ইসরায়েলের কারাগারে গাজা থেকে আটক করা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর যৌন নির্যাতন ও নিপীড়ন চালানো একটি ‘সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় নীতি’ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে বলে এক লোমহর্ষক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অধিকার রক্ষা সংস্থা ইউরো-মেডিটেরিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটর-এর সংগৃহীত সাবেক বন্দিদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মিডল ইস্ট আই (এমইই) এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই নিষ্ঠুর অপরাধের পেছনে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক, সামরিক এবং বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও সমর্থন রয়েছে। বন্দিদের ওপর চালানো এসব নির্যাতনের মধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সামরিক কুকুর এবং বিভিন্ন বস্তু ব্যবহারের মাধ্যমে ধর্ষণের মতো চরম জঘন্য কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গাজার উত্তরাঞ্চল থেকে আটক হওয়া ৪২ বছর বয়সী এক নারী বন্দি তার দুঃসহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে জানিয়েছেন, তাকে কুখ্যাত এসডি তেইমান আটক কেন্দ্রে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় একটি ধাতব টেবিলের সঙ্গে বেঁধে দুই দিন ধরে মুখোশধারী সেনারা বারবার ধর্ষণ করেছে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজের মৃত্যু কামনা করেছিলাম’ এবং জেলখানার দেয়ালের আড়ালে চলা এই বীভৎসতাকে তিনি ‘আরেকটি গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
নির্যাতনের সময় সেনারা ভিডিও ধারণ করত এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় সেই ভিডিও দেখিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা চলত। আমির নামে ৩৫ বছর বয়সী এক সাবেক বন্দি জানিয়েছেন, সেনাদের নির্দেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর তাকে যৌন নির্যাতন ও মারাত্মক শারীরিক আঘাত করেছে, যা তার কাছে ছিল চরম অবমাননাকর।
ইউরো-মেড-এর মাঠ পর্যায়ের গবেষক খালেদ আহমেদ জানিয়েছেন, এসব অপরাধ কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতার একটি সুনির্দিষ্ট ধরন যা বন্দিদের মর্যাদা ও শারীরিক অখণ্ডতা ধ্বংস করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। বন্দিদের কমিশনের আইনজীবী খালেদ মাহাজনা একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, এসডি তেইমান কারাগারে এক বন্দির ওপর অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের নজল ব্যবহার করে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হয়েছে, যার ফলে তার শরীরে অভ্যন্তরীণ মারাত্মক ক্ষত তৈরি হয়।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, ইসরায়েলি চিকিৎসা কর্মী ও বিচার বিভাগীয় সংস্থাগুলো এই অপরাধীদের সুরক্ষা দিচ্ছে। চিকিৎসকরা নির্যাতনের চিহ্ন আড়াল করছেন এবং বিচার বিভাগ অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খারিজ করে দিচ্ছে।
গত মার্চ মাসে এসডি তেইমান কারাগারে এক ফিলিস্তিনিকে গণধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত পাঁচ সেনার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নেয় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী, যদিও সিসিটিভি ফুটেজে নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। ইউরো-মেড মনিটর তাদের উপসংহারে জানিয়েছে, এসব কর্মকাণ্ড গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস করার একটি বৃহত্তর লক্ষ্যের অংশ, যা আন্তর্জাতিক গণহত্যা বিরোধী সনদের লঙ্ঘন।
জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিটিও এর আগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি জনগণকে দমন ও ধ্বংস করার জন্য যৌন সহিংসতাকে ‘যুদ্ধের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ এনেছিল। গবেষকদের মতে, এই ট্রমা কেবল ভুক্তভোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তাদের পরিবার এবং রক্ষণশীল ফিলিস্তিনি সমাজের সামগ্রিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই