গুলির অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। একজন মানুষ গুলিতে নিহত হলে শরীরে সুস্পষ্ট প্রভাব থাকার কথা। কিন্তু এখানে সেই ধরনের আলামত অনুপস্থিত।

এই আইনজীবী বলেন, মামলায় আমরা লিখিত ও মৌখিক যুক্তিতর্কে যেসব ভিত্তিতে আসামিদের খালাস চেয়েছিলাম সেসব বিষয় পরিষ্কার হয়নি। কারণ আজ ‘সাবস্ট্যান্স অব ফাইন্ডিং’ এবং ‘অপারেটিভ পার্ট অব দ্য জাজমেন্ট’ ঘোষণা করেছেন ট্রাইব্যুনাল। অর্থাৎ রায়ের ডিগ্রি ও শাস্তির অংশ শুনেছি আমরা।

তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি সংগ্রহের জন্য এরই মধ্যে আবেদন করা হয়েছে। রায় হাতে পাওয়ার পর বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে আপিল বিভাগে আপিল করা হবে। আশা করছি আপিলে ন্যায়বিচার পাবো।