• ১৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

মৌলভী তমিজউদ্দীন খান: সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান , পাকিস্তানের আইনসভার স্পিকার

Usbnews.
প্রকাশিত এপ্রিল ১৪, ২০২৬
মৌলভী তমিজউদ্দীন খান: সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান , পাকিস্তানের আইনসভার স্পিকার
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

পাকিস্তানের ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন যারা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন জেনেবুঝে, জানতেন যে হারবেন, তবুও লড়েছেন। মৌলভী তমিজউদ্দীন খান এমনই একজন মানুষ। ১৯৫৪ সালে যখন গভর্নর জেনারেল মালিক গোলাম মুহাম্মদ পাকিস্তান গণপরিষদ ভেঙে দিলেন, তখন তিনি একাকী দাঁড়িয়ে আদালতে লড়াই করলেন। হেরে গেলেন, কিন্তু ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা হয়ে গেল গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে।
বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে খুব একটা চেনে না। অথচ তিনি ছিলেন ফরিদপুরের সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান, যিনি নিজের যোগ্যতায় উঠে এসেছিলেন পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আইনসভার স্পিকার পদে। তাঁর গল্প আসলে বাংলার গ্রামীণ মুসলিম সমাজের উত্থানের গল্প, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের গল্প, এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানে গণতন্ত্র হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের গল্প।

ফরিদপুরের মাটি থেকে কলকাতার আদালত
১৮৮৯ সালে ফরিদপুর জেলার রাজবাড়ী মহকুমার খানখানাপুর গ্রামে জন্ম মৌলভী তমিজউদ্দীন খানের। তাঁর বাবার ছিল মাত্র তিন একর জমি। অর্থাৎ তিনি ছিলেন প্রকৃতপক্ষে কৃষক শ্রেণির মানুষ, বড়লোক কিংবা জমিদার পরিবারের নন। এই পরিচয়টা তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ তিনি সবসময় গ্রামীণ বাংলার সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবেই কাজ করেছেন।
খানখানাপুর হাই স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি চলে যান কলকাতায়। সেখানে ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯১৩ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে এমএ পাস করেন। একটা তথ্য এখানে বলা দরকার—তিনি ছিলেন ফরিদপুর জেলার প্রথম মুসলমান যিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সেই সময়ে এটা ছিল এক বিশাল ব্যাপার। মুসলমান সমাজে শিক্ষার হার ছিল খুবই কম, বিশেষত উচ্চশিক্ষায়।

১৯১৫ সালে রিপন কলেজ থেকে আইন পাস করেন এবং ফরিদপুরে এসে আইনজীবী হিসেবে প্রাক্টিস শুরু করেন। কিন্তু তাঁর আগ্রহ ছিল শুধু আইন নিয়ে নয়, রাজনীতি নিয়েও। ব্রিটিশ ভারতে তখন জাতীয়তাবাদের আবেগ তুঙ্গে। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন, স্বদেশি আন্দোলন—এসব ঘটনা তাঁর কিশোর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ
ছাত্রজীবনেই তমিজউদ্দীন খান ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি বঙ্গভঙ্গ রদের প্রতিবাদে অংশ নেন এবং ব্রিটিশ পণ্য বর্জন আন্দোলনে যোগ দেন। এই সময় তিনি ইন্ডিয়ান নেশনাল কংগ্রেসে যোগ দেন। ১৯১৫ সালে তিনি মুসলিম লীগেও যোগ দেন, কারণ তখন অনেকে দুই দলেই ছিলেন—এটা বিরল ছিল না।
তিনি ফরিদপুর পৌরসভার ভাইস-চেয়ারমেন নির্বাচিত হন এবং আনজুমান-ই-ইসলামিয়ার সেক্রেটারি হন। এসব ছিল স্থানীয় পর্যায়ে মুসলমান সমাজের উন্নয়নে কাজ করার প্ল্যাটফর্ম।
১৯২০-২১ সালে খিলাফত আন্দোলন এবং অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তমিজউদ্দীন খান পুরোপুরি ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি ফরিদপুর জেলা কংগ্রেস কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা খিলাফত কমিটির ভাইস-প্রেসিডেন্ট হন। গান্ধীর ডাকে তিনি ব্রিটিশ আদালত বর্জন করেন, নিজের আইনি প্র্যাক্টিস ছেড়ে দেন। এমনকি তাঁর ভাইকে ব্রিটিশ স্কুল থেকে বের করে আনেন।

১৯২১ সালের ডিসেম্বরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজদ্রোহিতার অভিযোগ। প্রথমে ফরিদপুর জেলে, পরে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়। দুই বছর জেল খেটেছিলেন তিনি। ১৯২৩ সালে মুক্তি পেলে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। এই ঘটনা তাঁর চরিত্রের একটা বড় দিক প্রকাশ করে—নীতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন।
জেল থেকে বের হয়ে প্র্যাক্টিস করা নিষিদ্ধ থাকায় তিনি কলকাতায় চলে যান এবং কিছুদিন কাপড়ের ব্যবসা করেন। কিন্তু রাজনীতি ছাড়তে পারেননি।

কংগ্রেস ছেড়ে মুসলিম লীগে
১৯২৬ সালে তমিজউদ্দীন খান কংগ্রেস ছেড়ে দেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল কংগ্রেস হিন্দু স্বার্থের দিকে বেশি ঝুঁকে আছে এবং মুসলমানদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে। এটা ছিল সেই সময়ের অনেক মুসলমান রাজনীতিবিদের অনুভূতি। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান—এসব ঘটনা তাঁদের মনে এই ধারণা তৈরি করেছিল যে স্বাধীন ভারতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু হিসেবে নিপীড়িত হবে।
এরপর তিনি সম্পূর্ণভাবে মুসলিম লীগে যুক্ত হন এবং মুসলমান স্বার্থ রক্ষার রাজনীতিতে নিয়োজিত হন। ১৯২০-এর দশকে ব্রিটিশ সরকার ভোটাধিকার সম্প্রসারণ করতে থাকে এবং কৃষক শ্রেণিকে রাজনীতিতে আনার চেষ্টা করে। এই পরিবর্তন তমিজউদ্দীন খানের মতো গ্রামীণ ভিত্তি থাকা নেতাদের জন্য সুযোগ তৈরি করে।
১৯২৬ সালে তিনি বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে নির্বাচিত হন ফরিদপুর থেকে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন একজন কংগ্রেসপন্থী মুসলমান জমিদার। তমিজউদ্দীন খান তাঁকে হারিয়ে দেন। ১৯৩০ সালে মাদারীপুর-গোপালগঞ্জ এলাকা থেকে আবার নির্বাচিত হন।

ফজলুল হক মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী
১৯৩৬ সালে এ কে ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টি গঠন করেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে তমিজউদ্দীন খান মুসলিম লীগের টিকিটে ফরিদপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং তাঁর কংগ্রেসপন্থী প্রতিপক্ষ হুমায়ুন কবীরকে সহজেই হারিয়ে দেন।
নির্বাচনের পর ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টি এবং মুসলিম লীগের কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। কিন্তু তমিজউদ্দীন খানকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রজা সমিতি’ নামে একটা আলাদা দল তৈরি করেন এবং গোপনে কংগ্রেস নেতা শরৎ বসুর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন।

১৯৩৮ সালের মাঝামাঝি কংগ্রেস বেঙ্গল টেনান্সি অ্যামেন্ডমেন্ট বিলের বিরুদ্ধে ফজলুল হক সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনে। তমিজউদ্দীন খান এবং আরও কিছু অসন্তুষ্ট প্রজা পার্টি সদস্য সেই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন। যদিও প্রস্তাব পাস হয়নি এবং হক সরকার টিকে যায়, কিন্তু ফজলুল হক বুঝে যান যে তমিজউদ্দীন খানকে সামলাতে হবে।
তখন তিনি তমিজউদ্দীন খানকে মন্ত্রিসভায় নেন। প্রথমে তাঁকে দেওয়া হয় মেডিসিন ও পাবলিক হেলথ মন্ত্রণালয়, পরে কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয়। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত তিনি বাংলার বিভিন্ন মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প এবং শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মন্ত্রী হিসেবে তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল বেঙ্গল টেনান্সি অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট পাস করানোতে নেতৃত্ব দেওয়া। তিনি জোরালোভাবে প্রজাদের জমি হস্তান্তরের অধিকারের পক্ষে এবং জমিদারদের ক্রয়াধিকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। এটা ছিল গরিব কৃষকদের জন্য একটা বড় পদক্ষেপ।

১৯৪১ সালে ফজলুল হক এবং মুসলিম লীগের মধ্যে মতবিরোধ হয়। হক শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দ্বিতীয় কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন। তখন তমিজউদ্দীন খান এবং অন্যান্য মুসলিম লীগ সদস্যরা আইন পরিষদে বিরোধী দলে চলে যান।
১৯৪৩ সালে ফজলুল হক সরকার পতনের পর খাজা নাজিমউদ্দীনের নেতৃত্বে নতুন কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। তমিজউদ্দীন খান এই সরকারে শিক্ষামন্ত্রী হন। ১৯৪৫ সালে সরকার একটি কাট মোশনে পরাজিত হয় এবং আইন পরিষদ ভেঙে দেওয়া হয়।

পাকিস্তান আন্দোলন এবং কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে প্রবেশ
১৯৪০-এর দশকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা এতটাই তীব্র আকার নেয় যে মুসলমানরা অনুভব করতে থাকে স্বাধীন ভারতে তারা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিচে নিপীড়িত হবে। মুসলিম লীগ পাকিস্তান দাবিকে প্রধান ইশু বানায়।

১৯৪৫ সালের নির্বাচনে তমিজউদ্দীন খান কেন্দ্রীয় আইনসভার জন্য ঢাকা-ময়মনসিংহ মুসলিম কনস্টিটুয়েন্সি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন টাঙ্গাইলের আবদুল হালিম গজনভী। তমিজউদ্দীন খান তাঁকে হারিয়ে দেন। এভাবে তিনি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের (Constituent Assembly) সদস্য হন। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন গণপরিষদের সভাপতি এবং তমিজউদ্দীন খান ছিলেন উপ-সভাপতি। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহর মৃত্যুর পর তমিজউদ্দীন খান গণপরিষদের সভাপতি বা স্পিকার হন।
তিনি ছিলেন প্রথম বাঙালি যিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সভাপতি হন। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বেসিক প্রিন্সিপলস কমিটির তিনি সভাপতি ছিলেন, যেটার কাজ ছিল পাকিস্তানের সংবিধানের মূল নীতিগুলো নির্ধারণ করা।

১৯৫৪: গণপরিষদ ভাঙা এবং ঐতিহাসিক মামলা
১৯৫৪ সালের ২৪ অক্টোবর গভর্নর জেনারেল মালিক গোলাম মুহাম্মদ একটা ঘোষণা জারি করে পাকিস্তান গণপরিষদ ভেঙে দেন এবং একটা নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। তাঁর যুক্তি ছিল যে সাংবিধানিক যন্ত্র ভেঙে পড়েছে এবং গণপরিষদ আর কাজ করতে পারছে না।
এটা ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসে একটা অভূতপূর্ব ঘটনা। গণপরিষদ ছিল দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা এবং সংবিধান প্রণয়নের ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থা। গভর্নর জেনারেল সেটা ভেঙে দিলেন কোনো আইনগত ভিত্তি ছাড়াই।
মৌলভী তমিজউদ্দীন খান, গণপরিষদের সভাপতি হিসেবে, এই পদক্ষেপকে ‘ultra vires’ (আইনের বাইরে) বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি যুক্তি দেন যে গভর্নর জেনারেলের গণপরিষদ ভেঙে দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই।

১৯৫৪ সালের ৭ নভেম্বর তিনি সিন্ধু হাইকোর্টে একটা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি দায়ের করেন অ্যাডভোকেট মানজার-ই-আলম। তমিজউদ্দীন খান দুটো রিট চান:
১. ম্যান্ডামাস (Mandamus): যাতে গভর্নর জেনারেলকে তাঁর, অর্থাৎ গণপরিষদ সভাপতির, দায়িত্বে হস্তক্ষেপ করতে নিষেধ করা হয়—যার অর্থ ছিল গণপরিষদ পুনরুদ্ধার।
২. কো ওয়ারেন্টো (Quo Warranto): যারা গণপরিষদ সদস্য না হয়ে নতুন মন্ত্রিসভায় নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করা।

সিন্ধু চিফ কোর্ট, চিফ জাস্টিস জর্জ কনস্টানটাইনের নেতৃত্বে, সর্বসম্মতিক্রমে তমিজউদ্দীন খানের পক্ষে রায় দেয়। আদালত বলে যে গভর্নর জেনারেলের গণপরিষদ ভাঙার কোনো ক্ষমতা ছিল না। আদালত পার্লামেন্টারি সার্বভৌমত্বের নীতি পুনর্নিশ্চিত করে এবং বলে যে গণপরিষদ জনগণের ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করে, গভর্নর জেনারেল তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

কিন্তু পাকিস্তান সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে ফেডারেল কোর্টে (পরে যেটা সুপ্রিম কোর্ট হয়) আপিল করে। মামলাটা শোনা হয় ১৯৫৫ সালের মার্চ মাসে।

ফেডারেল কোর্টের বিতর্কিত রায়
ফেডারেল কোর্টে চিফ জাস্টিস ছিলেন মুহাম্মদ মুনীর। তিনি একটা অত্যন্ত বিতর্কিত যুক্তি হাজির করেন। তিনি বলেন যে গণপরিষদ যখন আইন তৈরি করে, তখন সেটা ফেডারেল লেজিসলেচার হিসেবে কাজ করে, আর গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট ১৯৩৫ অনুযায়ী সেই আইনে গভর্নর জেনারেলের সম্মতি (assent) লাগে।
তমিজউদ্দীন খান যে সেকশন ২২৩-এ-এর অধীনে রিট দায়ের করেছিলেন, সেটা ছিল ১৯৫৪ সালের জুলাই মাসে গণপরিষদ কর্তৃক পাস করা একটা আইন। মুনীর বলেন এই আইনটা গভর্নর জেনারেলের সম্মতি পায়নি, তাই এটা অবৈধ। আর যেহেতু সেকশন ২২৩-এ অবৈধ, তাই সিন্ধু হাইকোর্টের রিট জারি করার কোনো এখতিয়ার ছিল না।
এই রায় ছিল আইনগত চতুরতার একটা নমুনা, কিন্তু ন্যায়বিচারের হত্যা। মুনীর গণপরিষদ ভাঙার বৈধতা নিয়ে আদৌ আলোচনা করেননি। তিনি একটা টেকনিক্যাল বিষয় ধরে পুরো মামলাটাই খারিজ করে দিলেন।
কিন্তু এর চেয়েও বড় সমস্যা ছিল অন্যত্র। মুনীর তাঁর রায়ে প্রথমবারের মতো ‘ডকট্রিন অফ নেসেসিটি’ বা ‘প্রয়োজনের নীতি’ প্রয়োগ করেন। এই নীতি অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার স্বার্থে আইনবহির্ভূত পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া যায়।

এই নীতির মাধ্যমে পাকিস্তানে একটা ভয়াবহ নজির স্থাপিত হলো। পরবর্তীতে এই নীতিই ব্যবহার করা হয়েছে সামরিক অভ্যুত্থান, সংবিধান স্থগিত করা, এবং আরও অনেক স্বৈরতান্ত্রিক পদক্ষেপকে বৈধতা দিতে।
ফেডারেল কোর্টের পাঁচজন বিচারকের মধ্যে চারজন মুনীরের সঙ্গে একমত হন। কিন্তু একজন বিচারক, জাস্টিস এ আর কর্নেলিয়াস, দ্ব্যর্থহীনভাবে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন গণপরিষদ একটা সার্বভৌম সংস্থা এবং গভর্নর জেনারেল তার ওপরে নয়। কর্নেলিয়াসের এই দ্বিমত পাকিস্তানের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটা আলোকবর্তিকা হয়ে আছে।

মামলার প্রভাব
এই মামলার রায় পাকিস্তানের জন্য ছিল এক দুর্যোগ। এটা প্রতিষ্ঠিত করে দিল যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের চেয়ে অনির্বাচিত গভর্নর জেনারেল বা পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বেশি। এটা পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দিল এবং নির্বাহী বিভাগের হাতে অত্যাধিক ক্ষমতা তুলে দিল।
ডকট্রিন অফ নেসেসিটি পাকিস্তানে সামরিক শাসনের পথ প্রশস্ত করল। ১৯৫৮, ১৯৬৯, ১৯৭৭, এবং ১৯৯৯—প্রতিটা সামরিক অভ্যুত্থানই এই নীতির আশ্রয় নিয়ে নিজেদের বৈধতা দাবি করেছে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই মামলার পরোক্ষ ফলাফল হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের (পরবর্তীতে বাংলাদেশ) বিচ্ছিন্নতাও এসেছে। কারণ এই রায় প্রতিষ্ঠা করে দিল যে আইনের শাসনের চেয়ে ক্ষমতাশালীদের ইচ্ছা বড়। বাঙালিরা বুঝে গেল যে পাকিস্তান কাঠামোয় তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার কখনো নিরাপদ নয়।

পরবর্তী জীবন: ফিরে আসা এবং লড়াই অব্যাহত রাখা
মামলায় হেরে যাওয়ার পর তমিজউদ্দীন খান কিছুকাল রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। ১৯৬২ সালে আইয়ুব খানের সংবিধানের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি আবার জাতীয় পরিষদের সদস্য (MNA) নির্বাচিত হন ঢাকা-ফরিদপুর যুক্ত কনস্টিটুয়েন্সি থেকে।
১৯৬২ সালের ১১ জুন তিনি সর্বসম্মতিক্রমে জাতীয় পরিষদের স্পিকার নির্বাচিত হন। এটা ছিল তাঁর জন্য একটা স্বীকৃতি—মামলায় হেরে যাওয়ার পরও তিনি তাঁর সততা এবং যোগ্যতার জন্য সম্মানিত ছিলেন।

স্পিকার হিসেবে তিনি ১৯৬৩ সালে দুইবার অস্থায়ীভাবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন, যখন আইয়ুব খান বিদেশ সফরে ছিলেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট উভয়ের অনুপস্থিতিতে স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
১৯৬৩ সালের মে মাসে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সঙ্গে হোয়াইট হাউসে সাক্ষাৎ করেন। এটা ছিল তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটা নিদর্শন।

মৃত্যু এবং স্মরণ
১৯৬৩ সালের ১৯ আগস্ট ঢাকায় মৌলভী তমিজউদ্দীন খান মারা যান। তখনো তিনি জাতীয় পরিষদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।
তাঁর মৃত্যু পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটা যুগের সমাপ্তি চিহ্নিত করে। তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের মানুষ যারা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করেছিলেন, পাকিস্তান আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, এবং নতুন রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রেখেছিলেন।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে তাঁকে খুব একটা স্মরণ করা হয় না। তাঁর নামে কোনো রাস্তা নেই, কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। অথচ তিনি ছিলেন একজন বাঙালি যিনি পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আইনসভার প্রধান হয়েছিলেন এবং গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিলেন।

তমিজউদ্দীন খানের ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্র
যারা তাঁকে চিনতেন, তারা বলতেন তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ এবং নীতিনিষ্ঠ মানুষ। তাঁর স্মৃতিকথার একটা অংশে তিনি নিজেই লিখেছেন ১৪ বছর বয়সে একবার তিনি কিছু হিন্দু বন্ধুদের সঙ্গে একটা ছোট ব্যবসা করেছিলেন এবং ১০-১২ আনা লাভ করেছিলেন, কিন্তু সেটা বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করেননি। তিনি এই ঘটনাকে তাঁর জীবনের একমাত্র অসততার দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করতেন এবং এজন্য সারাজীবন অনুতপ্ত ছিলেন।

এমন সততা সেই যুগের রাজনীতিতে বিরল ছিল। তিনি কখনো নিজের নীতি থেকে সরে আসেননি, এমনকি যখন জানতেন এর জন্য মূল্য দিতে হবে।

তিনি ছিলেন একজন চমৎকার বক্তা এবং লেখক। তাঁর স্মৃতিকথা ‘দ্য টেস্ট অফ টাইম: মাই লাইফ অ্যান্ড ডেজ’ পড়লে বোঝা যায় তিনি গ্রামীণ বাংলার জীবন কতটা জীবন্তভাবে বর্ণনা করতে পারতেন। দুর্ভাগ্যবশত তিনি এটা শেষ করতে পারেননি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাঁর তাৎপর্য
বাংলাদেশের ইতিহাসে মৌলভী তমিজউদ্দীন খানের গুরুত্ব বহুমাত্রিক।
প্রথমত, তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান শিক্ষা এবং যোগ্যতার বলে দেশের সর্বোচ্চ পদে উঠতে পারে। ফরিদপুরের তিন একর জমির মালিকের ছেলে পাকিস্তান গণপরিষদের সভাপতি হয়েছিলেন—এটা ছিল সামাজিক গতিশীলতার একটা উদাহরণ।
দ্বিতীয়ত, তিনি দেখিয়েছিলেন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে হলে ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ১৯৫৪ সালের মামলায় তিনি জানতেন জিততে পারবেন না, কারণ আদালত এবং সরকার—সবই ছিল ক্ষমতাশালীদের হাতে। তবুও তিনি লড়েছেন। এই লড়াই ইতিহাসে লেখা থেকে গেছে।
তৃতীয়ত, তাঁর মামলা এবং পরাজয় বাঙালিদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে পাকিস্তানে আইনের শাসন নেই, আছে ক্ষমতার শাসন। এই উপলব্ধি পরবর্তীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করেছে এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ তৈরি করেছে।
চতুর্থত, তিনি একজন সাংবিধানিক নায়ক ছিলেন। সংবিধানবাদ, আইনের শাসন, পার্লামেন্টারি সার্বভৌমত্ব—এসব নীতিতে তাঁর বিশ্বাস ছিল অটুট। তিনি দেখিয়েছিলেন যে ক্ষমতা আইন থেকে আসে, ব্যক্তির খেয়ালখুশি থেকে নয়।
পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে তাঁর তাৎপর্য
পাকিস্তানের জন্য তমিজউদ্দীন খান কেস একটা দুঃস্বপ্ন। এই মামলা পাকিস্তানকে এমন একটা পথে ঠেলে দিয়েছে যেখান থেকে সেটা আর বের হতে পারেনি। ডকট্রিন অফ নেসেসিটি হয়ে উঠেছে সামরিক শাসক এবং স্বৈরাচারীদের প্রিয় হাতিয়ার।
আইয়ুব খানের ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন, ইয়াহিয়া খানের ক্ষমতা দখল, জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসি, জিয়াউল হকের সামরিক শাসন, পারভেজ মোশাররফের অভ্যুত্থান—সব জায়গাতেই এই নীতি ব্যবহার করা হয়েছে।
পাকিস্তান কখনো স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সেখানে সামরিক বাহিনী এবং বিচার বিভাগ রাজনীতিতে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে নির্বাচিত সরকার কখনো পুরোপুরি ক্ষমতায় থাকতে পারে না। এই পরিস্থিতির বীজ রোপণ হয়েছিল ১৯৫৪-৫৫ সালের সেই মামলায়।
উপসংহার: একজন ভুলে যাওয়া নায়ক
মৌলভী তমিজউদ্দীন খান বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন ভুলে যাওয়া নায়ক। আমরা অনেক নেতাকে মনে রাখি, কিন্তু তাঁকে ভুলে গেছি। অথচ তাঁর জীবন এবং সংগ্রাম আমাদের অনেক কিছু শেখায়।
তিনি শেখান যে সততা এবং নীতিবোধ ছাড়া রাজনীতি হয় না। তিনি শেখান যে গণতন্ত্র রক্ষা করতে হলে ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তিনি শেখান যে হেরে যাওয়া মানেই পরাজয় নয়—কখনো কখনো হারটাই ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজয়ে পরিণত হয়।

১৯৫৪ সালে তমিজউদ্দীন খান আদালতে হেরেছিলেন, কিন্তু ইতিহাসে জিতে গেছেন। তাঁর লড়াই প্রমাণ করেছে যে পাকিস্তান ছিল একটা ব্যর্থ রাষ্ট্র, যেখানে আইন ছিল না, ছিল শুধু জোর। এই উপলব্ধিই পরবর্তীতে বাংলাদেশের জন্মের পথ তৈরি করেছে।

আজ যখন আমরা গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলি, সংবিধান নিয়ে কথা বলি, তখন মৌলভী তমিজউদ্দীন খানকে মনে রাখা দরকার। তিনি দেখিয়েছিলেন যে গণতন্ত্র কোনো উপহার নয়, এটা লড়াই করে অর্জন করতে হয় এবং রক্ষা করতে হয়।
ফরিদপুরের সেই কৃষক পরিবারের ছেলে, যিনি নিজের যোগ্যতায় পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আইনসভার প্রধান হয়েছিলেন, যিনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, তিনি প্রাপ্য সম্মান পাননি। কিন্তু তাঁর নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে সোনার অক্ষরে—একজন সাহসী মানুষ হিসেবে, যিনি জানতেন কী সঠিক এবং সেটার জন্য লড়েছিলেন।
বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের উচিত মৌলভী তমিজউদ্দীন খানকে জানা এবং তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া। কারণ গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনের জন্য তাঁর লড়াই আজও প্রাসঙ্গিক, আজও অনুপ্রেরণাদায়ক।