• ১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

ধারের টাকা ফেরত পাচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক

Usbnews.
প্রকাশিত এপ্রিল ১৩, ২০২৬
ধারের টাকা ফেরত পাচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

আর্থিকভাবে চরম দুর্দশাগ্রস্ত ১২ ব্যাংককে ধার দিয়ে সেই টাকা ফেরত পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় এক ডজনেরও বেশি ব্যাংকে চালানো হয় লুটপাট। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে পড়ে যে ভয়াবহ তারল্য সংকটের কারণে আমানতকারিদের টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।

এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো টিকিয়ে রাখতে এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে টাকা ছাপিয়ে ধার দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ধার নেওয়া টাকা তিন মাসের মধ্যে ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও এর মেয়াদ কয়েকবার অতিক্রম করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র বলছে, এই অর্থের একটি টাকাও এখন পর্যন্ত ফেরত দিতে পারেনি কোনো ব্যাংক।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মোটা অংকের তারল্য সহায়তা দেওয়া সত্ত্বেও এর মধ্যে অধিকাংশ ব্যাংকই এখনও গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ধার পাওয়া ব্যাংকগুলো হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দুর্দশাগ্রস্ত এই ১২ ব্যাংককে ধার দেওয়া টাকার পরিমাণ হলো ৬৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ধার দেন ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সদ্য সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ধার দেন ৫১ হাজার কোটি টাকা। জানা যায়, এই টাকা তিন মাসের জন্য দেওয়া হয়েছিল। তবে বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এক টাকাও ফেরত দেয়নি কোনো ব্যাংক।

তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি ধার দিয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে। ব্যাংকটির ধারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এছাড়া এক্সিম ব্যাংককে ১২ হাজার ১০ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে ১০ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংককে পাঁচ হাজার ৪২০ কোটি টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংককে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়। এর বাইরে এবি ব্যাংককে চার হাজার ২৭০ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে তিন হাজার তিন কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংককে ৬২৪ কোটি টাকা, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংককে ২৫২ কোটি টাকা, পদ্মা ব্যাংককে ২৫২ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংককে ১৯৫ কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়।

ব্যাংকারদের মতে, উচ্চ খেলাপির কারণে ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে, ফলে ধারের টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছেনা।
প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাফি ঋণের পরিমাণও আকাশ ছোঁয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি প্রায় ৯৬ দশমিক ২০ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ১৭ শতাংশে, ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপির হার ৯৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৫ দশমিক ৭০ শতাংশ, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫১ দশমিক ৬৫ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫২ শতাংশের বেশি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের।

এছাড়া এক্সিম ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্যাংক খাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ। পদ্মা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৪ দশমিক ১৭ শতাংশ। ২০১২ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকটি অনুমোদনের সময় এর মূল নিয়ন্ত্রণে ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দীন খান আলমগীর। তিনি ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। পরবর্তীতে ব্যাপক অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগে ২০১৭ সালে মহিউদ্দীন খান আলমগীর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর ২০১৮ সালে চৌধুরী নাফিজ সারাফাত ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাঁর অধীনেই ব্যাংকটি পরিচালিত হয়।
এছাড়া আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপির হার ৯১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৮৪ শতাংশ। বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৬৫ শতাংশ এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪২ শতাংশ।

জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, ব্যাংকগুলো টিকিয়ে রাখতে এবং গ্রাহকের আমানত ফেরত দেওয়ার জন্যই এই টাকা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এই টাকা আদায়ের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

শীর্ষনিউজ