শহীদ আলিফের পিতা গাজীউর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ যা করতে ২ বছর নিয়েছিল, বিএনপি তা দুই মাসেই করেছে। জুলাইয়ের স্লোগান ছিল “উই ওয়ান্ট জাস্টিস (আমরা ন্যায়বিচার চাই)”, কিন্তু সরকার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে প্রধান বিচারপতি ও চিফ প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দিয়েছে। আরেকটি স্লোগান ছিল “কোটা না মেধা, মেধা মেধা”; অথচ বর্তমান সরকার মেধা ও কোটা- দুটোই উপেক্ষা করে পরিবারতন্ত্র কায়েম করছে।
শহীদ মেহেরুন নেছার পিতা মোশারফ হোসেন স্পিকারের সমালোচনা করে বলেন, স্পিকার একাত্তরের যোদ্ধা, আর হাসনাত আবদুল্লাহরা জুলাই যোদ্ধা। তিনি জুলাই যোদ্ধাদের কারণেই স্পিকার হতে পেরেছেন। তাই জুলাই যোদ্ধাদের অসম্মান করে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে স্পিকারসহ সরকারের এমপি-মন্ত্রীদের সতর্ক করেন। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে সংসদ সচিবালয় ঘেরাও করা হবে। শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ বলেন, জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল নতুন বাংলাদেশ গড়া। সেই স্বপ্ন ও চেতনার প্রতিফলন রয়েছে জুলাই সনদে। কিন্তু তা উপেক্ষা করে পুরোনো ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা আমরা মেনে নিতে পারি না। জুলাই যোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গণভোটে জনগণের রায় পাওয়ার পরও বিএনপি তা মানছে না। জুলাই সনদ থেকে একটি দাঁড়ি বা কমাও বাদ দেওয়া যাবে না।
জুলাই যোদ্ধা কামরুল আহসান গণভোট, গুম ও মানবাধিকার অধ্যাদেশ বাতিলের তীব্র নিন্দা জানান। শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন শেখ জামাল হোসেন, সানজিদা খানম দ্বীপ্তি, লাখী বেগম, শহিদুল ইসলাম, কবির হোসেন, তাজুল ইসলাম প্রমুখ। তারা বলেন, আমরা আমাদের সন্তানের রক্তের বিনিময়ে ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চাই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে আমরা পরিবারসহ রাজপথে নামব।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সামনে রেখে আবারও আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, দেশ রক্ষা ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধরে রাখতে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার এবং আহত যোদ্ধারা যেন কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রাখেন, সেই আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেছেন, সরকার আবারও ফ্যাসিবাদ কায়েমের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করা হবে।
জামায়াতের আমির দাবি করেন, জুলাই জাদুঘর জনগণের সম্পদ হলেও সেটিকে দলীয়করণের পথে নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিএনপি সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন ক্রিকেট বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা পরিষদে প্রভাব বিস্তার করছে।
তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অবৈধ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবেশ সংকুচিত করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মেনে নেওয়া হবে না, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।”
রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে শফিকুর রহমান বলেন, সংসদের ভেতরে যতদিন সংগ্রাম সম্ভব ততদিন থাকবেন, তবে মূল লড়াই হবে রাজপথে।
একই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। আসন্ন আন্দোলনে ১১ দলের শীর্ষ নেতারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন বলেও জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “এবার আমরা আংশিক নয়, পূর্ণ সফলতার লক্ষ্য নিয়ে রাজপথে নামবো। প্রয়োজনে নেতারাই সামনে থেকে ঝুঁকি নেবেন।”
রোববার (১২ এপ্রিল) রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে জুলাইয়ের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা আবারও আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এটি কোনো দলের বা জোটের বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশকে রক্ষা করার বিষয়। জুলাইয়ের শহীদদের রক্ত যাতে বৃথা না যায়, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।”
তিনি আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সব ক্ষেত্রে প্রত্যাশা অনুযায়ী পাশে দাঁড়ানো সম্ভব না হলেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের জন্য বাস্তবে কী করা হচ্ছে, তা জনগণ দেখতে চায়।
এনসিপি আহ্বায়ক অভিযোগ করেন, জুলাই অধিদপ্তর ও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন গঠন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি উপস্থিতদের উদ্দেশে বলেন, “আমরা সবাই আবারও ঐক্যবদ্ধ হচ্ছি এবং রাজপথের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত আছি। আপনারা যারা আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, এবার আপনারা সামনে থাকবেন না, আমরাই সামনের সারিতে থাকব।”
সারজিস আলম অভিযোগ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি ‘অলিখিত সমঝোতা’ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, বিএনপি আওয়ামী লীগের ভোটের মাধ্যমেই ক্ষমতায় এসেছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী, এমনকি শেখ হাসিনাও দেশের বাইরে থেকে এখন এই ধরনের কথা বলছেন।’ এই রাজনৈতিক সমীকরণের কারণেই জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলাকারী এবং খুনের মামলার অনেক দাগি আসামি বর্তমানে জামিন পেয়ে যাচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
বিএনপির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে এই সংগঠক বলেন, বিগত সময়ে আওয়ামী লীগ যেসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিরোধী দলের ওপর জুলুম চালিয়েছিল, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সেগুলো সংস্কার না করে বরং নিজেদের মতো করে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। এ কারণেই তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। সারজিস হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘বিএনপি যদি মনে করে তারা বিরোধী দলের কবর খুঁড়বে এবং সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের পথে হাঁটবে, তবে সেই কবরে তাদের জায়গাই সবার আগে হবে।’
মতবিনিময় সভায় শহীদ পরিবার ও আহতদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনারা দয়া করে কোনো প্রলোভন বা কিছুর বিনিময়ে বিভাজিত হয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন না। আপনাদের আমরা কোনো দলের ব্যানারে দেখতে চাই না। শহীদ পরিবার এবং যোদ্ধারা সবসময় দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার পক্ষে থাকবে।’
তিনি আরও যোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের স্পিরিট ধরে রাখতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এমনকি জাতীয় নাগরিক পার্টি যদি কোনো সময় গণ-আকাঙ্ক্ষার বিপক্ষে অবস্থান নেয়, তবে তাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হওয়ার জন্য তিনি উপস্থিত সবার প্রতি আহ্বান জানান। বর্তমানে জামিনে মুক্ত আসামিরা অনেক শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের হুমকি দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসাইন মিয়াজী বলেন, সরকার জুলাই যোদ্ধাদের রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতায় এলেও তাদের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা দেখাচ্ছে না। সরকার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার পথ ছেড়ে না এলে রাজপথে নামতে আমরা বাধ্য হব। খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। সরকার সংসদে উদ্যোগ না নিলে রাজপথেই সমাধান করতে হবে। এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আবদুল্লাল আল মামুন বলেন, বর্তমান সরকার নতুন নামে ও নেতৃত্বে আবার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইযহার বলেন, বিগত ১৭ বছর ধরে নির্যাতিত বিএনপি ক্ষমতায় বসেই সব ভুলে গেছে। আজকের বিএনপি শহীদ জিয়ার বা বেগম জিয়ার বিএনপি নয়; বরং এটি ভারতীয় আধিপত্যবাদের ভাষায় কথা বলছে। আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীকে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া হবে না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল, সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি সরকার কর্তৃক সৃষ্ট চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে আমাদের করণীয় নির্ধারণ করার লক্ষ্যে আজকের এই মতবিনিময় সভা। আজ শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধারা নিজেদের যে অনুভূতি প্রকাশ করেছে, তাতে আমাদের করণীয় নির্ধারণ সহজ হয়েছে। আমরা জাতির স্বার্থে আপসহীনভাবে নিঃস্বার্থ ভূমিকা অব্যাহত রাখব। এজন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসে জাতির সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নব্য ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। আমরা চলমান সংকট সংসদে সমাধান চাই, কিন্তু সরকার সেই উদ্যোগ গ্রহণ করছে না। এমন পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতির স্বার্থে করণীয় নির্ধারণে আজকের এই মতবিনিময় সভা। এখান থেকে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধারা যেভাবে চাইবে, ১১ দলীয় ঐক্য সেভাবেই করণীয় নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, বাংলাদেশে যাতে আর কোনো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা না হয়, সেজন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। বিএনপি ৭০ শতাংশ জনগণের রায় মেনে না নিলে আমরাও বিএনপি সরকারকে মেনে নেব না।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে শহীদ পরিবারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, জুলাই যোদ্ধাদের অসম্মান করেছে। তিনি বলেন, দিল্লির পরিকল্পনায় আওয়ামী লীগের অসমাপ্ত কাজ বিএনপি করতে যাচ্ছে। বিএনপিকে দিল্লির পরিকল্পনায় বাংলাদেশে কোনো কাজ করতে দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান বলেন, যে প্রত্যাশা নিয়ে জুলাই অর্জিত হয়েছে, সরকার তা মুছে দিতে চায়। সরকার সভ্যতাকে মুছে দিতে চায়। আজকের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তিনি নিজের ইচ্ছায় দেশে আসতে পারছেন না। অথচ এখন তাকে সংসদে বসে পত্রিকা পড়তে ও মোবাইল টিপে সময় কাটাতে দেখা যায়। এর অর্থ, প্রধানমন্ত্রী কার্যত সরকার পরিচালনা করছেন না; সরকার পরিচালিত হচ্ছে অন্য কোনো শক্তির দ্বারা।