হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের জবাবে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড। তারা বলেছে, ইরানের কোনো বন্দর হুমকিতে পড়লে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর এক মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার ঘোষণার পর এই সতর্কতা দেন। তিনি বলেন, “পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের সব বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, নয়তো কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।”
যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালি খোলার প্রচেষ্টাকে অবৈধ এবং সামুদ্রিক দস্যুতা হিসেবেও অভিহিত করেছে আইআরজিসি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। তেহরানের দাবি, তাদের শত্রুদের কোনো জাহাজ আর এই পথ ব্যবহার করতে পারবে না।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে হয়। উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের উৎপাদিত তেল ও গ্যাস রপ্তানির জন্য এই রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
এদিকে যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে অনেক জায়গায় জ্বালানি নিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ ব্যর্থ হলেও আলোচনার পথ এখনও বন্ধ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব পরিত্যাগ করলে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা সম্ভব।
রোববার (১২ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, ‘মার্কিন সরকার যদি ইরানের জনগণের জাতীয় অধিকারকে সম্মান করে, তাহলে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর পথ খোলা রয়েছে।’ একই সঙ্গে তিনি ইরানি প্রতিনিধিদলের সদস্যদের অভিনন্দন জানান এবং বিশেষভাবে মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদ-এ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে ২১ ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা হলেও কোনো সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই তা শেষ হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী উত্তেজনা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে এই বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হলেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি আসেনি।
দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন। এ নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিনব্যাপী সংলাপ চলে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে, তবে সেটিও চুক্তিহীনভাবেই শেষ হয়।
পরবর্তী সময়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে। একই সময়ে ইসরায়েল ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ চালায়। এই সংঘাতের প্রথম দিনেই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি, যিনি টানা ৩৭ বছর দেশটির নেতৃত্বে ছিলেন।
টানা সংঘাতের পর ৭ এপ্রিল, যুদ্ধের ৩৯তম দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। এরই ধারাবাহিকতায় কূটনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে ইসলামাবাদে নতুন করে সংলাপে বসে দুই পক্ষ। তবে আলোচনায় অগ্রগতি না এলেও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি তেহরান।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও উভয় পক্ষের এই ধরনের বক্তব্য ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ খোলা রাখার কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে।